বাড়ি থেকে আবাসন বা কোনও ফাইভ স্টার হোটেল, রেস্তোরাঁ সব জায়গায় সৌন্দর্যটা খুব গুরুত্ব পায়। প্রত্যেকেই চান তাঁর আশপাশটা যেন সুন্দর হয়। আর এটা করতে ব্যবহার করা হয় পাথর। রং বেরংয়ের পাথর দিয়ে টেবল, চেয়ার, মেঝে বানালে তা সৌন্দর্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। কিন্তু পাহাড় থেকে এই পাথর যারা ভাঙেন তাঁদের অবস্থা কী? তাঁদের প্রত্যেকেই আক্রান্ত সিলিকোসিস রোগে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাথর ভাঙতে গিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে (Silicosis Disease in Rajasthan)। এই নিয়েই আজকের প্রতিবেদন-
Table of Contents
প্রচণ্ড রুক্ষ আর পাথরের ধূসর রঙে মোড়া রাজস্থানের কারাউলি (Karauli, Rajasthan) এলাকা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে প্রকৃতির এক অদম্য শিল্পকর্ম— পাহাড়, পাথর আর শুষ্ক মাটির এক বিশাল ক্যানভাস। কিন্তু এই আপাত শান্ত দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে সিলিকোসিস। যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেষ করে দিচ্ছে।
কারাউলি এলাকার মূল পেশা হচ্ছে খাদানে কাজ। পাথুরে মাটিতে চাষ করা সহজ নয়, আর্থিক দিক থেকে দুর্বল মানুষের কাছে টাকা আয়ের রাস্তা পাথর কাটা। ফলে সেটার উপরেই নির্ভর করে মানুষের জীবনযাত্রা। তা করতে গিয়ে প্রতি বছর সিলিকোসিসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতি বছর মারা যান। কিন্তু এই পেশা থেকে বেরিয়ে আসার পথ নেই, কারণ বিকল্প পেশাও নেই।
কারাউলির পাথর খাদানের জীবন সংগ্রাম (Silicosis Disease in Rajasthan)
কারাউলির খনি এলাকাগুলি এমন এক পরিবেশে, যেখানে আধুনিক সুরক্ষার ব্যবস্থা এখনও স্বপ্ন। এখানকার শ্রমিকেরা বেশিরভাগই আসেন আশপাশের গ্রাম থেকে, যাঁরা চরম দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে এই বিপজ্জনক পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন।
রমেশ নামে এক শ্রমিক, তাঁর বয়স ৪০-এর কোঠায়। কিন্তু দেখলে ৭০ ভেবে ভুল করতে পারেন। খনিতে কাজ করার ফলে শরীরে এই অবস্থা হয়েছে। মাথার উপর চড়া রোদ, নিচে পায়ের পাতা পর্যন্ত পুরু পাথরের গুঁড়ো নিয়ে থাকতে হয়।
রুটি-রুজির বিনিময়ে জীবনের ঝুঁকি
রমেশরা জানেন, এই কাজ কতটা বিপজ্জনক। ড্রিলিং, ব্লাস্টিং এবং পাথর ভাঙার সময় যে সূক্ষ্ম সিলিকা ধূলিকণা (Silica Dust) বাতাসে মেশে, তা খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এই কণাগুলিই হলো সিলিকোসিসের প্রধান উৎস। পাথর ভাঙার সময় বেরনো কণা সরাসরি নাক ও মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসে যায়, আর সেটা থেকে সিলিকোসিস রোগ হয়। (Silicosis Disease in Rajasthan)
খাদানগুলিতে সুরক্ষা ব্যবস্থা বলতে কিছুই নেই। জলের অভাবে ওয়েট ড্রিলিং (Wet Drilling) বা ভেজা পদ্ধতিতে খনন প্রায় অসম্ভব, যা ধূলিকণা বাতাসে মেশা আটকাতে পারত। শ্রমিকদের জন্য মাস্ক বা প্রতিরক্ষামূলক পোশাকের কোনো বন্দোবস্ত নেই। হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক নিজেদের পয়সায় সস্তার কাপড়ের মাস্ক পরেন, যা সূক্ষ্ম সিলিকা কণাকে আটকানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
জ্বলছে 100 বছরেরও বেশি সময় ধরে, জেনে নিন Burning City of India-র গল্প
সিলিকোসিস রোগ কী? (What is Silicosis Disease)
সিলিকোসিস হলো একটি মারাত্মক এবং এমন একটি ফুসফুসের রোগ (Irreversible Lung Disease) যা সারানো যায় না। সিলিকা ধূলিকণা ফুসফুসের ভিতরে প্রবেশ করলে, সেটার বিরুদ্ধে লড়তে পারে না ফুসফুস। সেটা ধীরে ধীরে ফুসফুসে জমাট বেঁধে তা বন্ধ করে দেয়।
