একটি ট্রেন কেবল এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় যায় না বা যাত্রীদের নিয়ে যায় না, প্রতিটা ট্রেন একটা চলন্ত ইতিহাস। তেমনই একটি ট্রেন হলো Saraighat Express. হাওড়া থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত প্রতিদিন চলে এই ট্রেন। যাকে ট্রেনযাত্রীরা মজা করে উত্তর পূর্বের রাজধানী এক্সপ্রেসও বলেন। কারণ এটা রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো পরিষেবা দেয়। কিন্তু কোনও দিন ভেবে দেখেছেন সরাইঘাট এক্সপ্রেসে ‘সরাইঘাট’ নামটা এল কোথা থেকে? এই ট্রেনের পথে সরাইঘাট বলে কোনও স্টেশনও তো পড়ে না। চলুন জেনে নিই এর ইতিহাস।
Table of Contents
Saraighat Express: বাংলা ও অসমের লাইফলাইন
প্রতিদিন দুটো করে সরাইঘাট এক্সপ্রেস চলে (Saraighat Express Time Table)। একটি যায় হাওড়া থেকে গুয়াহাটি, যেটির নম্বর ১২৩৪৫। আর অন্যটি গুয়াহাটি থেকে হাওড়া আসে, যেটির নম্বর ১২৩৪৬। হাওড়া থেকে ছাড়ে বিকেল ৪টে ৫ মিনিটে আর গুয়াহাটি পৌঁছয় পরের দিন সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে। গুয়াহাটি থেকে ট্রেনটি ছাড়ে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে এবং হাওড়ায় পৌঁছয় পরের দিন বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে। ১৭ ঘণ্টায় ট্রেনটা ১০০৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।
ট্রেনের ইতিহাস ও গুরুত্ব
সরাইঘাট এক্সপ্রেসের জন্ম হয় ভারতীয় রেলের প্রয়োজনে। স্বাধীনতার পর উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্রুত উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী রেল যোগাযোগ দরকার ছিল। কারণ মাঝে ব্রহ্মপুত্র থাকায় দ্রুত যাতায়াত করা যেত না। ফেরি দিয়ে পারাপার করতে হলো এবং অসমের তীব্র বর্ষায় ব্যাহত হতো সেই যোগাযোগ। কিন্তু যখন ব্রহ্মপুত্র নদের উপর সরাইঘাট সেতু নির্মাণ হলো, তখন রেল যোগাযোগে এক নতুন বিপ্লব আসে।

সরাইঘাট এক্সপ্রেস অসমের ব্যবসায়িক পণ্য, যাত্রী এবং জীবনযাত্রাকে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে। লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি ট্রেন নয়, এটি লাইফলাইন। কারণ দেশের বাকি প্রান্ত থেকে উত্তর পূর্বে যেতে গেলে পশ্চিমবঙ্গ ও অসম হয়ে যেতেই হবে। তাই এই ট্রেনটি লাইফলাইন। তাই অসম এক্সপ্রেস বা কামরূপ এক্সপ্রেসের মতোই অন্য ট্রেনের পাশাপাশি সরাইঘাট এক্সপ্রেস গুরুত্বপূর্ণ।
সরাইঘাট নামটা কোথা থেকে এল?
ট্রেনের নামের উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ১৬৭১ সালের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে ফিরে যেতে হবে—সেই সময়, যখন সরাইঘাট ছিল অসমীয়া শৌর্য্যের এক অবিস্মরণীয় কেন্দ্র।
সরাইঘাট স্থানটি কোথায় অবস্থিত?
