বাঙালির বুকে ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের একটা খেলা নয়; এটি অস্তিত্বের লড়াই, চোখের জল আর শিকড়ের টানের এক মহাকাব্য। আর এই লড়াইয়ের পতাকাবাহী যে নামটি কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন তৈরি করে, তা হলো ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। গ্যালারি কাঁপানো ‘জয় ইস্টবেঙ্গল’ গর্জন কিংবা গলার রগ ফুলিয়ে মশালের স্লোগান—সবকিছুকে যে একটি সুতোয় বেঁধে রাখে, তা হলো তাদের গায়ে থাকা সেই পবিত্র লাল এবং হলুদ জার্সি।
Table of Contents
কিন্তু আপনি কি জানেন, রক্তে মিশে যাওয়া এই ‘লাল-হলুদ’ পোশাক কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের প্রথম পছন্দ ছিল না? ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা বুকে চেপে লড়াই শুরু করা এক ক্লাবের কাছে এই রং কীভাবে রাতারাতি জীবন-মরণের আবেগ হয়ে উঠল? ইতিহাসের পাতা উল্টে আজ জানা যাক শতবর্ষের সেই অশ্রু ও গর্বের গল্প। (East Bengal Jersey History)
East Bengal Jersey History: প্রথম দিনের রঙ: লাল-হলুদের আগে যেখানে ছিল যন্ত্রণার ইতিহাস
১৯২০ সালের ১ অগস্ট। জোড়াসাঁকোর সুরেশচন্দ্র চৌধুরীর বাড়িতে যখন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্ম হচ্ছে, তখন তাঁর পিছনে ছিল চরম অপমান আর অবহেলার ইতিহাস। জোড়াবাগান ক্লাবের সেরা দল থেকে বাঙাল হওয়ার অপরাধে বাদ দেওয়া হয়েছিল শৈলেশ বসুকে। সেই ক্ষোভ, নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার তাড়না আর ওপার বাংলা থেকে আসা মানুষদের স্বাধিকার আদায়ের শপথ নিয়ে জন্ম নেয় এই ক্লাব।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রথম অফিসিয়াল পোশাকটি ছিল লাল এবং হলুদ সাদা শার্ট ও কালো শর্টস।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় যে অন্য এক রাজকীয় রঙের আগমন লেখা ছিল!
আরও পড়ুন: বিতর্কিত কাশ্মীরে প্রাণের সঞ্চার, কীভাবে Real Kashmir FC বদলে দিল ভূস্বর্গের ছবি?
চৌরঙ্গীর সেই রাত এবং এক রূপকথার আত্মপ্রকাশ
১৯২৪ সাল। ময়দানে তখন ইস্টবেঙ্গল মানেই এক ঝড়। দ্বিতীয় ডিভিশনে একের পর এক ম্যাচ জিতে প্রথম ডিভিশনে ওঠার স্বপ্ন দেখছে ওপার বাংলা থেকে আসা সর্বহারা মানুষগুলো। তাঁদের কাছে এই জয়গুলো ছিল ময়দানে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার একমাত্র পথ। (East Bengal Jersey History)
ঠিক এমনই এক মহা-গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগের দিন নেমে এলো এক অনাকাঙ্খিত দুর্যোগ:
- খেলার পোশাক নেই: ক্লাবের তাঁবুতে দেখা গেল, আগামীকালের ম্যাচের জন্য পর্যাপ্ত ‘লাল-সাদা’ জার্সি তৈরি নেই। অর্থাভাব আর যোগাযোগের সমস্যায় দিশেহারা হয়ে পড়লেন ক্লাব কর্তারা।
- অন্ধকারে আলোর খোঁজ: ম্যাচ ভেস্তে যাওয়া মানেই স্বপ্ন চুরমার। ক্লাবের কর্তারা রাতেই ছুটে গেলেন কলকাতার চৌরঙ্গী এলাকার বিখ্যাত ব্রিটিশ দোকান ‘হোয়াইটওয়ে লেডল’-এ (Whiteway, Laidlaw & Co.)।
