সৌমিক চট্টোপাধ্যায়
আন্তর্জাতিক নারী দিবস এলেই আমরা ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসি (Women’s Day 2026)। কিন্তু একটি শব্দ—পিতৃতন্ত্র (Patriarchy)—যাকে কেন্দ্র করে এত তর্ক-বিতর্ক, সেটাকেই কি আমরা নতুন করে ভাবছি? গ্রিক patēr (পিতা) ও arkhē (শাসন) থেকে উদ্ভূত এই শব্দের আক্ষরিক অর্থ “পিতার শাসন” পরিবারের সর্বময় কর্তা; মধ্যযুগে ধর্মীয়-আইনি বিধান পিতৃসূত্রে পুরুষ উত্তরাধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক করে; ১৭শ শতকে রবার্ট ফিলমার প্যাট্রিয়ার্কা-য় রাজশক্তিকেও পিতৃত্বের সম্প্রসারণ বলেন; পাল্টা জবাব দেন জন লক। উনিশ শতকে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস পরিবার-ব্যক্তিগত সম্পত্তি-রাষ্ট্রের যোগসূত্রে নারীর অধীনতার ব্যাখ্যা দেন। আর বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কেট মিলেট পিতৃতন্ত্রকে পরিবার ছাড়িয়ে সংস্কৃতি-রাজনীতি-যৌননীতির সর্বব্যাপী ক্ষমতাকাঠামো হিসেবে পড়তে শেখান।
Table of Contents
এই ইতিহাস বলছে—শব্দটি পুরুষকেন্দ্রিক উৎস থেকে এসেছে। কিন্তু ২০২৬-এর ভারতীয় সমাজে “পিতৃতন্ত্র” কি কেবল ‘পুরুষ বনাম নারী’ সমীকরণ? নাকি এটি এমন এক নিয়ম-তন্ত্র, যা সকল লিঙ্গকেই নির্দিষ্ট ভূমিকায় বেঁধে রাখে? নারী দিবসের প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নটাই জরুরি।
পুরুষের প্রাধান্য: সংখ্যাই কথা বলে
বাস্তবতা কঠিন। ভারতের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলক কম—বিভিন্ন সমীক্ষায় তা প্রায় ২৫–৩০% ঘোরাফেরা করে। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ২০২৪-এর আগে দীর্ঘদিন ১৫%–এর আশপাশে ছিল (যদিও সংরক্ষণ বিল পাস হয়েছে, পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও বাকি)। মজুরি বৈষম্য, অদৃশ্য গৃহশ্রম, এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা—সবই পুরুষ-প্রাধান্যের কাঠামোগত চিহ্ন।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো–র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের নথিভুক্ত ঘটনা বছরে কয়েক লক্ষ—গার্হস্থ্য হিংসা থেকে যৌন অপরাধ পর্যন্ত। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম–এর গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে ভারত মাঝামাঝি থেকে নিচের সারিতে। অর্থাৎ, ঐতিহাসিক পিতৃতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এখনও স্পষ্ট।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়
পিতৃতন্ত্র শুধু নারীর ওপরই বোঝা চাপায়—এই একরৈখিক বক্তব্য এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ এই ব্যবস্থাই পুরুষের ওপর আরোপ করে “অবশ্যই উপার্জনকারী”, “অবশ্যই শক্ত”, “অবশ্যই আবেগহীন”—এই তিন আজ্ঞা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব বা ঋণের চাপে পুরুষের মানসিক ভাঙন—এও তো কাঠামোর ফল। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো–র আত্মহত্যা সংক্রান্ত তথ্য বলছে, ভারতে আত্মহত্যায় মৃতদের প্রায় ৭০%–এর বেশি পুরুষ; বিবাহিত পুরুষদের অনুপাতও উল্লেখযোগ্য। কারণের তালিকায় অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক প্রত্যাশা—সবই আছে। প্রশ্ন উঠছে: “উপার্জন না করলে তুমি ‘পুরুষ’ নও”—এই অদৃশ্য নির্দেশ কি কেবল নারীদের নয়, পুরুষদেরও বেঁধে রাখে না?
গার্হস্থ্য হিংসার আলোচনায় নারীর সুরক্ষা কেন্দ্রে থাকা উচিত—এতে সন্দেহ নেই। তবে পারিবারিক বিবাদে পুরুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার অভিযোগ, বা সন্তানের অধিকার নিয়ে পিতার দীর্ঘ আইনি লড়াই—এগুলোও জনপরিসরে উঠে আসছে। অর্থাৎ, সামাজিক প্রত্যাশার কাঠামো কখনও কখনও নারী-প্রাধান্যও তৈরি করে—বিশেষত যত্ন ও অভিভাবকত্বের প্রশ্নে।
Women’s Day 2026: “পিতৃতন্ত্র” শব্দটির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন?
