দুর্গাপুজোয় বারোয়ারির ছোঁয়া যত বেড়েছে তত বেড়েছে থিম। ছোট, মাঝারি বা বড় যেই পুজোই হোক না কেন প্রতিটাতেই কম বেশি থিম থাকে। আর প্রতিটা থিম একটা বার্তা দিয়ে থাকে। কোনও বার্তা সমাজের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে, আবার কোনও বার্তা থাকে প্রকৃতি, পরিবেশ বা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে। সেই রকমই এবার বার্তা দিচ্ছে বেলঘরিয়া রাণীপার্ক সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি। তাদের এবারের থিম ‘বিপন্ন প্রকৃতি: তবুও প্রেমময় পৃথিবী’।
একদিকে বাড়তে থাকা জনসংখ্যা, অন্যদিকে প্রযুক্তির উন্নতি, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি আমরা বা চলার চেষ্টা করছি। আর এটা করতে গিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃতি। আমরা জেনে বা না জেনে প্রকৃতির ক্ষতি করছি। প্রকৃতি তার অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে অত্যাচার সহ্য করে চলেছে। সব সহ্যের তো শেষ আছে। যে প্রকৃতি আমাদের ধারণ করে সে এখন ধ্বংসলীলায় মত্ত হয়ে নিজের স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে চাইছে।
প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন, অসহায় শৈশব, বিকেলে খেলার মাঠ নেই, প্রাণের উৎস সবুজের ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে নিধন হচ্ছে প্রকৃতির। আর্থিক প্রলোভনে লুব্ধ স্বার্থান্বেষী মানুষ নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন করে এবং জলাভূমি ভরাট করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। এর ফলস্বরূপ মানব এবং প্রাণীকূল দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যদি সমবেত প্রচেষ্টায় বৃক্ষ রোপন ও জলাভূমি সংস্কারের কর্মসূচি গ্রহণ করে, তবে পৃথিবী আবার প্রেমময় ও পরিপূর্ণ আনন্দঘন হয়ে গড়ে উঠবে।
রাণীপার্ক সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি তাদের ৭৭ তম বছরে প্রকৃতির বিপন্নতাকে পুজোর থিম করেছে। সাম্প্রতিক অতীতে শহর ও শহরতলির ভালো পুজোর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বেলঘরিয়া। তার মধ্যে অন্যতম রাণীপার্ক সার্বজনীন। দুর্গোৎসব কমিটি বেলঘরিয়া রাণীপার্ক কালচারাল সেন্টারের সহযোগিতায় বিষয় ভাবনা এবং বৈচিত্র্যে প্রতিবছরই চমকে দিয়ে থাকে। ৭৭তম বছরও ব্যতিক্রম নয়।
Durga Puja 2025: নামমাত্র খরচে এবার ঠাকুর দেখুন এসি বাসে চড়ে, বিশেষ উদ্যোগ রাজ্যের
এবারের মণ্ডপ ভাবনা এবং সৃজনে উৎপল। সহ রূপায়নে মহাদেব ও তুষার। মণ্ডপ ভাবনা এবং বৈচিত্র্য এখানে করা হয় সাবেকিয়ানাকে মাথায় রেখে। থিম যেন পূজোর মূল চিন্তাকে আঘাত না করে সেই কথা মাথায় রেখেছেন উদ্যোক্তারা।
এই বিষয়ে দুর্গাপুজো কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শুভ শঙ্কর সরকার বলেন, ‘আমরা ভালো পুজোর চেষ্টা করি। আমাদের সাধ্য কম। সাধ অনেক। সাবেকিয়ানায় আস্থা রাখি। থিম পুজো মণ্ডপ থেকে প্রতিমায় থাকে, কিন্তু আমরা বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের ঐতিহ্যে আঘাত করি না। সেই ধৃষ্টতা আমাদের নেই। সেভাবে চিন্তাও করি না। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে থিম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করি ঠিকই। তবে তা দর্শকদের কথা চিন্তা করে। যাই করি না কেন বাঙালিয়ানা থেকে সরি না।’
তাঁর কথার রেশ ধরে অন্য যুগ্ম সম্পাদক পার্থ গুহ বলেন, ‘শারদোৎসব বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। আমরা মনে করি, এটাই সবচেয়ে বড় মঞ্চ বার্তা দেওয়ার। সামাজিক সাংষ্কৃতিক সব দিক থেকেই বড় মঞ্চ। সেখানে উৎসবের আনন্দ যেমন থাকবে তেমনই সামাজিক সচেতনাও থাকবে। আমরা এই প্রকৃতির কোলে বাঁচি। যার কোলে বাঁচছি তাকেই আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে ধ্বংস করার কাজ একইভাবে চালিয়ে যাচ্ছি। অব্যক্ত যন্ত্রণা সহ্য করে প্রকৃতি তার ছন্দ ফিরে পেতে চায়। মনে করিয়ে দিতে চায় অসতর্কতায় ক্ষতিটা আমরা নিজেরই করছি। তাই বিপন্নতার কথা যেমন বলছি একই সঙ্গে প্রেমের জয়গানও থাকছে। কারণ প্রেমহীন পৃথিবী মানবিক নয় দানবীয় হয়ে উঠবে। পৃথিবী হবে বাসের অযোগ্য।’
Durga Puja 2025: কলকাতায় কোন মেট্রো স্টেশনের কাছে কোন বিখ্যাত পুজো? জানুন এক ক্লিকে
এই পুজোর উদ্বোধন তৃতীয়াতে। ওইদিনই সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে মণ্ডপ। ৭৭ বছর বয়সে তারা বিপন্ন পৃথিবীকে সচেতন করার ডাক জোরালো করতে চায়। গড়ে তুলতে চায় প্রেমময় পৃথিবী।
কী করে যাবেন রাণীপার্ক সর্বজনীন?
বেলঘরিয়া স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে নেমে বিভা সিনেমাহলগামী যেকোনও টোটো বা অটোতে উঠে রাণীপার্ক স্টপেজে নামতে হবে। নামলেই দেখতে পাবেন রাণীপার্ক সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি। স্টেশন থেকে এক কিলোমিটারের কম দূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় চাইলে হেঁটে গিয়েও দেখতে পারেন এই পুজো।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

