শাহরুখ খান, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই নাম দুটো শুনলে সবার আগে আপনার মনে ভেসে উঠবে অভিনয় এবং ফুটবল এই দুই শব্দ। নিজেদের দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব মঞ্চে শাসন করা এই দুই ব্যক্তি তাঁদের পেশার বাইরেও নিজেদের তুলে ধরেছেন। সহজ ভাষায় বলতে গেলে অভিনয় এবং ফুটবলের বাইরে এই দুই তারকা নিজেদের ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরেছেন। টাটা, রিলায়েন্স, বিড়লা যেরকম ব্র্যান্ড — সেইরকমই ব্র্যান্ড হচ্ছে শাহরুখ খান ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। একজন ব্যক্তি থেকে ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার যাত্রাটা কেমন ছিল তাদের? এই নিয়েই আলোচনা-
Table of Contents
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন ফিল্ম বা খেলার জগতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা আর সাম্মানিক পদে থাকেন না, তাঁরা নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করে সেখান থেকে পণ্য তৈরি করে তা দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। জন্মসূত্রে নয়, নিজেদের মেধা, দক্ষতা এবং কঠোর পরিশ্রমের জোরে বিলিয়নিয়ার ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন।
দিল্লির চাঁদনি চক এলাকার গলি থেকে উঠে আসা শাহরুখ খান হোক বা দারিদ্র্যপীড়িত মাদেইরার উপকূল থেকে উঠে আসা রোনালদো—দু’জনেই নিজেদের ছাপিয়ে গিয়েছেন।
Shah Rukh Khan Cristiano Ronaldo Billionaire Strategy: দিল্লি থেকে মাদেইরা
একসময় মুম্বইয়ের ফুটপাতে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় দিন কাটানো সেই যুবকটি আজ ভারতের প্রথম ডলার-বিলিয়নিয়ার শিল্পী (Dollar-Billionaire Artist)। হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৫ (Hurun India Rich List 2025) অনুসারে, শাহরুখ খানের সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২,৪৯০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছেন।
রোনালদোর সাম্রাজ্য আজ ফুটবলের মাঠ ছাড়িয়ে পারফিউম, বিলাসবহুল হোটেল এবং একাধিক সংস্থায় বিনিয়োগ করে বিস্তৃত। তাঁকে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ ইনস্টাগ্রামে ফলো করেছেন। আর এই দুই ব্যক্তির বয়স তাঁদের কেরিয়ারের শেষের দিককে তুলে ধরে।
তবে কেউই জন্ম থেকে প্রতিভা নিয়ে শুরু করেননি। পরে ধীরে ধীরে তাঁরা সেই প্রতিভা তৈরি করেছেন। কিন্তু বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য কেবল প্রতিভা দিয়ে তৈরি হয় না। তাঁদের মধ্যে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মিল, তা হলো নিজেকে বিপণন বা Self-Marketing করা এবং লিমিটের বাইরে নিজেকে নিয়ে যাওয়া। (Shah Rukh Khan Cristiano Ronaldo Billionaire Strategy)
বলিউডের আর্ক: অনুরাগ থেকে আর্থিক প্রবাহ
ব্র্যান্ড ডিল এবং হ্যাশট্যাগের যুগ আসার অনেক আগে, তারকারা খ্যাতি অর্জন করতেন ভক্তদের প্রশংসা ও ভালোবাসার মাধ্যমে। তখন সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড নয়, দেখা হতো হলের বাইরে কত ভিড় বা কোন তারকা কটা হলে কতগুলো শো হাউসফুল হলো। ১৯৫০-এর দশকে, দিলীপ কুমার বা দেব আনন্দ ছিলেন সিনেমার দেবতার মতো পূজনীয়। তাঁদের অনুকরণ করা হতো, তাঁদের শ্রদ্ধা করা হতো। কিন্তু তাঁদের উপার্জন ছিল সীমিত। পর্দার গ্ল্যামার যতই সোনালি হোক না কেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল সাদামাটা। কারণ সেই সময় রয়্যালটি, স্বত্ব থাকত না অভিনেতাদের হাতে।
শাহরুখ খান: The King of Ownership
সময়ের বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নিয়মে বদল এসেছে। যার অন্যতম উদাহরণ শাহরুখ খান। তিনি নিজে শুধু সিনেমায় অভিনয় করেননি, নিজের সিনেমার মালিকানাও নিয়েছেন। তাই তিনি কিং খান নন, কিং অফ ওনারশিপ। অর্থাৎ, তিনি মালিকানার রাজা। রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট এবং নাইট রাইডার্স স্পোর্টস হলো তাঁর সাম্রাজ্যের দুই স্তম্ভ। তাঁর অভিনীত সেরা সিনেমাগুলো তিনি প্রোডিউসারদের থেকে কিনে নিয়েছেন, ফলে নিজের সিনেমার মালিক এখন তিনি। সেই সিনেমা থেকে তিনি আজীবন আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি ক্রিকেটের মতো হাই ভ্যালু স্পোর্টসে বিনিয়োগ করে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। আর তাঁর ব্যবসার অন্যতম সুবিধা হচ্ছে তাঁর ব্র্য়ান্ড ভ্যালু, যেই কারণে তাঁকে নিজেকে আলাদা করে বিজ্ঞাপন করার দরকার পড়ে না। (Shah Rukh Khan Cristiano Ronaldo Billionaire Strategy)
