Site icon Unknown Story

নাগরিক না ভোটার? প্রসঙ্গ Special Intensive Revision বা SIR

Special Intensive Revision

সৌমিক চট্টোপাধ্যায়

ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা বা ইলেকটোরাল রোলের বিশুদ্ধতা একটি মৌলিক শর্ত। প্রতি বছরই নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন (Summary Revision) চালায়, যাতে নতুন ভোটার যুক্ত হন, মৃত বা স্থানান্তরিত নাগরিকদের নাম বাদ পড়ে, ভুলত্রুটি সংশোধিত হয়।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বারোটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চলছে ভোটার‌ তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR)। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর দ্বিতীয় দফার আওতায় পড়বেন আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লাক্ষাদ্বীপ, ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাট, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, পুদুচেরী, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের ৫১ কোটি নাগরিক।

ভারতের প্রথম ভোটার তালিকা তৈরি করা হয় ১৯৫১ সালের প্রথম দিকে, প্রথম সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এই প্রথম প্রস্তুত করা তালিকার প্রাথমিক সংশোধনও করা হয় ১৯৫১ সালেই—অর্থাৎ প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগেই। ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের তিন ধরনের পদ্ধতি আছে—Regular, Summary, Intensive (House-to-House) Revision। নিবিড় বা Intensive Revision অর্থাৎ ঘরে ঘরে গিয়ে তালিকা পুনঃনিশ্চিতকরণ পদ্ধতি ভারতে ১৯৬০-এর দশকে নিয়মিতভাবে শুরু করে নির্বাচন কমিশন। স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত এই নিবিড় সংশোধন বা Intensive Revision আনুমানিক আট বার করা হয়েছে।

প্রশ্নের মুখে Special Intensive Revision-এর প্রক্রিয়া ও বিরোধীদের অভিযোগ

বর্তমানে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিতর্ক, রাজনৈতিক উত্তেজনা, পরস্পরবিরোধী দাবি ও অভিযোগ উঠছে। অভিযোগ উঠছে ভোট কাট- ছাঁট করার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ভোটার কারচুপি নিয়ে; আবার অপর প্রান্তে দাবি করা হচ্ছে ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের। নির্বাচন কমিশনের দাবি, SIR একটি রুটিন প্রক্রিয়া। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের প্রক্রিয়াটি সর্বশেষ হয়েছিল ২০০২-২০০৪ সালে, বিজেপি শাসিত বাজপেয়ী সরকারের আমলে। তবে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন পদ্ধতিগতভাবে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলত অভিযোগ উঠছে এই প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এবং আশু ফলাফল নিয়ে। বিরোধী দল গুলোর অভিযোগ মূলত চারটি –

ছবিটি প্রতীকী

রাজনৈতিক জটিলতার এক অদ্ভুত নির্মাণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের অধিবাসী। আতঙ্ক বুকে নিয়ে কাগজ খুঁজছি নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য, এক অদ্ভুতুড়ে ন্যারেটিভের অংশীদার হয়ে – বৈধ ভোটার, বৈধ নাগরিক; অবৈধ ভোটার, অবৈধ নাগরিক। এই‌ ভাষ্য গুলিয়ে দিয়েছে আত্ম পরিচয়ের রাজনীতি। রাষ্ট্র যন্ত্র অদৃশ্য ভয় দেখাচ্ছে, আমরা ভয় পাচ্ছি কেন? সাধারণ নাগরিকের মতামত আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নে। শীতের মরশুমে দুটি পরস্পর বিরোধী ডিসকোর্স হানা দিচ্ছে অফিস পিকনিক থেকে ফেসবুক হয়ে চা এর ঠেকে। কেন নির্বাচন কমিশন যাচাই করবে নাগরিকত্ব? আর, অবৈধ নাগরিক, অনুপ্রবেশকারী দেশের ভার, খুঁজে বের করে দেশ ছাড়া করতে হবে তাদের, তবেই জাতির মুক্তি! (Special Intensive Revision)

