শীতকাল এলেই ড্রাই ফ্রুটসের চাহিদা বেড়ে যায়। আর এই ড্রাই ফ্রুটসের মধ্যে কাঠবাদাম বা আমন্ডের চাহিদা সবসময়ই শীর্ষে থাকে। কাজু, কিশমিশ, খেজুর ও আখরোটের সঙ্গে আমন্ডের লড়াই চলে হাড্ডাহাড্ডি। কারণ স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আমন্ড সবসময় প্রথম পছন্দ (Benefits of Eating Almonds)। বিশেষত শীতকালে আমন্ড খেলে শরীর উষ্ণ থাকে এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ে। তাই রাতে আমন্ড ভিজিয়ে সেটাকে সকালে খাবেন অনেকে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আমন্ড যেভাবে খান সেটা সঠিক না। কেউ কেউ আমন্ড খোসাসহ খান আবার কেউ কেউ খোসা ছাড়িয়ে খান। কোন কার্যকরি? জেনে নিন- (Benefits of Eating Almonds)
Table of Contents
Benefits of Eating Almonds
১০০ গ্রাম আমন্ডে থাকে—
ক্যালোরি – ৫৭৫
প্রোটিন – ২১ গ্রাম
ফাইবার – ১২.৫ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট – ২২ গ্রাম
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট – ৫০ গ্রাম
ভিটামিন ই, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
আমন্ড দেহের কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় কাজ করে?
- হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে
- ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে
- হাড় মজবুত করে
- মস্তিষ্কের শক্তি বাড়ায়
- ত্বক ও চুল সুস্থ রাখে
আমন্ড খাওয়ার নিয়ম: খোসা ও ভেজানো কেন জরুরি?
আমন্ডের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতন হলেও, অনেকেই এর সঠিক ব্যবহার জানেন না। মনে রাখবেন আমন্ড যখন খাচ্ছেন সেটার পুরো পুষ্টিগুণ আপনাকে নিতে হবে। অর্ধেক নিলে হবে না। আমন্ডের পুরো উপকার পেতে হলে আপনাকে দুটি প্রধান বিষয় বুঝতে হবে। খোসা ছাড়ানো বনাম খোসাসমেত খাওয়া, এবং কাঁচা বনাম ভেজানো আমন্ড। এই দুটি প্রক্রিয়াই আমাদের শরীরের পুষ্টিকে প্রভাবিত করে। (Benefits of Eating Almonds)
খোসাসমেত আমন্ড
আমন্ডের খোসাতেও রয়েছে বহু উপকারী উপাদান। যদি আপনি খোসা ছাড়িয়ে আমন্ড খান, তবে সেই মূল্যবান পুষ্টির একটি বড় অংশ বাদ চলে যাবে। এই কারণেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত খোসাসমেত আমন্ড খাওয়ার পরামর্শ দেন।
ফাইবারের ভাণ্ডার ও হজম প্রক্রিয়া
আমন্ডের খোসা হলো ফাইবারের এক বড় উৎস। ডায়েটে পর্যাপ্ত ফাইবার থাকলে তা হজম প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। ফাইবার হজম হয় না, বরং এটি জল শোষণ করে মলের পরিমাণ বাড়ায়, যার ফলে অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক থাকে। এছাড়া, ফাইবার দীর্ঘ সময়ের জন্য পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কারণ পেট বেশিক্ষণ ভরা থাকলে ঘনঘন খিদে পায় না। (Benefits of Eating Almonds)
চকোবারের নামে তেল খাচ্ছেন না তো? জেনে নিন আসল আইসক্রিম চেনার 3 কৌশল
পলিফেনল ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস
আমন্ডের খোসায় পলিফেনল নামক এক শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এই উপাদানটি শরীরের অভ্যন্তরে ফ্রি র্যাডিক্যালের দাপট কমাতে পারে। ফ্রি র্যাডিক্যালের আধিক্য শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং ডায়াবিটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণ হতে পারে। নিয়মিত খোসাসমেত আমন্ড খেলে এই পলিফেনলগুলি প্রদাহ কমিয়ে শরীরকে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করে।
ভিটামিন ই ও ত্বক কোষের সুরক্ষা
আমন্ডের পাশাপাশি এর খোসাতেও রয়েছে ভিটামিন ই। এটি কোষের ঝিল্লি বা মেমব্রেন এবং ত্বককে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। ভিটামিন ই ত্বককে সতেজ ও উজ্জ্বল রাখতে সহায়তা করে এবং সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকেও বাঁচায়।