রোনালদোর ব্লুপ্রিন্ট: From Sweat to Stock Symbol
যে ছেলেটি ফুটবল বুট কেনার সামর্থ্য ছিল না, সেই ছেলেটি প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে অবসর নেওয়ার আগেই বিলিয়ন ডলার উপার্জন করলেন। কীভাবে? তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন, ফুটবলের পাশাপাশি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাঁর ছিমছাম শরীর, ইমেজ এবং গল্প। যা থেকে তিনি নিজেকে ব্র্যান্ড হিসেবে তৈরি করতে পারবেন।
রোনালদোর মধ্যে লুকিয়ে আছে তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনা। তিনি নিজের নামের সঙ্গে জার্সির নম্বর মিলিয়ে তৈরি করেছেন CR7 ব্র্য়ান্ড। এটি তাঁর পরিচিতি নয়, ব্র্যান্ড। লিসবনে হোটেল, মাদ্রিদে জিম, দুবাইয়ে পারফিউম, প্রসাধনী এবং ইনস্টাগ্রামে ৬৬৪ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ারের নেপথ্যে রোনালদোর নামের পাশাপাশি রয়েছে CR7 ব্র্যান্ড।
১৯৭০-এর দশকে ইউরোপের সেরা ফুটবলাররাও বছরে মাত্র কয়েক লক্ষ ডলার উপার্জন করতেন। কারণ সেই সময় ফুটবল খেলে যা বেতন মিলত সেটাই ছিল ভরসা। বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরের ধারণা ছিল না। আজ খেলা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। লিওনেল মেসি, লেব্রন জেমস, রজার ফেডেরার, সেরেনা উইলিয়ামস—এই সকল ক্রীড়াবিদ হয় বিলিয়নের কাছাকাছি বা সেই সীমা অতিক্রম করেছেন। কারণ, তাঁদের পারফরম্যান্স এখন তাঁদের আয়ের অন্যতম উৎস।
খ্যাতি যখন ব্যবসায়িক মডেল
একসময় শিল্প ও খেলাকে সেটার মতোই দেখা হতো। নিখাত আবেগ ছিল। এখন সেই আবেগের পরিমাণ কমেছে এবং বেড়েছে ব্যবসা। ক্রিকেট হোক বা সিনেমা প্রত্যেক জিনিসকে যত বেশি বিপণনে মোড়া যায় তত বেশি আয়। ফলে আবেগ এখন পিছনের সারিতে চলে যাচ্ছে। এখন আধুনিক বিশ্বে গুণমান বা দক্ষতার থেকেও বেশি গুরুত্ব পায় দৃশ্যমানতা। সেই কারণে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হচ্ছেন জনপ্রিয় মুখরা, ইন্সফ্লুয়েন্সারদের জন্ম হয়েছে।
বাণিজ্য নাকি বিবর্তন?
তবে এটিকে নিছক বাণিজ্য বললে হবে না। আসলে আবেগের সঙ্গে ব্যবসা মিশে গেলে সেখানে আদতে সাধারণ মানুষের লাভ হয়। যেমন টেলর সুইফটের ইরাস ট্যুর স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছিল, বা শাহরুখ খানের সিনেমা শত শত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে। সম্পদ যখন মার্জিতভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তাতে কোনও ক্ষতি নেই।
তারকা হওয়ার মূল্য
তবে রোনালদো বা শাহরুখ খান একার দক্ষতায় হতে পারতেন না। তাঁদের তৈরি হওয়ার নেপত্যে রয়েছেন হাজার হাজার এমন মানুষ যারা তাঁদের পাশে পিলার হয়েছিলেন। এবং ছিলেন আরও কিছু মানুষ যারা খ্যাতির কাছাকাছি পৌঁছানোর পরেও বিশ্বব্যাপী দৃশ্যমানতার দরজা ভেদ করতে পারেননি। তারা হয়তো সমানভাবে দক্ষ, সমানভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু কেবল দক্ষতা জোরে পারেননি।
মন ছুঁয়ে যাওয়া ঘটনা, ভারতের এই গ্রামের সকলেই করেছেন চক্ষুদানের অঙ্গীকার
শাহরুখ খান এবং রোনালদো সম্পর্কে আসল কথাটি হলো, তাঁরা বিলিয়ন ডলারের পিছনে ছুটতে শুরু করেননি। শাহরুখ অভিনয় করতেন কারণ তিনি মঞ্চকে ভালোবাসতেন; রোনালদো ফুটবলের ট্রেনিং করতেন কারণ তিনি নিজেকে বাকিদের থেকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন। তাদের সম্পদ প্রধান লক্ষ্য ছিল না—এটি ছিল প্রতিভার ফল।
এটিই তাঁদের আলাদা করেছে। যখন বলিউড গতানুগতিক হয়ে গেল, শাহরুখ তখন প্রযোজক হলেন। যখন ফুটবল আরও দ্রুত হলো, রোনালদো তখন আরও ফিট হলেন, নিজের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে কাজ করে তরুণদের সঙ্গে মানিয়ে নিলেন।
দিনের শেষে ব্র্যান্ডগুলি ম্লান হয়ে যাওয়ার পরেও, পোস্টগুলি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরেও, আর শিরোনামগুলি চলে যাওয়ার পরেও—গল্পটি রয়ে যায়। দিল্লির এক ছেলে, মাদেইরার এক ছেলের গল্প। এবং বিলিয়ন ডলারের সেই স্বপ্ন যা টাকা দিয়ে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছিল জাদু দিয়ে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

