রাজ্য দেশ বিদেশ খেলা খাবার ও রেসিপি লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও গ্যাজেটস অন্যান্য খবর Utility News

---Advertisement---

Teachers’ Day: শিক্ষার হযবরল: শিক্ষক দিবসে ফিরে দেখা

By Raja
Published on: September 4, 2025
Teachers’ Day
---Advertisement---

সৌমিক চট্টোপাধ্যায়

কলেজ স্কোয়ারে এক সন্ধ্যা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দীর্ঘদিন—সারাদিন পরীক্ষার খাতা সংশোধন। সন্ধ্যায় কলেজ স্কোয়ারে কয়েকজন শিক্ষক একসঙ্গে চায়ের কাপে আড্ডা, চিরন্তন প্রশ্ন ঘিরে—আজকের দিনে শিক্ষকতার ভূমিকা আসলে কী?

আলোচনা তীব্র হচ্ছিল, বিশেষ করে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ (NEP 2020) ঘোষণার পর। সারা বছর পরীক্ষা নেওয়া, খাতা দেখা—যদি সময় মেলে তবে পড়ানো। এক সহকর্মী হেসে বললেন, “শিক্ষকতা এখন কেবল চাকরি।”

ঠিক তখনই বইয়ের বোঝা নিয়ে একজন যুবক ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। ঘেমে ভেজা শার্টে কাঁধে কাপড়ে বাঁধা বই। চিনতে পারলাম—মোমিন, আমাদের কলেজের কমার্সের ছাত্র। দিনে পড়াশোনা, সন্ধ্যায় কলেজ স্ট্রিটে বই বওয়ার কাজ। অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “দুঃখিত স্যর, খেয়াল করিনি।”

আমরা চুপ করে হাঁটতে লাগলাম। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তির চোখ যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলল আমাদের দিকে।

শিক্ষক দিবসের স্মৃতি (Teachers’ Day)

নব্বইয়ের দশকে ৫ সেপ্টেম্বর ছিল উৎসব। ক্লাসরুম সাজানো, শিক্ষক-ছাত্রের ভূমিকা বদল, শেষে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। পরে বুঝেছি, সেটাই ছিল অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা—অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা, মূল্যবোধ গঠন।

আজ পেশায় ঢুকে দেখলাম—শব্দ বাড়ছে, দায়িত্ব কমছে। শিক্ষা এখন বোঝা, অনেকে শুধু চাকরি হিসেবেই দেখে।

পরিবর্তিত শিক্ষা জগত

তখনও কোচিং চলত, আজও চলে—শুধু মাধ্যম বদলেছে, লিভিং রুম থেকে গুগল মিটে। দায়িত্ববান শিক্ষক যেমন ছিলেন, বাণিজ্যিক মানসিকতার শিক্ষকও ছিলেন।

শিক্ষক দিবসের সরকারি সূচনা ১৯৬২ সালে। দার্শনিক ও রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন নিজের জন্মদিনকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের পরামর্শ দেন। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা। অথচ আজ শিক্ষা ব্যবস্থাই ভঙ্গুর।

Attention Economy: মন নিলে গো শুধু

NEP 2020 : উচ্চশিক্ষার দ্বন্দ্ব

প্রতিশ্রুতি ছিল GDP-র ৬% শিক্ষা খাতে ব্যয় হবে, বাস্তবে রয়েছে ৩–৪%।
ডিজিটাল নির্ভরতা বাড়ছে, কিন্তু দরিদ্র-গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট না থাকায় বাদ পড়ছে।
ভ্যালু অ্যাডেড কোর্স মূল পড়াশোনার সময় কমাচ্ছে।
অনার্সের পর সরাসরি Phd-র সুযোগ গবেষণার মান কমাতে পারে।
UGC, AICTE, NCTE মিলিয়ে তৈরি হতে চলেছে সুপার-নিয়ন্ত্রক HECI, যা আরও কেন্দ্রীকরণ আনতে পারে।

সর্বোপরি, বেসরকারীকরণ শিক্ষাকে বাজারে ঠেলে দিয়েছে—ফি আকাশছোঁয়া, সরকারি প্রতিষ্ঠান অবহেলায় জর্জরিত।

sad man
ছবিটি প্রতীকী

সংখ্যাই আসল কথা বলে

ভর্তির হার (GER): লক্ষ্য—২০৩০ সালের মধ্যে স্কুলে ১০০%, ২০৩৫ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় ৫০%। বাস্তবে—প্রায় ৭০% যুবক উচ্চশিক্ষার বাইরে।