আপনি দৈনন্দিন অসমের খবর শুনলে সরাইঘাটের কথা পাবেন না। বা অসমের বড় শহরের তালিকায় সরাইঘাট নেই। কারণ এটি কোনও বড় শহর নয়। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদের পাশে অবস্থিত এটি অসমের পরিচিতি। সরাইঘাটের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদ কিছুটা সরু হয়েছে। অতীতে সামরিক দিক থেকে এই সংকীর্ণ পথটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নিয়ন্ত্রণ করলে সমগ্র অসমের প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত বা রুদ্ধ করা যেত। ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে এই এলাকাটি আহোম রাজাদের রাজত্ব বাঁচানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এর ভৌগলিক স্থান। নদীর দুই তীরে রয়েছে পাহাড় ও ঘন জঙ্গল। ফলে সরাইঘাট জায়গাটা সুরক্ষিত ছিল। শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করতে গেলে পাহাড়, জঙ্গল, নদী পেরিয়ে আক্রমণ করতে হতো।
আরও পড়ুন: জ্বলছে 100 বছরেরও বেশি সময় ধরে, জেনে নিন Burning City of India-র গল্প
১৬৭১ সাল : সরাইঘাটের যুদ্ধ
১৬৭১ সালের সরাইঘাটের যুদ্ধ ছিল আহোম সাম্রাজ্য এবং মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্যে এক সামরিক সংঘাত। মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব অসমকে দখল করতে চেয়েছিলেন, কারণ এই অঞ্চলটি ছিল বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মুঘল সেনাপতি রাজা রাম সিং প্রায় ৩০,০০০ পদাতিক সৈন্য, ১৮,০০০ অশ্বারোহী এবং প্রচুর সংখ্যক যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে অসম জয় করতে যান।
সেই সময়ে অসমের নেতৃত্বে ছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি লাচিত বরফুকন। তাঁর উপর দায়িত্ব পড়ে মুঘলদের আটকানোর। এই যুদ্ধটি মূলত নৌ-যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত লাভ করে, যা ব্রহ্মপুত্রের জলপথে হয়েছিল। অস্ত্র ও যোদ্ধাদের দিক থেকে মুঘলরা অনেকটাই এগিয়ে ছিল। কিন্তু তাদের বিশাল শক্তি ও সেনাদের দাপটে সামনে লড়াই করেন লাচিত বরফুকন। তাঁর কৌশলের কাছে পরাস্ত হয় মুঘলরা।

লাচিত বুঝেছিলেন মুঘলদের স্থলপথে হারানো যাবে না, তাই তিনি জলপথে লড়াই করেন। যেহেতু তিনি ও তাঁর সৌন্য ব্রহ্মপুত্রকে ভালো করে চিনতেন তাই তিনি সেটাকে কাজে লাগান। তাঁর বাহিনী ছিল নৌ-শিক্ষায় দক্ষ। তিনি নদীর সংকীর্ণ অংশে এমনভাবে নৌকা সাজিয়েছিলেন এবং এমনভাবে ছোট ছোট রণতরী ব্যবহার করেছিলেন যে, মুঘলদের বড় বড় যুদ্ধজাহাজগুলি তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে আক্রমণ করতে পারেনি।
কথিত আছে, যুদ্ধের সময়ে লাচিত যখন গুরুতর অসুস্থ, তখন শত্রুদের আক্রমণে আহোম সৈন্যরা পিছু হঠতে শুরু করে। সেই সময়ে লাচিত নিজের হাতে তলোয়ার তুলে নিয়ে বলেন, ‘মুঘলদের হাতে আমার দেশ ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে আমার মৃত্যু শ্রেয়!’ এর পর আহোম সৈন্যরা ফের আক্রমণ করে ও মুঘলরা পরাজিত হয়ে অসম ছাড়া হয়। এই জয় কেবল একটি সামরিক জয় ছিল না, এটি ছিল অসমীয়া জাতির স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে, সামরিক কৌশল এবং দেশপ্রেমের কাছে বৃহত্তর সামরিক শক্তিও মাথা নত করতে বাধ্য। সরাইঘাটের এই গৌরবময় অধ্যায় আজও অসমীয়াদের জাতীয় চেতনায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
আরও পড়ুন: নদীর উপরে আস্ত রেল স্টেশন, ভারতেই রয়েছে এই বিষ্ময়, জানুন কোথায়
সেই সরাইঘাট যুদ্ধকে স্মরণ করেই ভারতীয় রেল সরাইঘাট এক্সপ্রেসের নাম দেয়।
সরাইঘাট সেতুর প্রয়োজনীয়তা ও নির্মাণ ইতিহাস
