ভারতের ফুটবলের ইতিহাস আলোচনা করতে বসলে কয়েক মাস লেগে যাবে। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডানের হাত ধরে একাধিক সোনালি ম্যাচের সাক্ষী থেকেছে বাংলা। সেই রকমই একটা 1997 Federation Cup Semi Final ম্যাচ। যেটা Diamond Match নামেও পরিচিত, এই ম্যাচটা ছিল East Bengal vs Mohun Bagan-এর। এই ম্যাচের রেকর্ড এখনও ভারতের কোনও ক্লাব বা কোনও কোচ ভাঙতে পারেনি।
Table of Contents
ফুটবল ম্যাচে তো হার জিত থাকবে। সেটা দেখতে সমর্থকরা ভিড় করেন বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিকিটের জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু এই একটা ম্যাচের প্রেক্ষাপট, উত্তেজনা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবচেয়ে আলাদা।
এই ম্যাচকে কেন Diamond Match বলা হয়?
ডায়মন্ড ম্যাচ কথাটা এসেছে ডায়মন্ড ফর্মেশনের জন্য। তৎকালীন মোহনবাগান কোচ বর্তমানে প্রয়াত অমল দত্ত ডায়মন্ড ফর্মেশন এনেছিলেন। আর সেই ম্যাচে তিনি ডায়মন্ড ফর্মেশনে খেলিয়েছিলেন।
কী ছিল ডায়মন্ড ফর্মেশন?
দিনটা ছিল ১৩ জুলাই, সেই দিনে ডায়মন্ড ফর্মেশনে দলকে ৩-২-৩-২ তে সাজানো হয়, যেটা হীরে বা ডায়মন্ডের আকার নেয়। এই আক্রমণাত্মক কৌশলটি ভারতীয় ফুটবলে সেই সময়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। অমল দত্ত বিশ্বাস করতেন যে এই ফর্মেশন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করবে এবং গোলের সুযোগ তৈরি করবে। তাঁর এই সাহসী এবং উদ্ভাবনী কৌশল ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
দুই কিংবদন্তী কোচের মুখোমুখি
এই ঐতিহাসিক ম্যাচে শুধু দুটি শক্তিশালী দলই মুখোমুখি হয়নি, বরং মুখোমুখি হয়েছিলেন ভারতীয় ফুটবলের দুই কিংবদন্তী কোচ – অমল দত্ত এবং পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’জনেই প্রয়াত হয়েছেন।
Durand Cup: বয়স 134 বছর, কী ভাবে ও কেন শুরু হলো এশিয়ার প্রাচীন টুর্নামেন্ট?
অমল দত্ত তাঁর ডায়মন্ড ফর্মেশন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গলের তৎকালীন কোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণ রণনীতির জন্য পরিচিত। এই দুই কোচের কৌশলগত লড়াই ম্যাচটিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। একদিকে ছিল অমল দত্তের আক্রমণাত্মক কৌশল, তেমনই পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্তি ছিল রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা এবং কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর।

ডায়মন্ড ম্যাচ-এর ফলাফল: লাল-হলুদের দাপট
একে দুই কিংবদন্তী কোচ, অন্যদিকে চর্চিত ডায়মন্ড ফর্মেশন। তার উপর ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনাল সব মিলিয়ে স্টেডিয়াম ভর্তির জন্য পর্যাপ্ত ছিল। সেই সময়ে যুবভারতীতে দর্শক সংখ্যা এত কম ছিল না। ১ লাখ ৩১ হাজার দর্শক অফিসিয়ালি মাঠে ছিলেন।
ম্যাচের বাঁশি বাজতেই শুরু হয়েছিল আসল লড়াই। তবে মাঠের খেলায় শেষ পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গলের দাপট দেখা যায়। লাল হলুদ ৪-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে মোহনবাগানকে পরাজিত করে। এই ম্যাচে বাইচুং ভুটিয়া ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক করেন, যা কলকাতা ডার্বির ইতিহাসে প্রথম হ্য়াটট্রিক ছিল। সেই ম্যাচের পর বাইচুং ভুটিয়াকে কেরিয়ারে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই বাইচুং ধীরে ধীরে পাহাড়ি বিছে হয়ে বিচরণ করেছেন কলকাতায় ময়দান থেকে দেশের ময়দানে এবং কিংবদন্তী হয়ে শেষ করেছেন।