প্রতিষ্ঠান (AISHE 2020–21): ভারতে মোট ১,৩৮৫ বিশ্ববিদ্যালয়, এর মধ্যে ৬৭.৫% বেসরকারি। মোট কলেজ ৬০,১২৭, এর মধ্যে ২২,৭৩৫ বেসরকারি। প্রায় ৪৮.৭% শিক্ষার্থী পড়ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

খরচের ফারাক

  • সরকারি স্কুল: ₹২,৮৬৩/বছর
  • বেসরকারি স্কুল: ₹২৫,০০২ (প্রায় ৯ গুণ বেশি)
  • B.Tech: সরকারি ₹১৫,০০০, বেসরকারি ₹১,৫০,০০০
  • MBBS: সরকারি ₹৩০,০০০, বেসরকারি ₹৭.৫ লক্ষ

পশ্চিমবঙ্গ: ২০১২ সালে প্রাইমারি স্কুল ছিল ৭৪,৭১৭। ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে ৪৯,৩৬৮। অর্থাৎ ২৫,০০০-এরও বেশি স্কুল বন্ধ হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় ৯.৫ লক্ষ আসনের মধ্যে ভর্তি হয়েছে মাত্র ৩.৫ লাখ।

শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের টানাপোড়েন

ক্লাসরুম প্রায় ফাঁকা। শিক্ষক আসেন দেরিতে, পড়ান অনিচ্ছায়, প্রশ্ন নিরুৎসাহিত করেন, নম্বর কড়া হাতে কেটে দেন।

ছাত্রদের প্রশ্ন স্পষ্ট—“পড়াশোনা করব কেন? চাকরি কি হবে?”

সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা পড়ে গেছে। বাসে কেউ প্রশ্ন করে—“চাকরিটা কত দিয়ে কিনেছেন?” ছাত্রনেতারা টিভিতে ভিসিকে নিয়ে কটাক্ষ করে। তবুও, এক প্রাক্তন ছাত্রের আন্তরিক “স্যর” শব্দ এখনও ক্ষত সারিয়ে দেয়।

Teachers day special
ছবিটি প্রতীকী

একজন M.A. পাশ ট্যাক্সি চালক

এক বৃষ্টিভেজা রাতে ট্যাক্সি ধরলাম। চালক ভদ্রভাবে “স্যর” বলে সম্বোধন করলেন। পরিচয় দিলেন—সোমনাথ দে, সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক (২০২২), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে M.A. (২০২৪)। নেটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই বাবা গুরুতর অসুস্থ।

৮,০০০ টাকার বেসরকারি স্কুলের চাকরিতে সংসার চলছিল না। তাই বাবার পুরনো ট্যাক্সি চালানো শুরু করেছেন। আজও আগরপাড়ায় থাকেন বাবা-মার সঙ্গে।

সেমিনারে দেরিদা নিয়ে হয়তো আর বিতর্ক করবেন না, পুরস্কারও পাবেন না, কিন্তু প্রতিদিন তাঁর ট্যাক্সি কলকাতাকে বাঁচিয়ে রাখে। স্বপ্ন ছিল গবেষণার, বাস্তব তাঁকে নামিয়েছে রাস্তায়।

উপসংহার

আমি তাঁকে চিনতে পারিনি, অথচ সে মনে রেখেছিল আমাকে—পরীক্ষার হলের এক ইনভিজিলেটর হিসেবে। তাঁর একবারের “স্যর” ছিল আমার জন্য শিক্ষক দিবসের সবচেয়ে বড় উপহার।

তাই আজ শিক্ষক দিবসে আমার প্রণাম মোমিন, সোমনাথ আর তাঁদের মতো হাজারো শিক্ষার্থীর প্রতি—যাঁরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত চেহারা তুলে ধরেন।


লেখক পরিচিতি

Attention Economy
Teachers’ Day: শিক্ষার হযবরল: শিক্ষক দিবসে ফিরে দেখা 3

সৌমিক চট্টোপাধ্যায় কলকাতার কাশীপুরের জৈন কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি একজন প্রাবন্ধিক।


Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন



Discover more from Unknown Story

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

---Advertisement---

Raja

লেখালেখি পছন্দ করেন। পেশাদার লিখিয়ে নন। নিজের কাজের পাশাপাশি এখন UnknownStory.in-এ লিখছেন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Reply