সিলিকোসিস রোগের লক্ষণ
রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রমিকেরা সাধারণত এর তীব্রতা বুঝতে পারেন না। রমেশের ক্ষেত্রেও প্রথমে শুকনো কাশি শুরু হয়েছিল, যা তিনি সাধারণ কাশি ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই লক্ষণগুলি মারাত্মক আকার ধারণ করে:
- দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি (Chronic Dry Cough): কাশি চলতেই থাকে, বিশেষ করে রাতে।
- শ্বাসকষ্ট (Shortness of Breath): সামান্য হাঁটাচলাতেও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। যেই কাজটা এক ঘণ্টা টানা করা যেত, সেটা ১০ মিনিট করার পর ক্লান্তি চলে আসত।
- দুর্বলতা (Extreme Weakness): শারীরিক দুর্বলতা এতটাই বেড়ে যায় যে, কাজ ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে হয়।
- বুকে ব্যথা: ফুসফুসের চারপাশের টিস্যু শক্ত হওয়ার কারণে বুকে অসহ্য ব্যথা অনুভূত হয়।
যখন রমেশ স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান, তখন সিলিকোসিস তাঁকে ঘিরে নিয়েছে। এই রোগের কোনও নিশ্চিত চিকিৎসা নেই; একবার শুরু হলে এটি আরও খারাপ হতে থাকে। যা প্রায়শই মৃত্যুর কারণ হয়। এই রোগের করুণ দিক হলো, এটি শুধু শ্রমিককে নয়, পুরো পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। (Silicosis Disease in Rajasthan)
স্বাস্থ্য পরিষেবা ও আইনি অবহেলা: জীবনের থেকে দামি পাথর
সিলিকোসিসের মতো মারাত্মক পেশাগত রোগের ক্ষেত্রে সরকার এবং মালিক পক্ষের একটি বড় দায়িত্ব থাকে, কিন্তু কারাউলিতে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য নেই কোনও পক্ষ।
কারাউলির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে সিলিকোসিস রোগ নির্ণয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে এই রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি যেমন, এক্স-রে এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ফলস্বরূপ, শ্রমিকদের সাধারণ হাঁপানি বা টিবি বলে ভুল চিকিৎসা করা হয়। সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় রোগী আরও দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান। (Silicosis Disease in Rajasthan)
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। বহু শ্রমিক জানেনই না যে তাঁদের রোগের আসল কারণ ধুলো। খনি মালিকেরা শ্রমিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেন না। মজুরি দিয়েই খালাস তাঁরা। এক একজন শ্রমিক দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পান। পাহাড় থেকে পাথর ভেঙে সেটাকে ট্রাকে তোলা পর্যন্ত তাঁদের কাজ।
পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ
রাজস্থান সরকার সিলিকোসিস আক্রান্তদের জন্য কিছু পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ প্রকল্প চালু করেছে। কিন্তু এই প্রকল্পের সুবিধা এখনও সবার কাছে পৌঁছয়নি বলে অভিযোগ। যেখানে পৌঁছেছে সেখানে এই রোগের পুনর্বাসন পাওয়া আরও কষ্টের।
আক্রান্ত শ্রমিক বা তাঁর পরিবারকে প্রথমে রোগের প্রমাণ দিতে হয়। এর জন্য দূরে অবস্থিত সরকারি হাসপাতালে গিয়ে রিপোর্ট করিয়ে সেটা সরকারকে জমা দিতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েকদিন কেটে যায়। কখনও ১৫ বা কখনও ৩০ দিন লাগে। আর এই দিনগুলোতে তাঁরা কাজে যেতে পারেন না। একদিন না গেলে ৪০০ টাকা ক্ষতি। এর ফলে অনেকেই এসব থেকে দূরে থাকেন। (Silicosis Disease in Rajasthan)
ভালোবাসার জন্য ভেঙেছিলেন আস্ত পাহাড়, জেনে নিন মাউন্টেন ম্যান দশরথ মানঝির গল্প
সিলিকোসিস নিরাময়যোগ্য?