দীর্ঘদিন ধরে ব্রহ্মপুত্র নদটি ছিল অসম এবং দেশের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে একটি বাধা। গুয়াহাটির কাছে এই নদী পার হতে ফেরি পারাপারই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু দ্রুত উন্নয়ন এবং সামরিক পরিবহণের প্রয়োজনে একটি স্থায়ী রেল ও সড়ক সেতু নির্মাণ করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
ভারতীয় রেল এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এবং ১৯৬২ সালে ঐতিহাসিক সরাইঘাট সেতু তৈরি করে। এটি ছিল ভারতের প্রথম রেল-সহ-সড়ক সেতু। এটি তৈরি করা হয় ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর। এটি একটি দ্বৈতস্তর বা ডাবল ডেকার সেতু। সেতুর নিচের অংশটি রেল চলাচলের জন্য এবং উপরের অংশটি সড়ক পরিবহণের জন্য। এই সেতু নির্মাণের ফলে পরিবহন ব্যবস্থায় এক বিপ্লব আসে—ফেরি পারাপারের দিন শেষ হয় এবং উত্তর-পূর্ব ভারত রেল ও সড়কপথে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়।
বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর চারটে সেতু আছে। সরাইঘাট, নরনারায়ণ, কলিয়াভ্রমরা, বগিবিল সেতু।

সরাইঘাট সেতুর গুরুত্ব ও ট্রেনের ওপর প্রভাব
সরাইঘাট সেতুর নির্মাণ শুধু পরিবহণের সময় কমায়নি, এটি অসমের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করে। পূর্বে যেখানে রেল যাত্রার জন্য লম্বা পথ ঘুরে যেতে হতো অথবা ফেরি পারাপারের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেখানে এই সেতু সরাসরি রেললাইন স্থাপন সম্ভব করে তোলে।
সরাইঘাট এক্সপ্রেস এই সেতুর মাধ্যমে সরাসরি গুয়াহাটিতে প্রবেশ করে, যার ফলে ট্রেনটির যাত্রা কেবল দ্রুতই নয়, বরং সারা বছর ধরে নির্বিঘ্নে থাকে। এই ট্রেনে করে খাবার, ব্যবসার জিনিস, সেনা যাতায়াত করে।
সরাইঘাট এক্সপ্রেস নামটি তাই কেবল একটি ভৌগোলিক অবস্থানকে নির্দেশ করে না; এটি একই সঙ্গে অতীতের শৌর্য্য এবং ভবিষ্যতের উন্নয়নের মধ্যেকার একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন। যখন এই ট্রেনটি ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে সরাইঘাট সেতু পার হয়, তখন তা যেন নীরবভাবে লাচিতের বীরত্ব এবং আধুনিক ভারতের প্রকৌশলগত সাফল্য—দুটোকেই শ্রদ্ধা জানায়।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
Saraighat Express Time Table
প্রতিদিন দুটো করে সরাইঘাট এক্সপ্রেস চলে। একটি যায় হাওড়া থেকে গুয়াহাটি, যেটির নম্বর ১২৩৪৫। আর অন্যটি গুয়াহাটি থেকে হাওড়া আসে, যেটির নম্বর ১২৩৪৬। হাওড়া থেকে ছাড়ে বিকেল ৪টে ৫ মিনিটে আর গুয়াহাটি পৌঁছয় পরের দিন সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে। গুয়াহাটি থেকে ট্রেনটি ছাড়ে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে এবং হাওড়ায় পৌঁছয় পরের দিন বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে। ১৭ ঘণ্টায় ট্রেনটা ১০০৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।
সরাইঘাট এক্সপ্রেস নামের ইতিহাস
অসমের সরাইঘাটে আহোম রাজত্ব ও মুঘলদের মধ্যে লড়াই হয়। ব্রহ্মপুত্রের উপর সেই লড়াই জেতে আহোমরা এবং মুঘলরা হেরে গিয়ে পালিয়ে যায়। সেই জায়গায় ভারতীয় রেল একটি ব্রিজ তৈরি করে। সেই ব্রিজের নাম দেয় সরাইঘাট সেতু। পরে সেই ব্রিজ দিয়ে ট্রেন চলাচল করলে সেটির নাম হয় সরাইঘাট এক্সপ্রেস।
লাচিত বরফুকন কে ছিলেন?
আহোম সাম্রাজ্যের সেনাপতি ও একজন যোদ্ধা।
ব্রহ্মপুত্র নদের উপর কী কী সেতু আছে?
সরাইঘাট, নরনারায়ণ, কলিয়াভ্রমরা, বগিবিল সেতু। মোট চারটি সেতু।
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

















