ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান মিলেমিশে যেই শহরে চলে সেটা হলো হায়দরাবাদ। নিজ়ামদের শহর এখন ভারতের IT হাব। অন্যতম পুরোনো এই শহরের অলিতে-গলিতে রয়েছে ইতিহাস। পুরোনো দিনের গলি থেকে আধুনিক বিল্ডিং, সব মিলিয়ে হায়দরাবাদকে বাকি শহরগুলোর থেকে আলাদা করেছে। এই প্রতিবেদনে জেনে নিন, History of Hyderabad.
Table of Contents
কুতুব শাহি রাজবংশ ও হায়দরাবাদের জন্ম (History of Hyderabad)
হায়দরাবাদের ইতিহাস লিখতে গেলে এই রাজবংশকে দিয়ে শুরু করতে হবে। তাদের হাত ধরেই শুরু হয় হায়দরাবাদের ইতিহাস। ১৫৯১ সালে এই রাজবংশের পঞ্চম সুলতান কুলি কুতুব শাহ হায়দরাবাদের প্রতিষ্ঠা করেন। তবে কুতুব শাহি বংশের প্রথম রাজধানী এটা ছিল না। ছিল গোলকোন্ডা (যার প্রমাণ এখন গোলকোন্ডা ফোর্ট)।
পঞ্চম সুলতান কুলি কুতুব শাহ শাসনভার গ্রহণ করার পর তিনি তাঁর প্রিয় স্ত্রী ভাগমতীকে একটি শহর উপহার দেন। সেটির নাম দেন ভাগনগর। কথিত আছে, ভাগমতী ইসলাম ধর্মগ্রহণর করার পর শহরের নাম বদলে হয় হায়দরাবাদ, অর্থাৎ, হায়দর শাহের শহর।
ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের মিলনস্থল, হায়দরাবাদের চারমিনার মার্কেট
তবে গোলকোন্ডা থেকে ভাগনগর বা বর্তমানে হায়দরাবাদকে রাজধানী করার পিছনে কুতুব শাহর ছিল অনেক পরিকল্পনা। সেই সময়ে শত্রুপক্ষের থেকে নিজের রাজধানীকে বাঁচানোর জন্য রাজারা এমন একটা শহর খুঁজতেন যেটা সুরক্ষিত হতো। আর হায়দরাবাদের পাশে মুসি নদী থাকায় এটাই ছিল শহর তৈরির সবচেয়ে ভালো জায়গা। সুলতান কুলি কুতুব শাহ হায়দরাবাদকে পরিকল্পনা করে তৈরি করেছিলেন।
কুতুব শাহি রাজত্বে ছিল শিল্পকলা, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির দাপট। এই সময়েই তৈরি করা হয় চারমিনার। চারটে মিনার যেহেতু রয়েছে তাই এর নাম চারমিনার। এটি আজও হায়দরাবাদের প্রতীক। তবে হায়দরাবাদের প্রতীক এই চারমিনার তৈরি হয়েছিল মহামারির সময়ে। এর পাশাপাশি সেই সময়ে বহু মসজিদ, প্রাসাদ এবং দুর্গ নির্মিত হয়েছিল। যারমধ্যে একটি গোলকোন্ডা ফোর্ট। একবার গেলে বোঝা যায়, কেন এই বংশ শিল্প ও সংষ্কৃতির দিক থেকে বাকিদের থেকে আলাদা ছিল। পাশাপাশি এই সময়ে ফার্সি, উর্দু এবং তেলুগু ভাষার বিকাশ হয়। (History of Hyderabad)
মুঘল এবং নিজ়ামদের আগমন
১৬৮৭ সালে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজ়েব গোলকোন্ডা দুর্গ আক্রমণ করেন ও সহজেই জিতে যান। ফলে পতন হয় কুতুব শাহি রাজবংশের। তিনিও হায়দরাবাদকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র করে তোলেন। তবে সেটাও বেশিদিন ছিল না।
১৭১২ সালে মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়র কামার-উদ-দিন সিদ্দিকীকে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার বা গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৭১৯ সালে তিনি হায়দরাবাদে এসে নিজস্ব শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ়াম উপাধি গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তাঁর বংশধররা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত হায়দরাবাদ শাসন করেন।
নিজ়ামদের রাজত্ব: শিল্প, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ
হায়দরাবাদকে মুক্তর শহর বলার পাশাপাশি এটাকে নিজ়ামদের শহরও বলা হয়। কারণ নিজ়ামরা একটা লম্বা সময় এই শহরকে শাসন করেছে। এই নিজ়ামদের শাসনকালকে বলা হয় হায়দরাবাদের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এই সময়ে শিল্প, সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করে শহর। নিজ়ামরা ছিল ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজবংশ। (History of Hyderabad)