Attention Economy: মন নিলে গো শুধু

এই জটিল পরিসরকে বোঝার ক্ষেত্রে jingoism—অর্থাৎ আগ্রাসী, আবেগ-আধারিত দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদী অনুভূতি—এবং homo sacer—অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখে এমন এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যাদের আইনগত মর্যাদা ঝুলে থাকে এবং যাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার স্থগিত হয়ে যায়—এই দুই ধারণা আমাদের বিশেষ কাঠামো দেয়। ভোটার তালিকাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আলোচনার প্রকৃতি, জন-আবেগের পরিচালনা, এবং নাগরিকের অধিকার সংক্রান্ত অবস্থানকে কীভাবে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলি সংজ্ঞায়িত করছে, এই দুটি তাত্ত্বিক ধারণার মাধ্যমে সেটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হয়। (Special Intensive Revision)

Homo Sacer কী?

আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বে ইতালীয় দার্শনিক Giorgio Agamben–এর “Homo Sacer” ধারণাটি ক্ষমতা, রাষ্ট্র, আইন এবং মানবজীবনের প্রতি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র যখন কাউকে আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে হত্যা করাও শাস্তিযোগ্য নয়—সেই “নগ্ন জীবন” বা অবস্থাকেই বোঝায় Homo Sacer। এই শব্দটি এসেছে প্রাচীন রোমান আইন থেকে। Homo Sacer হলো এমন ব্যক্তি, যাকে রাষ্ট্র আইনের সুরক্ষা দেয় না, কিন্তু তাকে হত্যা করলেও আইনি শাস্তি হয় না। অর্থাৎ সে একজন জীবিত মানুষ, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অসংরক্ষিত, অধিকারহীন এবং রাষ্ট্র-ব্যবস্থার বাইরে। Homo Sacer–কে আইন স্পর্শ করে, কিন্তু সুরক্ষা দেয় না। অধিকারহীনতা ও নিঃসঙ্গতা এই অবস্থায় মানুষ রাষ্ট্রের কাছে “কিছুই নয়”—না একজন পূর্ণ নাগরিক, না একজন অপরাধী।

আধুনিক রাষ্ট্র বিশেষ করে ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ প্রভৃতি শাসনব্যবস্থা Homo Sacer–এর ধারণাকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছে। উদাহরণ—নাজি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, ইহুদিদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে এ মানুষকে আইনের বাইরে রাখা। এসব ক্ষেত্রে মানুষকে কেবলমাত্র “জীবন” হিসেবে ধরা হয়েছে, নাগরিক হিসেবে নয়। Agamben দাবি করেন, আধুনিক রাষ্ট্রে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জরুরি অবস্থা, শরণার্থী শিবির, অনিবন্ধিত অভিবাসী, এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে তাকে Homo Sacer–এর অবস্থায় ঠেলে দেয়।

আধুনিক বিশ্বে Homo Sacer দের উদাহরণ আছে। শরণার্থী ও State-less ব্যক্তি নাগরিকত্ব-হীন রোহিঙ্গা বা সিরিয়ান শরণার্থীরা প্রায়শই আইনের সুরক্ষা পায় না। রাজনৈতিক বন্দী বা Guantanamo Bay-এর কয়েদিরা “আইনের বাইরে থাকা নাগরিক”। রাষ্ট্র কখনও এক শ্রেণীর নাগরিককে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে অধিকারহীন করে দেয়। (Special Intensive Revision)

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড়‌ সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা, কেন্দ্রীয় সরকারের আসল উদ্দেশ্য, সামগ্রিক সাধারণ জনগণকে এক বৃহত্তর সংশয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যা মুলত পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্কট তৈরি করে। কিছু রাজনৈতিক দল দাবি করছে, তাদের সমর্থকদের নাম, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের নাম পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

আবার অন্য পক্ষ অভিযোগ করছে, বেআইনি নাগরিক অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিদের নাম তালিকায় ঢোকানো হচ্ছে।
প্রশাসনিক ত্রুটি, রাজনৈতিক চাপ, এবং মাইক্রো-লেভেল সংগঠিত প্রচেষ্টার অভিযোগ জনমনে সন্দেহ এবং আতঙ্ক তৈরি করছে। ভোটার তালিকা ঘিরে নির্মাণ হচ্ছে আবেগের রাজনীতি।

