Site icon Unknown Story

নেপালের বন্যা থেকে কীভাবে বিহার? নেপথ্যে ৬০ বছর আগের এক সিদ্ধান্ত

Gandak Barrage

ধ্বংসস্তূপ নেপাল। কয়েক মিনিটের হড়পা বানে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে উত্তর নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা (Gandak Barrage)। প্রতিদিন বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, নিখোঁজ বহু। হিমালয়ের কোলে থাকা এই দেশে হড়পা বানটা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে এই ছবিটা দেখা যাচ্ছে প্রতি বছর। তবে হড়পা বান না হলেও নেপালের হিমালয় সংলগ্ন ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং তার জেরে উত্তর বিহারের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা প্রতি বছরই তৈরি হয়। নেপালের উঁচু পর্বতমালা থেকে নেমে আসা খরস্রোতা গন্ডক নদী যখন তীব্র গতিতে ভারতের সমতলে আছড়ে পড়ে, তখন তার ধ্বংসাত্মক রূপ ঠেকানো যে কোনও সাধারণ ব্যবস্থার পক্ষে অসম্ভব।

কিন্তু এই ভৌগোলিক ঝুঁকির মুখে ভারত-নেপাল আন্তর্জাতিক সীমান্তে একটি সুবিশাল রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে গন্ডক ব্যারেজ (Gandak Barrage), যা স্থানীয়ভাবে বাল্মীকি নগর ব্যারেজ নামে পরিচিত। গত কয়েক দশক ধরে এই হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময় কীভাবে নেপালের পাহাড়ি জল সামলে উত্তর বিহারের লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা বাঁচিয়ে আসছে? জেনে নিন এই প্রতিবেদনে।

Gandak Barrage: গন্ডক নদীর ভৌগোলিক রূপ

হিমালয় থেকে উৎপন্ন হওয়ার সময় নদীটি পরিচিত ‘কালী গন্ডকী’ নামে। এরপর মধ্য নেপালের ত্রিশালী ও অন্যান্য উপনদীগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি পরিচিত হয় ‘নারায়ণী’ নদী হিসেবে।

আরও পড়ুন: বিলেতের মাটি দিয়ে তৈরি হয়েছিল কলকাতার রাস্তা, জানেন সেই গল্প?

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৫৯ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি

ঐতিহাসিকভাবে গন্ডক অববাহিকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি সেচের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৫৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারত ও নেপালের মধ্যে ঐতিহাসিক গন্ডক নদী চুক্তি (Gandak Irrigation and Power Project Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে এটি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়।

এই চুক্তির অধীনেই ১৯৬০-এর দশকে বাল্মীকি নগরে আন্তর্জাতিক সীমানা রেখার ঠিক ওপরে ব্যারেজটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। (Gandak Barrage)

নেপালের জল নিয়ন্ত্রণে গন্ডক ব্যারেজের ৪ স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা

গন্ডক ব্যারেজএকটি সাধারণ ব্যারেজ নয়, এটি কাজ করে একটি উন্নত ফ্লাড মডারেশন ও ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার ডাইভারশন নেটওয়ার্ক হিসেবে।

রিয়েল-টাইম হাইড্রোলজিক্যাল মনিটরিং ও আর্লি ওয়ার্নিং

নেপালের পাহাড়ি অববাহিকা দেবঘাট ও পোখরার মতো স্টেশনগুলোতে জলের স্তর কতটা বাড়ছে, তার তথ্য ২৪ ঘণ্টা ভারত-নেপাল যৌথ কন্ট্রোল রুমে আসে। সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন (CWC) এবং বিহার জলসম্পদ দপ্তর জল পাহাড়ি ঢল থেকে সমতলে পৌঁছনোর অন্তত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা আগেই সঠিক পূর্বাভাস পেয়ে যায়। এর ফলে নিম্নাঞ্চলকে সতর্ক করার পাশাপাশি গেট খোলার আগাম পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হয়। (Gandak Barrage)

নিয়ন্ত্রিত গেট অপারেশন ও প্রেসার ব্যালান্সিং

পাহাড় থেকে জল আছড়ে পড়লে ব্যারেজের সব গেট একসঙ্গে খুলে দেওয়া হয় না, আবার সব গেট বন্ধও রাখা হয় না। জলের তীব্র চাপকে ধাপে ধাপে ৩৬টি গেটের মাধ্যমে এমনভাবে ছাড়া হয়, যাতে নদীর ডাউনস্ট্রিমে হঠাৎ কোনও কৃত্রিম ফ্ল্যাশ ফ্লাড (Flash Flood) তৈরি না হয়।

ইস্টার্ন ও ওয়েস্টার্ন ক্যানেল দিয়ে অতিরিক্ত জল ডাইভারশন

ব্যারেজের মূল শক্তির একটি বড় অংশ হলো এর দুই প্রান্ত থেকে বের হওয়া দুটি প্রধান ক্যানেল সিস্টেম:

বন্যার সময় মূল নদীখাতের ওপর চাপ কমাতে লক্ষাধিক কিউসেক অতিরিক্ত জল এই ক্যানেলগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা নদীর মূল স্রোতের ওপর অন্তত ৩০-৪০% চাপ কমিয়ে দেয়। (Gandak Barrage)

আরও পড়ুন: লাদাখ বা পাহাড়ে ট্যুরের প্ল্যান করছেন? এই ভুলগুলো করলেই বিপদে পড়বেন

পলি ও বোল্ডার নিষ্কাশন (Silt Management System)

পাহাড়ি নদী হওয়ার কারণে গন্ডক প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন ভারী পলি, কাদা ও পাথর বয়ে আনে। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হলে নদী উপচে আশপাশের বাঁধ ভাঙতে পারে। গন্ডক ব্যারেজের স্লুইস গেটগুলোর আন্ডার-স্লুইস মেকানিজম নদীর নিচের স্তরে জমে থাকা পলিকে নিয়মিত ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যার ফলে নদীখাত গভীর ও নিরাপদ থাকে।

নদীবাঁধ ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ

ব্যারেজের পাশাপাশি নদীর দুই তীর বরাবর শত শত কিলোমিটার বিস্তৃত বিশেষ গাইড ড্যাম ও ফ্লাড এমব্যাঙ্কমেন্ট (River Embankments) তৈরি রয়েছে। তবে বর্ষার সময় গন্ডকের তীব্র স্রোতে মাঝে মাঝে এই বাঁধগুলোতে ভাঙনের ঝুঁকি দেখা দেয়।

বিহার সরকারের জলসম্পদ দপ্তর তাই বর্ষা শুরুর আগেই ড্রোন নজরদারি, জিও-ব্যাগ এবং বোল্ডার পিচিংয়ের মাধ্যমে বাঁধগুলোর দুর্বল অংশ চিহ্নিত করে মেরামতের কাজ চালায়। স্থানীয় প্রশাসন, ইঞ্জিনিয়ার এবং সীমান্তরক্ষীদের সার্বক্ষণিক নজরদারি এই বাঁধগুলোকে যেকোনও বিপর্যয় থেকে অক্ষত রাখে। (Gandak Barrage)

বিপর্যয় থেকে সমৃদ্ধি: কৃষিতে বৈপ্লবিক প্রভাব

গন্ডক ব্যারেজ কেবল বন্যা নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি উত্তর বিহার এবং পূর্ব উত্তরপ্রদেশের কৃষি অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়মিত বর্ষণের কারণে বর্তমান সময়ে পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা দিন দিন আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও নেপাল সীমান্তের গন্ডক ব্যারেজ দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও দূরদর্শী সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য নিদর্শন। (Gandak Barrage)


Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন


Exit mobile version