Pakistan Village in Bihar: ভারতের মধ্যে রয়েছে এক টুকরো পাকিস্তান, জানুন ইতিহাস
নিজ়ামদের শাসনকালে হায়দরাবাদে একাধিক সুন্দর ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- চৌমহল্লা প্যালেস: নিজ়ামদের বাসস্থান।
- ফলকনুমা প্যালেস: একটি অসাধারণ সুন্দর ইতালীয় ধাঁচের প্রাসাদ, যা এখন একটি বিলাসবহুল হোটেল।
- মেহেলাশাহী: একটি সুন্দর প্রাসাদ যা সপ্তম নিজ়ামের শাসনকালে নির্মিত হয়েছিল।
নিজ়ামদের আমলে হায়দরাবাদের সংস্কৃতিতে ফরাসি এবং তুরষ্কের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। উর্দুকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং উর্দু সাহিত্য ও কাব্য চর্চার কেন্দ্র হিসেবে হায়দরাবাদ পরিচিতি লাভ করে।
ব্রিটিশ শাসনকাল ও হায়দরাবাদের পরিবর্তন
ব্রিটিশরা আসায় হায়দরাবাদের ছবিটা কিছুটা বদলাতে থাকে। ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, ইংরেজদের আগমন ঘটে এই শহরে। হায়দরাবাদ তখন স্বাধীন রাজ্য হিসেবে থাকলেও, ব্রিটিশদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ব্যবসার অছিলায় ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে শহরের সবকিছুতে নাক গলাতে থাকে। তবে শহরের মানুষরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একাধিকবার রুখে দাঁড়িয়েছেন। ১৮৫৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে, হায়দরাবাদও আন্দোলনে যুক্ত হয়। (History of Hyderabad)
স্বাধীনতা পরবর্তী হায়দরাবাদ
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর হায়দরাবাদের ছবিটা বদলায়। নিজ়ামরা চেয়েছিল স্বাধীন থাকতে, ভারতের অধীনে আসতে চায়নি তারা। যেহেতু হায়দরাবাদের অবস্থান ভারতের একদম মাঝামাঝি তাই তারা না যোগ দিলে ভারত রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হচ্ছিল না।
এই কারণে ১৯৪৮ সালে ভারত সরকার ‘অপারেশন পোলো’ নামে একটি সামরিক অভিযান চালায় এবং হায়দরাবাদকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৫৬ সালে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের পর হায়দরাবাদ রাজ্যের কিছু অংশ অন্ধ্রপ্রদেশের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং নতুন রাজ্যের রাজধানী হয়। এরপর থেকে হায়দরাবাদ অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী হয়। এখন অন্ধ্রপ্রদেশ ভাগের পর হায়দরাবাদ তেলঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী।
আধুনিক হায়দরাবাদ: প্রযুক্তির কেন্দ্র
বর্তমানে হায়দরাবাদ যেভাবে এগোচ্ছে তাতে তারা ঐতিহ্যর সঙ্গে আধুনিকতার মিশ্রণ তৈরি করেছে। ঐতিহাসিক পরিচয় ছাড়াও হায়দরাবাদ আধুনিক, দ্রুত বর্ধনশীল একটি শহর। এটি ভারতের সিলিকন ভ্যালি নামে পরিচিতি লাভ করেছে। একদিকে City of Pearls ও অন্যদিকে Silicon Valley নাম। এখান থেকেই বোঝা যায় কীভাবে শহরটা ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে নিয়ে চলছে। এখানে গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজ়নের মতো বড় সংস্থার প্রধান কার্যালয় রয়েছে। (Hyderabad Historical Places)
হায়দরাবাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