অন্যদিকে, অমল দত্তের ডায়মন্ড ফর্মেশন প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয় এবং মোহনবাগানকে হারতে হয়। যেহেতু পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌশলে বহু চর্চিত ডায়মন্ড ফর্মেশন ভেঙে গিয়েছিল তাই তখন থেকে সেটাকে ডায়মন্ড ম্যাচ বলা হয়।
জনসমুদ্রের সাক্ষী যুবভারতী
বাংলার অন্যতম বড় স্টেডিয়ামে যুবভারতীতে সেই ম্যাচে দর্শক ছিলেন ১ লাখ ৩১ হাজার। যা যুবভারতীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি সেই সময়ে এশিয়ার যেকোনও ফুটবল ম্যাচের সর্বোচ্চ দর্শকসংখ্যার রেকর্ড ছিল। ফুটবলপ্রেমীদের এই বাঁধভাঙা উৎসাহ এবং উন্মাদনা ম্যাচটিকে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দান করেছিল। স্টেডিয়ামের কানায় কানায় পূর্ণ গ্যালারি এবং দর্শকদের মুহুর্মুহু চিৎকার আজও সেই ম্যাচের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
Nagendra Prasad Sarbadhikari: ব্রিটিশদের থেকে বল কেড়ে বাঙালিকে ফুটবল খেলা শেখান
তবে সেমিফাইনালে ইস্টবেঙ্গল ৪-১ গোলে জিতলেও ফাইনালে গিয়ে হেরে যায়। সালগাওকর ২-১ গোলে পরাজিত করে ফেডারেশন কাপ ঘরে তোলে।
East Bengal vs Mohun Bagan Diamond Match-এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য
এটি আর পাঁচটা কলকাতা ডার্বির মতো ছিল না। এটা ছিল বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ম্যাচটি একদিকে যেমন নতুন কৌশল এবং ফরমেশনের প্রবর্তন দেখেছিল, তেমনই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
বাইচুং ভুটিয়ার হ্যাটট্রিক এবং ইস্টবেঙ্গলের বিশাল জয় আজও লাল-হলুদ সমর্থকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। অন্যদিকে, মোহনবাগান সমর্থকদের জন্য এই ম্যাচটি একটি হতাশাজনক স্মৃতি হলেও, অমল দত্তের সাহসী কৌশল ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
ডায়মন্ড ম্যাচের আগে বা পরের হিসেব দেখলে একাধিকবার East Bengal vs Mohun Bagan ম্যাচ হয়েছে। দুই ক্লাবে লেগেছে কর্পোরেটের ছোঁয়া। কিন্তু কোথাও এটা গিয়ে এই ম্যাচটা ১৯৭৫ সালের ৫-০ র ডার্বির মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও একাধিক ম্যাচের ফল ৪-১ হবে, কিন্তু ১ লাখ ৩১ হাজার দর্শক বা একটা ফর্মেশন নিয়ে আলোচনা সেটা হয়তো হবে না, বা নতুন তারকা হিসেবে কারও জন্মও হবে না, যে পরে কিংবদন্তী হয়ে কেরিয়ার শেষ করবে।
FAQ
ভারতীয় ফুটবলে ডায়মন্ড ম্যাচ কী?
ডায়মন্ড ম্যাচ কথাটা এসেছে ডায়মন্ড ফর্মেশনের জন্য। তৎকালীন মোহনবাগান কোচ বর্তমানে প্রয়াত অমল দত্ত ডায়মন্ড ফর্মেশন এনেছিলেন। আর সেই ম্যাচে তিনি ডায়মন্ড ফর্মেশনে খেলিয়েছিলেন।
ডায়মন্ড ম্যাচের ফল কী?
1997 Federation Cup Semi Final ম্যাচকে বলা হয় ডায়মন্ড ম্যাচ। এই ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল ৪-১ গোলে মোহনবাগানকে হারিয়েছিল।
ডায়মন্ড ম্যাচের দর্শক সংখ্যা
১ লাখ ৩১ হাজার
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.



















