তাজমহল, কুতুব মিনার, স্ট্যাচু অফ ইউনিটি, ভিক্টোরিয়া এগুলো ভারতের কোথায় রয়েছে সেটা জিজ্ঞাসা করলে সকলে এক নিঃশ্বাসে বলে দিতে পারবেন। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় Burning City of India কোথায়? বা কাকে বলা হয়? সেটা অনেকেই বলতে পারবেন না। আর না পারাটাই স্বাভাবিক, কারণ এটা রয়ে গিয়েছে প্রচারের আলো থেকে দূরে। জেনে নিন ভারতের এমন একটা শহরের ব্যাপারে যেটা গত ১০০ বছর ধরে জ্বলছে।
Table of Contents
ইংরেজ আমল থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী কয়লা। বিদ্যুৎ যেখানে আছে সেখানেই দরকার কয়লার। এই কালো হীরের সঙ্গে যুক্ত থেকে অনেকের সংসার চলে। আর এই কালো হীরেই একটা গ্রামকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে, সঙ্গে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে সেখানকার মানুষের ভবিষ্যৎ।
Jharia Burning City of India: ১০০ বছর ধরে জ্বলছে আগুন
ঝাড়খণ্ডের ধনবাদ জেলায় অবস্থিত ঝরিয়া। শৈশবের ভুগোল বইতে এই ঝরিয়ার নামটা সকলেই পড়েছেন। কিন্তু সকলেই ঝরিয়াকে জানেন বিপুল কয়লা ভান্ডারের জন্য। কিন্তু এই কয়লাই যে ১০০ বছর ধরে জ্বলছে সেটা কেউ তুলে ধরে না।
এই ঝরিয়ার মাটি সবসময়ই উত্তপ্ত, মাটির বিভিন্ন ফাটল থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা বেরোয়। এই আগুন শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ সম্পদের ক্ষতি করছে না, বরং এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে এক কঠিন সংকটের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই ঝরিয়া যা এক সময়ে ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের কয়লা রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ ব্রাত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
African tribe in India: দেশের মধ্যে এক টুকরো আফ্রিকা, চিনে নিন গুজরাটের জাম্বুর গ্রামকে
Jharia-র ইতিহাস ও কয়লার প্রভাব
এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কোকিং কয়লার ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। কোকিং কয়লা ইস্পাত শিল্পে অপরিহার্য, যা ঝরিয়ার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ১৯০০ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং ২০০০ শতাব্দীর শুরুতে, ঝরিয়ায় কয়লা উত্তোলনের কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হয়। রেল লাইন স্থাপন করা হয়, এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে কয়লা উত্তোলন করা হয়। তৎকালীন সময়ে, ঝরিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ছিল অন্যতম সমৃদ্ধশালী। কয়লা শিল্পকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসতেন এই ঝরিয়াতে চাকরি করতে। কিন্তু এর পিছনেই ছিল বিপদ।
লাইফলাইন কয়লাই গ্রাস করছে গ্রামকে
১৯১৬ সালে, ঝরিয়ার প্রথম ভূগর্ভস্থ আগুনের ঘটনাটি সামনে আসে। প্রাথমিকভাবে, এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করা হয়েছিল, ফলে সরকারি আধিকারিকরা কেউই বিষয়টিকে অত গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়ে এবং এক ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে।
১৯৩০ সাল নাগাদ, একাধিক জায়গায় আগুনের শিখা দেখা যেতে শুরু করে এবং এটি দ্রুত সমগ্র খনি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে, বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ঝরিয়ার প্রায় ১০০টিরও বেশি স্থানে আগুন জ্বলছে এবং এটি প্রায় ৩৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই আগুন জ্বলছে, যা পৃথিবীর বুকে এক বিরল ঘটনা। এই কারণেই Jharia Burning City of India-র তকমা পেয়েছে।

ঝরিয়ায় কেন জ্বলছে আগুন?
এর নেপথ্যে রয়েছে কয়লা উত্তোলন। তৎকালীন সময়ে, মাটির নিচ থেকে কয়লা তোলার জন্য ‘বোর্ড অ্যান্ড পিলার’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। এখানে কয়লা তোলার জন্য সুড়ঙ্গ তৈরি করা হতো। আর এই সুড়ঙ্গগুলোর ছাদকে ধরে রাখার জন্য মাঝে স্তম্ভ দেওয়া হতো। এই স্তম্ভগুলো তৈরি করা হতো কয়লা দিয়েই। এতদূর পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। সমস্যা বাড়ে এর পর।
প্রতিদিন সেই খনি থেকে কয়লা বের করা হয়, পাশাপাশি মাটির উপর চাপ বাড়তে থাকে। এর ফলে খনির ছাদে চাপ বাড়ে। যার ফলে কিন্তু কিছু জায়গায়, এই স্তম্ভগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভেঙে যায়, এর ফলে বাইরের হাওয়া ভূগর্ভে প্রবেশ করে। বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে কয়লা জ্বলে ওঠে এবং সেটা থেকেই এই ছবি।
Pakistan Village in Bihar: ভারতের মধ্যে রয়েছে এক টুকরো পাকিস্তান, জানুন ইতিহাস
কেন ঝরিয়ার ভূগর্ভে আগুন জ্বলছে?