প্রথমত, শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ‘পিতার শাসন’। কিন্তু আজকের ক্ষমতার জাল অনেক বেশি জটিল—এতে রাষ্ট্র, বাজার, মিডিয়া, এমনকি অ্যালগরিদমও আছে। কর্মক্ষেত্রে “২৪x৭ প্রোডাক্টিভ” থাকার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মেরুকরণে পৌরুষের আক্রমণাত্মক প্রদর্শন, সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীর শরীরকে পণ্যায়ন—সবই ক্ষমতার নয়া রূপ। একে শুধু ‘পিতার শাসন’ বললে কি যথেষ্ট?
দ্বিতীয়ত, পিতৃতন্ত্র কেবল পুরুষের ব্যক্তিগত সদিচ্ছা দিয়ে বদলায় না; এটি প্রাতিষ্ঠানিক। সংসদে নারী কম—এটি ব্যক্তির দোষ নয়, কাঠামোর ফল। আবার, পুরুষ যদি পিতৃত্বকালীন ছুটি নেন এবং তিরস্কৃত হন—সেটিও কাঠামোর ফল। ফলে বিশ্লেষণাত্মকভাবে শব্দটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ কাঠামো হিসেবে পড়া জরুরি—যেখানে লক্ষ্য ব্যক্তি-আক্রমণ নয়, নীতিগত পরিবর্তন।
মৌলবাদের নয়া মডেল: তৌহিদ জনতা
তৃতীয়ত, নারী দিবসের ভাষণে আমরা ক্ষমতায়নের কথা বলি; কিন্তু ক্ষমতায়ন যদি কেবল নারীর কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে গৃহশ্রমের ভাগাভাগি, আবেগগত শ্রমের স্বীকৃতি, পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য—এসব প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। “ভালো পুরুষ” কেবল উপার্জনকারী নন; “ভালো নারী” কেবল সুগৃহিণী নন—এই পুনর্নির্মাণ সামাজিক স্বীকৃতি না পেলে সমতা অর্ধেকই থাকবে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা, বর্তমানের সমীকরণ দেখায়, পিতৃতন্ত্র কখনও কেবল পরিবারে সীমাবদ্ধ ছিল না—এটি রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। শিল্পায়ন পুরুষকে কারখানায়, নারীকে গৃহে স্থাপন করেছিল; ঔপনিবেশিক আধুনিকতা “ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা” আদর্শ বানিয়েছিল; স্বাধীনোত্তর রাষ্ট্র উন্নয়নের ভাষায় নারীর কল্যাণ বললেও, শ্রমবাজারে সমতা আনতে পারেনি।
আজকের ভারত ভিন্ন—নারী পাইলট, বিজ্ঞানী, সেনা অফিসার; পুরুষ শেফ, কেয়ারগিভার, খুব একটা চোখে লাগে না। কিন্তু সামাজিক কল্পনায় পুরনো ভাষ্যই কানে বাজে। ফলে শব্দটিকে আপডেট করা দরকার—পিতৃতন্ত্র ২.০: এমন এক ব্যবস্থা, যা ঐতিহাসিকভাবে পুরুষ-প্রাধান্য তৈরি করেছে, কিন্তু সমকালীন বাস্তবে সকল লিঙ্গকে নির্দিষ্ট পারফরম্যান্সে বাধ্য করে।
পিতৃতন্ত্র শব্দটি বাতিল করার আহ্বান নয়—বরং তাকে ধারালো করা। ইতিহাসের শিকড় মনে রেখে বর্তমানের জটিলতা বোঝা। নারী দিবস আমাদের মনে করায়: ক্ষমতায়ন মানে কেবল এক লিঙ্গের উত্থান নয়; এটি সম্পর্ক, ভূমিকা ও প্রত্যাশার পুনর্লিখন।
যদি আমরা সত্যিই সমতা চাই, তবে শব্দের আড়ালে নয়—কাঠামোর ভিতরে আলো ফেলতে হবে। পিতৃতন্ত্র তখন আর কেবল “পিতার শাসন” নয়; এটি ক্ষমতার সেই অ্যালগরিদম, যাকে বদলাতে হলে নারী-পুরুষ—উভয়েরই সামাজিক কোডগুলোকে সমকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুনরায় বিশ্লেষণ করা কি জরুরি নয়? পিতৃতন্ত্রের পুনর্লিখন কি প্রয়োজনীয় নয়?
লেখক পরিচিতি
সৌমিক চট্টোপাধ্যায় কলকাতার কাশীপুরের জৈন কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি একজন প্রাবন্ধিক।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

