ক্রিকেট মাঠে একাধিক নতুন দেশ নাম লিখিয়েছে। তবে প্রত্যেকেই টি-টোয়েন্টিতেই নিজেদের আটকে রেখেছে। তাই এখন টি-টোয়েন্টিতে টিমের ভিড় হলেও টেস্ট বা ODI ক্রিকেটে সেই ভিড়টা নেই। কিন্তু এই নতুন দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম Afghanistan Cricket। ভারতের এই পড়শি দেশ এখন বিশ্ব ক্রিকেটে অন্যতম শক্তি। কীভাবে সম্ভব হলো এটা? জেনে নিন Afghanistan Cricket Journey.
Table of Contents
আফগানিস্তান নামটা শুনলে এতদিন সবার মনে আসত যুদ্ধ, তালিবান, মার্কিনি শাসন। এখন সেই ছবিটা বদলেছে একমাত্র ক্রিকেটের জন্য। সবকিছু অবশ্য তাদের ভালো নয়। কিন্তু মন্দের মধ্যে ভালো একমাত্র ক্রিকেট। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে টপকে গিয়েছে আফগানরা। দেশের আর্থিক সমস্যা দারিদ্রতার মধ্যে দেশবাসীকে একসঙ্গে রেখেছে এই একটা খেলা।
Afghanistan Cricket Journey বুঝতে গেলে সবার আগে জানতে হবে তাদের শুরুটা।
কী করে শুরু হলো Afghanistan Cricket?
আফগানিস্তানের ক্রিকেট খেলার জন্ম প্রকৃতপক্ষে তাদের নিজ দেশে নয়, বরং পাকিস্তানে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরে। রাশিয়ার আক্রমণের পর অসংখ্য আফগান নাগরিক পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। সেখানেই তারা ক্রিকেটের সংস্পর্শে আসে। শরণার্থী শিবিরে থেকেই নিজেরা কাঠের ব্যাট এবং পাথর বা কাপড় দিয়ে তৈরি বল দিয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করে। জীবনের লড়াই ভুলিতে দিত সেই ক্রিকেট। তাই ধীরে ধীরে এই ক্রিকেট তাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

Afghanistan Cricket Journey
- ১৯৯৫ সাল: শরণার্থী শিবির থেকে ফিরে আসা কিছু উৎসাহী মানুষ আফগানিস্তানে ফিরে Afghanistan Cricket Board বা ACB গঠন করে।
- ২০০১ সাল: এই বছর আফগানিস্তান ICC-র অ্যাসোসিয়েট সদস্যপদ পায়। এটি ছিল Afghanistan National Cricket Team-এর প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
- ২০০৯ সাল: আফগানিস্তানের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। তারা ICC-র ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ ডিভিশন থ্রি-তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ODI স্ট্যাটাস লাভ করে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের প্রথম ODI ম্যাচ জিতে বিশ্ব ক্রিকেটকে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়।
- ২০১০ সাল: মাত্র এক বছরের মধ্যে তারা ICC টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে। এটি ছিল তাদের ক্রিকেটের যাত্রায় এক বড় পদক্ষেপ।
- ২০১৫ সাল: ODI বিশ্বকাপে তারা প্রথমবার অংশ নেয় এবং সেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ জয় লাভ করে।
এভাবেই যুদ্ধ এবং দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে আসা একটি দল কেবল কয়েক বছরের মধ্যে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়, যা তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং প্রতিভার প্রতিফল।
আফগানিস্তানের ক্রিকেট যাত্রার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
শুরুর দিনগুলো: মাত্র এক দশক আগে আফগানিস্তান ICC-র তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম বিভাগের ম্যাচগুলোতে খেলত।
২০১৫ ODI বিশ্বকাপ: সামিউল্লা শেনওয়ারির এক ইনিংসের সৌজন্যে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এক উইকেটের জয়ের মাধ্যমে আফগানিস্তান প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বের নজর কাড়ে।

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: অধিনায়ক আসগর স্টানিকজাই ঘোষণা করেছিলেন যে আফগানিস্তান এমন একটি শক্তিশালী দল হবে যারা ICC-র পূর্ণ সদস্যদের সহজে হারাতে পারবে। সেটা তারা প্রমাণ করেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বাংলাদেশকে হারিয়েছে। তারা শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকেও বেশ বেগ দিয়েছে (Afghanistan Cricket Journey)।
২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: এই বিশ্বকাপের সময়ে আফগানিস্তান বিশ্ব ক্রিকেটে তাদের ‘দবদবা’র প্রমাণ দিয়েছে। সব দল হোমওয়ার্ক করে খেলতে নামে। তারা সেই বিশ্বকাপে একটিও ম্যাচ জিততে না পারলেও, ভারত ও পাকিস্তানকে প্রায় হারিয়ে দিয়েছিল। এছাড়াও একাধিক ম্যাচ তারা কম মার্জিনে হেরেছিল।
২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ: এটি ছিল আফগানিস্তানের সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ অভিযান। তারা নয়টি ম্যাচের মধ্যে চারটি জেতে।
এই জয়গুলো ছিল ইংল্যান্ড, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। ওয়ানডে ক্রিকেটে তাদের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া করার রেকর্ডটিও এই বিশ্বকাপেই করেছিল। সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান। তবে, বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যাটিং ধস, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ হাতছাড়া করা এবং ওয়াংখেড়েতে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের অলৌকিক ইনিংসের মতো কিছু কারণে তারা অল্পের জন্য সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ হারায়। আফগানিস্তান নেট রান রেটের ভিত্তিতে পাকিস্তানের ঠিক পেছনে থেকে ষষ্ঠ স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে, এবং তারা পয়েন্ট টেবলে ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার থেকে এগিয়ে ছিল।
Afghanistan Cricket-এ পরিবর্তন হলো কীভাবে?