Jharia-র ভূগর্ভস্থ আগুনের প্রধান কারণ হলো অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত খনি খনন। ব্রিটিশ এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় খনি কোম্পানিগুলি লাভের জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণ কয়লা উত্তোলনের দিকে নজর দিয়েছিল। ফলে দ্রুত আয়ের লক্ষ্যে আইন ভাঙতে থাকে। সুরক্ষা এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিগুলিকে দূরে সরিয়ে রেখে বেশি পরিমাণে কয়লা তোলার দিকে জোর দেয়। বেশি কয়লার লোভে অনেক সময়ে কয়লার স্তরের মাঝে থাকা স্তম্ভগুলিও কেটে ফেলা হতো, যা খনিরর ছাদকে দুর্বল করে দিত এবং মাটির নিচে হাওয়া সহজেই প্রবেশ করত।
খনি শ্রমিকরা, বিশেষ করে স্থানীয় গ্রামের মানুষরা বাড়তি আয়ের জন্য সরকার স্বীকৃত কয়লা খনির বাইরেও বাড়তি আয়ের জন্য ছোট ছোট গর্ত করে কয়লা তুলত। এই ধরনের অবৈধ এবং অপরিকল্পিত খনি খনন মাটির উপরের স্তরকে দুর্বল করে দেয় এবং খনির ভিতরে হাওয়া অবাধে প্রবেশ করে। এছাড়াও, খনি অঞ্চলে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। যখন কোনও জায়গায় আগুন লাগতো, তখন তা নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রযুক্তি বা পরিকাঠামো ছিল না। ফলে আগুন ধীরে ধীরে আরও গভীরে এবং আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
১৯১৬ সালের প্রথম আগুন লাগার পর ১৯৮০-র দশকে, ভারতের কয়লা শিল্পকে জাতীয়করণ করার পর ভারত কোকিং কোল লিমিটেড (BCCL) গঠিত হয়, এবং তখন থেকেই এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু আগুন এতটাই বিস্তৃত এবং গভীর হয়ে গিয়েছিল যে, তা নিয়ন্ত্রণ করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ভূগর্ভস্থ আগুনের ফলে কয়লার বিশাল ভান্ডার ধ্বংস হচ্ছে, এবং পরিবেশগতভাবেও এটি একটি বড় বিপর্যয়। বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হচ্ছে, যা বায়ু দূষণ ঘটাচ্ছে, এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তরকে প্রভাবিত করছে।

ঝরিয়ার স্থানীয় মানুষের জীবন ও সংগ্রাম
ঝরিয়ার মাটির নিচে আগুন জ্বলায় আমরা আপনারা হয়তো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি না, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এই জ্বলন্ত মাটির উপর বসবাস করেন। Burning City of India-তে বাস করা মানুষদের কাছে, প্রতিদিনের জীবন এক সংগ্রাম। কারও বাড়ির পাশে ফাটল দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে, ফলে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। কারও বাড়িটাই ধসে আগুনের গ্রাসে চলে গেছে। কয়লা পুড়লে সেখান থেকে বিষাক্ত গ্যাস যেমন কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড এবং অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে মিশে যাচ্ছে। সেই গ্যাস প্রতি মুহূর্তে স্থানীয় মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করছে। শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, এবং ফুসফুসের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত স্থানীয়রা। ত্বক এবং চোখের সমস্যাও দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী এবং খনি শ্রমিকরা এই বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই আগুন দেখে গেছেন, আমরাও দেখছি। এই আগুন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।’
সরকারের পদক্ষেপ ও সমাধান প্রচেষ্টা
ঝরিয়ার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৯৮০-র দশকে BCCL গঠনের পর থেকেই ভূগর্ভস্থ আগুন নেভানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফায়ার ফাইটিং ডাইক (Fire Fighting Dykes) নির্মাণ, জল এবং বালি ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা, এবং ক্ষেত্র বিশেষে খনির কিছু অংশ বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু এই প্রচেষ্টাগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়নি, কারণ আগুনের গভীরতা এবং বিস্তৃতি এতটাই বেশি যে, প্রচলিত পদ্ধতিগুলি কার্যকর হচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে, ভারত সরকার একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে, যা ঝরিয়া মাস্টার প্ল্যান (Jharia Master Plan) নামে পরিচিত। ২০০৯ সালে এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল ঝরিয়ার ভূগর্ভস্থ আগুনকে সম্পূর্ণভাবে নিভিয়ে ফেলা এবং এখানকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন দেওয়া। এই মাস্টার প্ল্যানের অধীনে প্রায় ৬৪টি নির্দিষ্ট এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে আগুন নেভানোর কাজ এবং পুনর্বাসনের কাজ করা হবে। এই প্রকল্পে প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে।
মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থানে বালি দিয়ে ফাটল বন্ধ করা, ইনজেকশন গ্রাউটিং (injection grouting) এবং অন্যান্য আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিপজ্জনক এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলিকে নতুন তৈরি করা কলোনি বা অ্যাপার্টমেন্টে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। কিন্তু দ্রুতগতিতে এই কাজ না করায় এখনও অনেক মানুষ আগুনের মধ্যেই থাকছেন।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
FAQ
Burning City of India কোথায় অবস্থিত?
ঝাড়খণ্ডের ঝরিয়াকে Burning City of India বলা হয়।
কত বছর ধরে জ্বলছে ঝরিয়া?
1916 সাল থেকে।
কেন ঝরিয়ার ভূগর্ভে আগুন জ্বলছে?
কয়লা তোলার জন্য খনি খনন করা হতো। সেই খনির ছাদে দেওয়া থাকত কয়লার স্তম্ভ। সেই স্তম্ভগুলো ভেঙে যাওয়ায় বাইরের হাওয়া ভিতরে প্রবেশ করে এবং তাতেই অক্সিজেনের সঙ্গে কয়লার সংমিশ্রণ হয়ে আগুন ধরে যায়।
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

















