Site icon Unknown Story

মৌলবাদের নয়া মডেল: তৌহিদ জনতা

Towhidi Janata bangladesh

সৌমিক চট্টোপাধ্যায়

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে ধর্মীয় সহনশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে গড়ে উঠেছিল। তবুও সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামি মৌলবাদ এবং উগ্রপন্থা বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক ও ধর্মীয় মেরুকরণ এবং বৈশ্বিক মৌলবাদী প্রভাবের কারণে এই প্রবণতা আরও দৃঢ় হচ্ছে। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে নজ়রুলের সোনার বাংলা, উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল; জুলাই আন্দোলন, ওসমান হাদির উত্থান ও পতন, ছায়ানট – উদীচীর মত সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রে‌ আক্রমণ, ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যার ঘটনা সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। ইসলামিক মৌলবাদের নয়া আঁতুড়ঘর ওপার বাংলা।

১৯৮০-৯০ এর দশকে বিশ্বব্যাপী ইসলামী জিহাদের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে থাকে। আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় বহু বাংলাদেশি যুবক বিদেশে প্রশিক্ষণ পেয়ে দেশে ফিরে যায়, যা পরবর্তীতে জঙ্গি গঠনের জন্য ভূমিকা তৈরি করে। এর সাথে মধ্যপ্রাচ্য ও গালফ রাষ্ট্রগুলোর ধর্মীয় অর্থ ও সংযোগও স্থানীয় উগ্রবাদকে শক্তি প্রদান করেছে।

মুহাম্মদ ইউনূস

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস এর নেতৃত্বে চলা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই ধর্মীয় মৌলবাদকে রাজনৈতিক জমি দিয়েছে; সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনীতির দুর্বলতা এবং বেকার যুবসমাজের মধ্যে ধর্মীয় ভিত্তিতে পরিচয় খোঁজার প্রবণতা মৌলবাদী শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক বিপ্লবের পর (যেখানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা বাড়ে) ইসলামি সংগঠনগুলো রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান নিতে পেরেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সক্রিয় থাকা কিছু ইসলামী উগ্রপন্থী ও মৌলবাদী সংগঠনের হল জামায়াতে ইসলামি (এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামিক রাজনৈতিক দল, যেটি ধর্মীয় আইন বা শরীয়াহ ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়), হেফাজতে ইসলাম (২০১০ সালে গঠিত একটি বেসরকারি ধর্মীয় গোষ্ঠী, যেটি মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের সংগঠন, ২০২৫ সালে তারা সরকার প্রস্তাবিত নারী-সমতা আইনের প্রতিবাদে রাস্তায় সমাবেশও করেছে) , হাক্কাতুল জিহাদ আল-ইসলাম (১৯৯২ সালে আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের যুবকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি জিহাদি গোষ্ঠী, শরীয়াহ ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করেছে এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলাসহ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে), জামাত-উল- মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB ১৯৯৮ সালে গঠন করা হয় এবং ২০০৫ সালে প্রায় সমগ্র দেশে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আইনের শাসন উৎখাত ও ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করে), হিজবুত তহরীর (২০০৯ সালে নিষিদ্ধ করা হলেও একটি আন্তর্জাতিক খিলাফত ভিত্তিক গোষ্ঠী, শক্রান্ত রাজনীতির মাধ্যমে “খিলাফতি” শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রদর্শনের জন্য ঢাকায় র‍্যালি করেছে এবং প্রচার চালিয়েছে) এবং জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ যারা বর্তমানে সারা জনপ্রিয় তৌহিদ জনতা নামে। বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উত্থানের পিছনে বিগত এক বছরে, মূলত জুলাই আন্দোলনের পর, সবথেকে বড় ভূমিকা পালন করেছে তৌহিদ জনতা।