হায়দরাবাদের সংস্কৃতি বৈচিত্র্যপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। এখানকার সংস্কৃতিতে নিজ়ামদের প্রভাব আজও দেখা যায়। বিরিয়ানি, হালিম এখানকার অন্যতম সেরা খাবার।
হায়দরাবাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান (Hyderabad Historical Places)
- চারমিনার: হায়দরাবাদের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং পরিচিত স্থান। এটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং কুতুব শাহী যুগের স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এটা শহরের পরিচিতি।
- গোলকোন্ডা ফোর্ট: কুতুব শাহী শাসকদের সামরিক ঘাঁটি ও প্রথম রাজ্য।
- চৌমহল্লা প্যালেস: নিজ়ামদের প্রাসাদ, যা তাদের আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাত্রার সাক্ষী।
- মক্কা মসজিদ: ভারতের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ, যা কুতুব শাহী শাসকদের দ্বারা নির্মিত।
- হুসেন সাগর: একটি বিশাল হ্রদ, যা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
- সালার জং মিউজ়িয়াম: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা, যেখানে বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।
- নেহরু জ়ুওলজিক্যাল পার্ক: বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান।
হায়দরাবাদের তথ্য প্রযুক্তি এবং বায়োটেকনোলজি শিল্পে প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে। শহরের এই আধুনিক রূপান্তর একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে তেমনি তার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকেও ধরে রেখেছে। এখানে পুরোনো এবং নতুন হায়দরাবাদের একটি সুন্দর মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়, যা শহরটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। (History of Hyderabad)
হায়দরাবাদের ইতিহাস কেবল একজন শাসক বা একটি রাজবংশের গল্প নয়, এটি সময়ের সঙ্গে একটি শহরের পরিবর্তন এবং বিবর্তনের গল্প। যা একজন মানুষের জীবনে একটা বড় শিক্ষা।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
FAQ
Hyderabad Historical Places
চারমিনার: হায়দরাবাদের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং পরিচিত স্থান। এটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং কুতুব শাহী যুগের স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এটা শহরের পরিচিতি।
গোলকোন্ডা ফোর্ট: কুতুব শাহী শাসকদের সামরিক ঘাঁটি ও প্রথম রাজ্য।
চৌমহল্লা প্যালেস: নিজ়ামদের প্রাসাদ, যা তাদের আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাত্রার সাক্ষী।
মক্কা মসজিদ: ভারতের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ, যা কুতুব শাহী শাসকদের দ্বারা নির্মিত।
হুসেন সাগর: একটি বিশাল হ্রদ, যা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
সালর জং মিউজ়িয়াম: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা, যেখানে বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।
নেহরু জ়ুওলজিক্যাল পার্ক: বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান।
কুতুব শাহি বংশের প্রথম রাজধানী কী ছিল?
গোলকোন্ডা
হায়দরাবাদের আগের নাম কী ছিল?
পঞ্চম সুলতান কুলি কুতুব শাহ শাসনভার গ্রহণ করার পর তিনি তাঁর প্রিয় স্ত্রী ভাগমতীকে একটি শহর উপহার দেন। সেটির নাম দেন ভাগনগর। কথিত আছে, ভাগমতী ইসলাম ধর্মগ্রহণর করার পর শহরের নাম বদলে হয় হায়দরাবাদ, অর্থাৎ, হায়দর শাহের শহর।

