Rahibai Popere Seed Mother: বাড়তে থাকা কংক্রিটের জঙ্গলের জন্য প্রাকৃতিক জঙ্গল এখন হারিয়ে যাচ্ছে। সে পৃথিবীর ফুসফুস অ্যামাজন হোক বা দেশের কোনও অরণ্য। অসাধু ব্যবসায়ী ও উদাসীন সরকার এর নেপথ্যে দায়ি। কিন্তু সব কিছুর তো একটা শেষ থাকে। জঙ্গল বা অরণ্য শেষ হয়ে গেলে কী হবে? এই প্রশ্ন সবার মনে থাকলেও উত্তর কারও কাছে নেই। আর সেই উত্তরের খোঁজে কাজ শুরু করেছেন মহারাষ্ট্রের রাহিবাই পোপেরে (Rahibai Popere)। যিনি এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার কাজ শুরু করেছেন। এই প্রতিবেদনে জেনে নিন তাঁরই ব্যাপারে।
Table of Contents
পশ্চিমঘাট পর্বতমালা—যাকে আমরা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে চিনি। এটি ছড়িয়ে রয়েছে গুজরাট, মহারাষ্ট্র,তামিলনাড়ু, কেরালা, গোয়া, কর্নাটক রাজ্যে। আর এটাই দেশকে বাঁচাচ্ছে। এই ঘন সবুজের আড়ালে এমন এক অমূল্য সম্পদ সংরক্ষিত আছে, যা কোনও ব্যাঙ্ক বা সিন্দুকে নয়, বরং টিকে আছে রাহিবাই পোপেরের নিঃস্বার্থ জেদের উপর। তিনি ভারতের ‘বীজ রক্ষক’ (Seed Mother)।
হারানো স্বাদের সন্ধানে
রাহিবাইয়ের গল্পের শুরুটা হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। বর্তমানে চারিদিকে হাইব্রিডের ভিড়। প্রাকৃতিক বীজের থেকে সেটাকে রাসায়নিক প্রয়োগ করে তৈরি করা হচ্ছে। তিনি দেখেন, আধুনিক হাইব্রিড বীজে চাষ করা ফসল খেয়ে তাঁর নাতি-নাতনিরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তিনি বুঝতে পারেন, যে মাটিতে একসময় পুষ্টিকর দেশি ধান, জোয়ার আর বাজরা চাষ হতো, সেখানে আজ বিষ ঢুকছে। সেই থেকেই তিনি স্থির করেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা যে বীজ ব্যবহার করতেন, তা তিনি খুঁজে বের করবেনই।
এক অদ্ভুত সংগ্রহশালা
রাহিবাঈ কোনও বিজ্ঞানী নন, কিন্তু তাঁর জ্ঞান আজ বড় বড় কৃষিবিজ্ঞানীদেরও হার মানায়। তিনি মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন প্রায় ৫৪টি ফসলের ২০০টিরও বেশি দেশি প্রজাতির বীজ। তাঁর সংগ্রহে এমন সব বীজ আছে যা এখন প্রায় বিলুপ্ত। তাঁর বীজের তালিকায় আছে, খরা সহ্য করতে পারে এমন ধান, অত্যন্ত পুষ্টিকর কালো মটরশুঁটি, আদিম প্রজাতির লঙ্কা ও বেগুন।
নিজের মাটির ঘরে তিনি তৈরি করেছেন এক বীজ ব্যাঙ্ক। মাটির কলসিতে গোবর আর ছাই মাখিয়ে তিনি এই বীজগুলো সংরক্ষণ করেন, যাতে কোনও পোকা না ধরে।
রাহিবাই বিশ্বাস করেন মাটি আমাদের মা। তিনি বলেন, “যদি আমরা মাটিকে বিষ দিই, তবে মাটি আমাদের বিষই ফেরত দেবে।” তিনি শুধু বীজ জমিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, গ্রামের অন্য মহিলাদের নিয়ে তৈরি করেছেন স্বনির্ভর গোষ্ঠী। আজ হাজার হাজার কৃষক তাঁর কাছ থেকে দেশি বীজ নিয়ে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করছেন। আর এটা তিনি করেন নিঃস্বার্থভাবে।
ভারতের 5 রহস্যজনক মন্দির, যা আজও বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরে
বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি
এই কাজের জন্য তিনি কোনও প্রচার করেননি। বর্তমানে প্রচারপ্রিয় দুনিয়ায় তিনি শুধু কাজটাই করেছেন। তাঁর কাজ তাঁর হয়ে প্রচার করেছে। BBC তাঁকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী মহিলার তালিকায় স্থান দিয়েছে। ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করেছে। কিন্তু রাহিবাইয়ের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো তাঁর গ্রামের শিশুদের সুস্থ শরীর আর মাঠের সেই আদি ফসলের গন্ধ।
কেন তাঁর জীবন আজ এত প্রাসঙ্গিক?
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন একের পর এক ফসলি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন রাহিবাইয়ের এই দেশি বীজগুলোই হতে পারে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কারণ এই বীজগুলো প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করতে পারে এবং এগুলো চাষ করতে কোনও নামী কোম্পানির সারের প্রয়োজন হয় না।
রাহিবাই পোপেরের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন মানেই সবসময় নতুনের পেছনে ছোটা নয়; মাঝে মাঝে শিকড়কে আঁকড়ে ধরাটাই আসল অগ্রগতি। পশ্চিমঘাটের এই Seed Mother কেবল ফসলের বীজ রক্ষা করছেন না, তিনি রক্ষা করছেন আমাদের সংস্কৃতি আর আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য। এই কাজটাই যদি দেশের বড় বড় কর্তা ব্যক্তি বা কর্পোরেট জায়ান্টরা করে তা হলে ছবিটা হয়তো অন্যরকম হতে পারত। শরীরে কেমিক্যালের বদলে প্রাকৃতিক খাবার ঢুকত।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