তৌহিদ জনতা কোনও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বা একক সংগঠনের নাম নয়। এটি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবহৃত একটি বর্ণনামূলক/রাজনৈতিক পরিভাষা, যার মাধ্যমে সাধারণত এমন কিছু ইসলামি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ লোকসমষ্টিকে বোঝানো হয়, যারা তৌহিদ (একেশ্বরবাদ) রক্ষার দাবিতে রাস্তায় নামে, বিক্ষোভ করে বা সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। এই জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কোনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব , দল বা সদস্যপদ নেই। বিভিন্ন সময় ধর্মীয় বক্তা, স্থানীয় মসজিদকেন্দ্রিক অনুসারী, মাদ্রাসাশিক্ষার্থী বা ধর্মপ্রাণ তরুণদের একটি অংশ—এদের কিছু অংশকে এই নামে ডাকা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামি প্ল্যাটফর্মের সমর্থন পায়।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অস্থির বাংলাদেশে তৌহিদ জনতার আলোচনা প্রাসঙ্গিক তার কারণ ধর্ম অবমাননা অভিযোগ, রাজনৈতিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু ইস্যু বা নৈতিকতার প্রশ্নে যখন স্বতঃস্ফূর্ত বা সংগঠিত ভিড় প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন সে দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে “তৌহিদ জনতা” শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সমর্থকদের মতে, তারা ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা করছে।

ওসমান হাদি

সমালোচকদের মতে, এই নামে মব জাস্টিসকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ একদল সংখ্যাগুরু, ইসলাম ধর্মাবলম্বী, সাধারণ নাগরিকেরা যদি কোন হিংসাত্মক কাজ করেন স্বধর্ম রক্ষার জিগির তুলে, তাহলে জনগণের দ্বারা সংগঠিত, স্বতঃস্ফূর্ত হিংসার ঘটনা বৈধতা পাবে। সমাজে মান্যতা পাবে। কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দল, নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠনকে আর দায় নিতে হবে না। ফলত নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠন বা জঙ্গি সংগঠনের কাজটি করে দেবে সাধারণ ‘তৌহিদ’ রা। তৌহিদ জনতার সামাজিক অবস্থানটিও গুরুত্বপূর্ণ। না তারা রাজনৈতিক দল বা দলের সদস্য, না তারা কট্টরপন্থী বা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। সুতরাং কট্টরপন্থীদের এখন কাজ একটাই, সাধারণ নাগরিকের তৌহিদিকরণ করা। ধর্মীয় মৌলবাদকে চালনা করার, সমাজে বৈধতা দেওয়ার এই পন্থা ও কাঠামোটি নতুন। বিশ্ব জুড়ে মৌলবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণের সম্প্রসারণে রাজনৈতিক দল‌‌ ও বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সংগঠিত ভূমিকা আমরা দেখেছি। কিন্তু মৌলবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণের সম্প্রসারণে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহার করা এর আগে এমনটি দেখা যায়নি। রাজনৈতিক দল‌‌ ও বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর কাজ হবে ভাবাবেগকে ব্যবহার করা ও সাধারণ নাগরিকদের মৌলবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত করা ও সংগঠিত করা।

১৮ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বালুকা ও ডুবালিয়া পাড়া এলাকায় একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একটি কাপড় কারখানায় কর্মরত দীপু চন্দ্র দাস (Dipu Chandra Das) নামে এক হিন্দু যুবককে তথাকথিত তৌহিদ জনতা খুন করে। গণপিটুনি ও লাঞ্ছিত করে হত্যার পর তার মৃতদেহ গাছে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি শুধু শারীরিক হত্যাই নয়, এক ধরনের মব জাস্টিস (Mob Justice)। অর্থাৎ জনতার হাতে বিচার। দীপু দাসের হত্যাকাণ্ড একটি দুর্ভাগ্যজনক ও নৃশংস সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা জরুরি, ইনকিলাব মঞ্চের নিহত তরুণ প্রজন্মের নেতা শরীফ ওসমান হাদি নিজেকে ‘তৌহিদ’ বলতেন। বাংলাদেশের যুব সমাজ তাকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছে। হাদি এখন নজ়রুলের পাশে সমাধিস্থ।


লেখক পরিচিতি

সৌমিক চট্টোপাধ্যায়

সৌমিক চট্টোপাধ্যায় কলকাতার কাশীপুরের জৈন কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি একজন প্রাবন্ধিক।


Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন


Exit mobile version