- দোকানের শেষ সম্বল: ভাগ্য হয়তো সেদিন অন্য ইতিহাস লিখতে চেয়েছিল। দোকানে গিয়ে জানা গেল, লাল-সাদা কোনও পোশাকই আর স্টকে অবশিষ্ট নেই। কেবল এক কোণে পড়ে রয়েছে একটি লাল এবং হলুদ রঙের স্ট্রাইপ দেওয়া (Vertical Stripes) অচেনা জার্সি। প্রথম দেখাতেই সেই জার্সি চোখে লেগে যায় প্রতিষ্ঠাতা সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী ও খেলোয়াড় অরবিন্দ ঘোষের। সেই সময় জার্সিটির নাম নিয়েছিল ৮০ টাকা।
- মাঠে নামল এক নতুন সূর্য: ওই লাল-হলুদ শার্টগুলোই কিনে নেওয়া হলো। পরদিন সকালে যখন খেলোয়াড়রা সম্পূর্ণ নতুন এই রঙে মাঠে নামলেন, গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার ওপার বাংলার মানুষ থমকে গিয়েছিলেন। (East Bengal Jersey History)
কিন্তু সেদিন সেই নতুন পোশাকে ইস্টবেঙ্গল মাঠে নামেনি, যেন এক অগ্নিগিরি ফেটে পড়েছিল! প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে এক অবিস্মরণীয় জয় ছিনিয়ে নেয় তারা।
লাল হলো সাহসের রক্ত, হলুদ হলো ভোরের সূর্য
সেদিনের সেই আকস্মিক জয় কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের জয় ছিল না; তা ছিল ভাগ্যের এক অদ্ভুত দিকনির্দেশনা। ক্লাব কর্তারা এবং সমর্থকরা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, এই লাল-হলুদ রং স্বয়ং ঈশ্বর তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—আর কোনও দিন পুরোনো লাল-সাদা রঙে ফেরা হবে না।
স্থায়ীভাবে ক্লাবের বুকে জায়গা করে নিল লাল ও হলুদ:
- লাল (Red): ওপার বাংলা ছেড়ে আসার যন্ত্রণা, বুকের ভেতরের আগুন, লড়াই আর রক্তক্ষয়ী সাহসের প্রতীক।
- হলুদ (Yellow): অন্ধকারের বুক চিরে জেগে ওঠা নতুন ভোর, আশা আর জয়ের উদীত সূর্য।
পরবর্তীকালে এই জার্সির বুকের ওপর যুক্ত হলো সেই জ্বলন্ত ‘মশাল’। যে মশাল অন্ধকার পেরিয়ে নতুন পথ দেখায়, যে মশাল কোটি কোটি ঘটি-বাঙালের আত্মসম্মানের প্রতীক।
বিবর্তন পেরিয়েও যা কোনওদিন বদলায়নি
দশকের পর দশক কেটে গেছে। আই-লিগ পেরিয়ে ফুটবল আজ আইএসএল-এর (ISL) আধুনিক ও জমকালো যুগে পা দিয়েছে। কোটি কোটি টাকার স্পনসরশিপ এসেছে, ফ্যাব্রিকের ধরন বদলেছে, জার্সির শেডে আধুনিকতা এসেছে। কিন্তু গ্যালারির সেই বয়স্ক দাদু থেকে শুরু করে ছোট নাতিটির গায়ে থাকা শার্টটির মূল ‘লাল এবং হলুদ’ স্ট্রাইপ বিন্দুমাত্র অনুজ্জ্বল হয়নি। (East Bengal Jersey History)
আরও পড়ুন: কলেজের দল থেকে আইলিগ, জেনে নিন Rajasthan United FC I-League Journey
কাপড়ের টুকরো নয়, এটি এক জীবনগাথা
পৃথিবীতে অনেক ফুটবল ক্লাবের জার্সি সুন্দর হতে পারে, কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের লাল-হলুদ জার্সির মতো এত কান্না, এত অপমান আর এত ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস খুব কম পোশাকের ভাগ্যেই জোটে। ১৯২৪ সালের চৌরঙ্গীর দোকান থেকে কেনা সেই একজোড়া লাল-হলুদ শার্ট আজ শতবর্ষ পেরিয়ে কোটি মানুষের বেঁচে থাকার রসদ।
আজও যখন গ্যালারিতে হাজার হাজার লাল-হলুদ পতাকা একসাথে বাতাসে ওড়ে, তখন মনে হয়—এটি কেবল একটি খেলার পোশাক নয়, এটি ভিটেমাটি হারানো এক লড়াকু জাতির অমর পরিচয়পত্র! (East Bengal Jersey History)
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