ছবিটি প্রতীকী

গুরুত্ব পাচ্ছে যুক্তির চেয়ে আবেগ, সংলাপের চেয়ে সংঘর্ষ, তথ্যের চেয়ে স্লোগান

জিংগোইজম হল এমন এক জাতীয়তাবাদ যেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ, সংলাপের চেয়ে সংঘর্ষ, তথ্যের চেয়ে স্লোগান—এসব বেশি গুরুত্ব পায়। এটি এমন পরিবেশ তৈরি করে যেখানে বিরোধী মত বা সমালোচনাকে দেখানো হয় দেশদ্রোহ, রাষ্ট্রবিরোধিতা।

ভোটার তালিকার সংশোধন ঘিরে এই প্রবণতা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ— কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোটারদের বেআইনি বলে চিহ্নিত করা, এক গোষ্ঠীকে ‘প্রকৃত নাগরিক’ অন্যকে ‘ঘুসপেটিয়া’ প্রমাণ করার স্লোগান তোলা, ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্তি-বর্জনকে জাতীয় নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে পরিণত করা। (Special Intensive Revision)

এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে রূপান্তরিত করে আবেগদীপ্ত সংঘর্ষের মঞ্চে। জিংগোইস্টিক বক্তব্য প্রায়শই নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহৃত হয় ভোটারদের মেরুকরণের জন্য। “আমরা বনাম তারা”–ধারণা যত তীক্ষ্ণ হয়, ভোটব্যাঙ্ক তত সুদৃঢ় হয়। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক উত্তেজনার উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিক আলোচনায় যুক্তি বা নীতির পরিবর্তে ভয়, সন্দেহ ও উত্তেজনা প্রাধান্য পায়। ফলে ভোটার তালিকা, হয়ে ওঠে “অন্যকরণ” (othering)-এর হাতিয়ার। নাগরিকত্বের বিষয়টি চলে আসে সামগ্রিক অস্তিত্ব নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে। এমন অবস্থায় ভোটাধিকার—যা গণতন্ত্রে মৌলিক অধিকার—পরিণত হয় অনিশ্চিত, দ্ব্যর্থক, এবং অরক্ষিত অবস্থানে। জিংগোইজম জনপরিসরে উত্তেজনা ও সন্দেহের আবহ তৈরি করে।

অন্যদিকে হোমো স্যাকার–ধারণায় বোঝা যায়, এই উত্তেজনার ফলে এক শ্রেণির নাগরিক এমন অবস্থায় পড়েন যেখানে তাদের অধিকার স্থির নয়। এই দুটি একসঙ্গে মিললে, সাধারণ প্রশাসনিক যাচাই একই সঙ্গে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে এটি পরিচয়-রাজনীতির যন্ত্রে পরিণত হয়। রাজনৈতিক দলগুলি আবেগ কাজে লাগিয়ে সমর্থন সংগঠিত করতে পারে। কিন্তু সাধারণ নাগরিক ক্রমশই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে নয়, বরং লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়েন। (Special Intensive Revision)

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নাগরিকরা তথ্যপ্রমাণে পিছিয়ে পড়লে বা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হলে সহজেই “হোমো স্যাকার”-এর অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে যান। আর জিংগোইস্টিক প্রচার সেই অবস্থাকে আরও তীব্র করে তোলে।

একটি কার্যকর গণতন্ত্রে ভোটার তালিকার সংশোধনকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত সন্দেহ, সম্প্রদায়ভিত্তিক অভিযোগ–প্রতিযোগিতা, জাতীয়তাবাদের নামে বিভাজন, দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ও স্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থা কে দুর্বল করে।


লেখক পরিচিতি

সৌমিক চট্টোপাধ্যায় কলকাতার কাশীপুরের জৈন কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি একজন প্রাবন্ধিক।


Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন


Exit mobile version