খনিজ উপাদান ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
আমন্ডের খোসায় ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো খনিজ উপাদানও রয়েছে। এই দুই উপাদান রক্তনালীকে শিথিল করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া, ম্যাগনেসিয়াম মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং নার্ভের সুসমন্বয় বজায় রাখতে অপরিহার্য। (Benefits of Eating Almonds)
কাঁচা আমন্ড বনাম ভেজানো আমন্ড
আমন্ড কাঁচা অবস্থায় খাওয়া নিরাপদ হলেও, বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই আমন্ড ভিজিয়ে খাওয়ার উপর জোর দেন। এর প্রধান কারণ হলো পুষ্টি শোষণে বাধা সৃষ্টিকারী দুটি উপাদানকে নিষ্ক্রিয় করা: ফাইটিক অ্যাসিড ও ট্যানিন।
কাঁচা আমন্ডের খোসা ও শস্যদানায় প্রাকৃতিকভাবে ফাইটিক অ্যাসিড বা ফাইটেট থাকে। এটি হলো এক ধরনের এনজাইম ইনহিবিটর। ফাইটিক অ্যাসিড শরীরে আয়রন, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলির সঙ্গে শক্তভাবে আবদ্ধ হয়। এই বন্ধনের ফলে শরীর সেই খনিজগুলি শোষণ করতে পারে না এবং সেগুলি অপরিবর্তিত অবস্থায় শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
আমন্ডকে কমপক্ষে ৬-৮ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখলে ফাইটিক অ্যাসিডের স্তর হ্রাস পায়। ভেজানোর প্রক্রিয়াটি ফাইটেজ (Phytase) নামক একটি এনজাইমকে সক্রিয় করে তোলে, যা ফাইটিক অ্যাসিডকে ভেঙে দিতে সাহায্য করে। (Benefits of Eating Almonds)
ওজন কমানো আর চাপের নয়, এই তিন উপায়ে ঝরিয়ে ফেলুন মেদ
ট্যানিন এবং হজমের সমস্যা
কাঁচা আমন্ডের খোসায় ট্যানিন (Tannins) নামক যৌগও থাকে, যা হজম প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তোলে।
সমস্যা: ট্যানিন আমন্ডের মধ্যে থাকা প্রোটিনের সঙ্গে আবদ্ধ হয়, যার ফলে প্রোটিন সঠিকভাবে হজম হয় না। এর ফলস্বরূপ পেট ফাঁপা, গ্যাস বা হজমের অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সমাধান: আমন্ড ভিজিয়ে রাখলে ট্যানিন জল দ্বারা দ্রবীভূত হয়ে যায় বা এর মাত্রা হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ, ভেজানো আমন্ড অনেক সহজে হজম হয় এবং পাচনতন্ত্রে কোনো অস্বস্তি সৃষ্টি করে না।
আমন্ড খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি ও সময়
আমন্ড খাওয়ার সবচেয়ে সঠিক এবং উপকারী পদ্ধতি হলো: ভিজিয়ে ও খোসাসমেত খাওয়া।
সঠিক প্রক্রিয়া
- ভেজানো: প্রতিদিন রাতে ৪ থেকে ৬টি আমন্ড একটি ছোটো বাটিতে পরিষ্কার জলে ভিজিয়ে দিন।
- সময়কাল: আমন্ডকে কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা আবশ্যক, যাতে ফাইটিক অ্যাসিডের মাত্রা সর্বনিম্ন হয়।
- প্রস্তুতি: সকালে আমন্ডগুলি ভালো করে ধুয়ে নিন। ভেজানোর ফলে খোসাগুলি নরম হয়ে যায়। খোসা না ছাড়িয়ে, চিবিয়ে বা পিষে সরাসরি মুখে ভরে নিন।
আমন্ড খাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো সকালবেলা খালি পেটে। রাতে ভেজানো আমন্ড সকালে খেলে এর পুষ্টি উপাদানগুলি দ্রুত এবং কার্যকরভাবে রক্তে মিশে যেতে পারে। এছাড়া, সকালে ফাইবার, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের একটি ডোজ সারাদিনের জন্য মেটাবলিজমকে গতিশীল করতে সাহায্য করে। (Benefits of Eating Almonds)
আমন্ড খেলে কোন কোন রোগের ঝুঁকি কমে?
- হৃদরোগ
- হাই ব্লাড প্রেশার
- ডায়াবেটিস
- জয়েন্ট পেইন ও ইনফ্লেমেশন
- ত্বকের বয়সজনিত সমস্যা
- স্মৃতিভ্রংশ ও ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি
- কোলেস্টেরল বৃদ্ধি
ডায়েট চার্টে এই একটি খাবার যোগ করলেই পুরো শরীরের স্বাস্থ্য উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি হতে পারে। আমন্ড ছোট দেখতে, কিন্তু উপকারের তালিকা বিশাল। তাই আজ রাত থেকেই ৪–৫টা বাদাম জলে ভিজিয়ে রাখুন এবং খাওয়া শুরু করুন।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