রিফিউজি ক্যাম্প থেকে ক্রিকেট শুরু করে সেটাকে এই স্তরে নিয়ে যেতে শুধু নিজেদের জেদ, ইচ্ছা থাকলেই হয় না। দরকার হয় সঠিক দিশা। সেটা তারা পেয়েছে কোচিংয়ের মধ্যে দিয়েছে। আফগানিস্তান ক্রিকেট বারবার একই পদ্ধতিতে হাঁটে। যেই দেশেই তারা বিশ্বকাপ খেলে সেই দেশের প্রাক্তন ক্রিকেটারকে বিশ্বকাপের জন্য মেন্টর হিসেবে বেছে নেয়। যেমন ২০২৩ সালে ভারতে বিশ্বকাপ হয়েছিল, সেবার অজয় জাডেজাকে মেন্টর করেছিল। ২০২৪ সালে তারা মেন্টর করে ডোয়েন ব্র্যাভোকে।
কোচিংয়ের প্রভাব: তবে এই পরিবর্তনের একটি বড় অংশ দলের প্রধান কোচ জোনাথন ট্রটের জন্য সম্ভব হয়েছে। তিনি ২০২২ সালের জুলাই মাসে দলের দায়িত্ব নেন। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন এই ব্যাটার এই দলের মধ্যে স্থিরতা এনেছেন। তিনি দেখেছেন, আগে প্লেয়াররা অধৈর্য হয়ে খেলত, এতে ভুল হতো এবং জেতা ম্যাচ হেরে আসত।
২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: এই টুর্নামেন্টটিতে আফগানিস্তান একটি বার্তা দেয়। তারা সেমিফাইনালে পৌঁছে প্রমাণ করে যে তারা শুধু ভালো লড়াই করার জন্য নয়, বরং জেতার জন্যই অংশগ্রহণ করে। রশিদ খানের নেতৃত্বে দলটি সুপার এইট এবং তারপর সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এই যাত্রায় তারা উগান্ডা, নিউ জ়িল্যান্ড, পাপুয়া নিউ গিনি এবং বাংলাদেশকে পরাজিত করে।
Durand Cup: বয়স 134 বছর, কী ভাবে ও কেন শুরু হলো এশিয়ার প্রাচীন টুর্নামেন্ট?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকেও হারিয়েছিল, যা ছিল ২০২৩ সালের হারের বদলা। যদিও তারা সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে যায়।
২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি: এই টুর্নামেন্টের গ্রুপ বি-তে আফগানিস্তানের প্রতিপক্ষ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর, তারা ইংল্যান্ডকে আট রানে পরাজিত করে, যেখানে ইব্রাহিম জাদরানের ১৭৭ রান এবং আজ়মাতুল্লাহ ওমরজ়াইয়ের ৫ উইকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়। যদিও তারা সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। যেখানে পাকিস্তান, বাংলাদেশ জয় পায়নি, শ্রীলঙ্কার মতো দল যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, সেখানে আফগানিস্তান ছিল আলাদা।
আফগানিস্তান ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ
ভারত এশিয়ার অবিসংবাদিত এক নম্বর দল, কিন্তু আফগানিস্তান চুপচাপ সাদা বলের ক্রিকেটে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। তাদের অগ্রগতি পাকিস্তানকে হার মানিয়েছে। কারণ পাকিস্তান এখন আর ধারাবাহিক নয়। শুধু নামই আছে তাদের। শ্রীলঙ্কা কখন ভালো খেলবে কেউ জানে না। সেই দলের মধ্যে আর সিরিয়াস ব্যাপারটা নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকেও নেই। ফলে সবার মধ্যে ভারতের পর উজ্জ্বল একমাত্র আফগানিস্তান।
Nagendra Prasad Sarbadhikari: ব্রিটিশদের থেকে বল কেড়ে বাঙালিকে ফুটবল খেলা শেখান
তাদের এই অসাধারণ উত্থান সত্ত্বেও, উন্নতির অনেকগুলো জায়গা রয়েছে। যারমধ্যে একটি হচ্ছে ODI ক্রিকেটকে আরও বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া। ব্যাটিং এবং ফিল্ডিংয়ে ধারাবাহিকতা। বিশেষত ক্যাচিংয়ের উন্নতি প্রয়োজন। তবে, একটি দেশে, যেখানে ক্রমাগত সংঘাত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিত থাকে, সেসবের মাঝে ক্রিকেটকে আলাদা করে তুলে ধরে গোটা দেশকে এক করা প্রশংসার প্রাপ্য। এখনও আফগানিস্তান দল কোনও বড় জয় পেলে সেদেশের মানুষরা এক হয়ে সেলিব্রেট করেন।
তবে ক্রিকেট নিয়ে এই সেলিব্রেশনের মধ্যেও মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তানে তালিবান সরকার মহিলাদের অনেক খেলায় ব্যান লাগিয়েছে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.



