যদিও সিলিকোসিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তবে এটিকে আটকানো যায়। হাজার হাজার শ্রমিককে বাঁচাতে হলে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর পদক্ষেপ।
সিলিকোসিসকে আটকাতে কী কী করতে হবে?
সুরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন
- ভেজা খনন পদ্ধতি: সবচেয়ে জরুরি হলো খনন বা ড্রিলিং করার সময় প্রচুর জল ব্যবহার করা, যাতে ধূলিকণাগুলো বাতাসে মিশে যেতে না পারে। মালিকদের জন্য এই পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- বাধ্যতামূলক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম: সমস্ত শ্রমিককে N95 বা তার চেয়ে উন্নত মানের মাস্ক এবং অন্য সুরক্ষা সরঞ্জাম বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে এবং তাদের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- হেলথ চেকআপ: সমস্ত খনি শ্রমিকের জন্য বছরে অন্তত একবার বিনামূল্যে হেলথ চেকআপ এবং এক্স-রে বাধ্যতামূলক করা উচিত।
- তাৎক্ষণিত ক্ষতিপূরণ: রোগ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসনিক জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং পেনশন নিশ্চিত করা জরুরি।
- সচেতনতা এবং শিক্ষা: শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে রোগের কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত শিক্ষা দিতে হবে। (Silicosis Disease in Rajasthan)
রমেশের ছোটো ছেলে সূরজ এখন প্রতিদিন বাবার কাশি আর শ্বাসকষ্ট দেখে বড় হচ্ছে। সূরজ স্বপ্ন দেখে, একদিন সে এই পাথর খাদানের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু সেই মুক্তির জন্য দরকার বিকল্প পেশা। কারাউলির মতো গ্রামে যেটা সম্ভব নয়। এখানে কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া, ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ার মতো সমস্যা রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে অপুষ্টি। এগুলো না মিটতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম খাদানেই কেটে যাবে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
FAQ
What is Silicosis? সিলিকোসিস কী?
সিলিকোসিস হলো একটি মারাত্মক এবং এমন একটি ফুসফুসের রোগ যা সারানো যায় না। সিলিকা ধূলিকণা ফুসফুসের ভিতরে প্রবেশ করলে, সেটার বিরুদ্ধে লড়তে পারে না ফুসফুস। সেটা ধীরে ধীরে ফুসফুসে জমাট বেঁধে তা বন্ধ করে দেয়।
সিলিকোসিস রোগের লক্ষ্মণ কী কী?
দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি (Chronic Dry Cough): কাশি চলতেই থাকে, বিশেষ করে রাতে।
শ্বাসকষ্ট (Shortness of Breath): সামান্য হাঁটাচলাতেও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। যেই কাজটা এক ঘণ্টা টানা করা যেত, সেটা ১০ মিনিট করার পর ক্লান্তি চলে আসত।
দুর্বলতা (Extreme Weakness): শারীরিক দুর্বলতা এতটাই বেড়ে যায় যে, কাজ ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে হয়।
বুকে ব্যথা: ফুসফুসের চারপাশের টিস্যু শক্ত হওয়ার কারণে বুকে অসহ্য ব্যথা অনুভূত হয়।

