বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিগ থ্রি হচ্ছে ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। এই তিন দেশের উপর ICC-র আয়ের অনেকটা নির্ভর করে। তাই প্রতি বছর এই তিন দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে পালা করে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ় খেলে। সেই দ্বিপাক্ষিক সিরিজ়ের মধ্যে একটি অ্যাশেজ (The Ashes), বা ছাই ভষ্ম। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে খেলা এই টেস্ট সিরিজ়ের নাম কেন অ্যাশেজ? আচমকা কেন এই নাম দিতে হলো? এর পিছনে রয়েছে ইতিহাস। এই প্রতিবেদনে জেনে নিন একটি ক্রিকেট সিরিজ়ের নাম ছাই ভষ্ম হওয়ার গল্প।
Table of Contents
ক্রিকেটের জন্ম ইংল্যান্ডের মাটিতে। আর ক্রিকেটে আভিজাত্য ঢুকিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে সাদা চামড়ার এই দুই দেশের লড়াই শুধু স্কোরবোর্ডের নয়, এটা অহংকার, দেশের মর্যাদা ও ইতিহাসের লড়াই। আর সেই সবকিছুর বদলার মঞ্চ হচ্ছে অ্যাশেজ। এই অ্যাশেজের লড়াইয়ের শুরুটা ১৮৮২ সাল থেকে।
১৮৮২ সালের ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ওভালে ব্রিটিশ দর্পচূর্ণ
অ্যাশেজ সিরিজের নামকরণের ইতিহাস জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে ১৮৮২ সালের অগস্ট মাসে। সেই মাসে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজ় খেলতে ইংল্যান্ড যায় (England vs Australia)। সেই সময় পর্যন্ত ব্রিটিশরা তাদের ক্রিকেটের সুপিরিয়র ভাবত। তাদের ধারণা ছিল, ক্রিকেট খেলার জন্মদাতা হওয়ার জন্য তাদের থেকে কোনও দেশ ভালো খেলতে পারবে না এবং তারাই জিতবে সবসময়।
সেই সিরিজ়ে একটি ম্যাচ হয়েছিল। যেটা হয়েছিল লন্ডনের কেনিংটন ওভালে। এই ম্যাচের ফল ছিল ইংরেজদের কাছে একটা অপমান। বলা ভালো ইংরেজদের দর্পচূর্ণ হয়েছিল এই ম্যাচে।
lord’s Stadium-এর 8 ফুটের ঢালেই খেলা হয় ম্যাচ, কেন এই বিপুল ঢাল? নেপথ্যে কারণ কী?
দেখে নিন England vs Australia-র মধ্যে ঐতিহাসিক সেই ম্যাচের আপডেট
- অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস: অস্ট্রেলিয়া প্রথমে ব্যাট করে মাত্র ৬৩ রানে অলআউট হয়ে যায়। ব্রিটিশরা তখন নিশ্চিত ছিল যে জয় তাদেরই হবে।
- ইংল্যান্ডের পতন: জবাবে ইংল্যান্ড তাদের প্রথম ইনিংসে ১০১ রান করে, মাত্র ৩৮ রানের লিড নেয়। এটা ছিল তাদের কাছে প্রথম ধাক্কা।
- দ্বিতীয় ইনিংসে নাটক: অস্ট্রেলিয়া তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে করে ১১২ রান, যার ফলে ইংল্যান্ডের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৮৫ রানের।
- ব্যাটারদের ব্যর্থতা: কিন্তু ক্রিকেট ইতিহাসে এর চেয়ে বড় ব্যাটিং বিপর্যয় খুব কমই দেখা গিয়েছে। ইংরেজরা ৮৫ রান তাড়া করতে নেমে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭৭ রানে অলআউট হয়ে যায় ও অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটা জেতে সাত রানে।
এই হারটা ইংল্যান্ডের কাছে আর পাঁচটা হারের মতো ছিল না। এটা ছিল তাদের অহংকারের পতন। দেশে দেশে বাণিজ্যের নামে শাসন করা ইংল্যান্ডের কাছে সবদিক থেকে এটা ছিল অপমান। এই ম্য়াচ হারের পর গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়।
The Ashes নামের উৎস: দ্য স্পোর্টিং টাইমস-এর শোকবার্তা
এই হারের পর জন্ম হয় অ্যাশেজের। ১৮৮২ সালের ২ সেপ্টেম্বর, লন্ডনের একটি বিখ্যাত ক্রীড়া পত্রিকা, দ্য স্পোর্টিং টাইমস (The Sporting Times), একটি ব্যঙ্গাত্মক শোকবার্তা প্রকাশ করে। সেই শোকবার্তাটি ছিল ইংরেজি ক্রিকেটের প্রতীকী মৃত্যু ঘোষণা। এই লেখাটিই ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
সেই বিখ্যাত শোকবার্তায় লেখা ছিল:
ইংলিশ ক্রিকেট, ২৯ অগস্ট, ১৮৮২, ওভালে মারা গেছে। গভীর শোকের সঙ্গে বন্ধুদের জানানো হচ্ছে যে, এই দেহটি দাহ করা হবে এবং ছাই ভস্ম (The Ashes) অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।
(In Affectionate Remembrance of ENGLISH CRICKET, which died at the Oval on 29th August 1882. The body will be cremated and the Ashes taken to Australia.)
আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই শোকবার্তা। এমনিতেই ম্যাচ হারের ফলে গোটা দেশ স্তব্ধ ছিল। সেটা আরও বাড়ে এই ব্যাঙ্গ্যাত্মক শোকবার্তার জন্য।
এই শোকবার্তার কথা শুনে ইংল্যান্ডের তৎকালীন অধিনায়ক আইভো ব্লাই (Ivo Bligh) প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, তাঁর দল অস্ট্রেলিয়া যাবে সেই অ্যাশেজ ফিরিয়ে আনতে। অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরতি সিরিজ়ে তাঁরা জিতবেন বলে আশা করেন।

ছাই ভস্মের পবিত্র প্রতীক: The Ashes Urn
আইভো ব্লাইয়ের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড দল ১৮৮২-৮৩ মরসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে যায়। সেই সিরিজে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ এ পরাস্ত করে। এবং তৎকালীন অধিনায়ক আইভো ব্লাই অ্যাশেজ ফিরিয়ে আনার যে কথা দিয়েছিলেন সেটা রাখেন।
এই সিরিজ়ের পর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের একদল মহিলা ইংল্যান্ড অধিনায়ককে একটি ছোট্ট কলসি উপহার দেন। তার ভিতরে কী ছিল জানা না গেলেও, একাধিক রিপোর্টে দাবি, সেই কলসির ভিতরে ছিল উইকেটের উপরে থাকা বেলের ছাই। অর্থাৎ, ক্রিকেটের একটি বেলকে পুড়িয়ে সেটির ছাই দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে অ্যাশেজে যেটাকে ট্রফি হিসেবে দেওয়া হয় সেটা হচ্ছে সেই কলসির প্রতীক। এটিকেই অ্যাশেজের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে আসল কলসিটা কোনও দলকেই দেওয়া হয় না। আসল প্রতীকরা লর্ডসের মিউজ়িয়ামে রয়েছে।
আইভো ব্লাই তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এটি তাঁর কাছে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর, এটি এমসিসি-কে দেওয়া হয়। তখন থেকেই এটি ক্রিকেটের সবচেয়ে মূল্যবান এবং প্রতীকী স্মারক হিসেবে লর্ডসে সংরক্ষিত আছে। এই আর্ন-এর পেছনেই লেখা আছে সেই বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক শোকবার্তার লাইনগুলি।

বর্তমানে অ্যাশেজ সিরিজ়
আজকের অ্যাশেজ সিরিজ় হলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। অর্থাৎ, WTC-র পয়েন্ট টেবলের উত্থান পতন হয় এই সিরিজ়ের উপর।
অ্যাশেজ সিরিজ় প্রতি দু’বছর অন্তর একবার ইংল্যান্ডে এবং একবার অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সিরিজ়ে থাকে পাঁচটি টেস্ট ম্যাচ।
তবে আগের মতো অ্যাশেজ সিরিজ় নিয়ে ইংরেজদের দম্ভ না থাকলেও এখনও মান মর্যাদার প্রতীক এটা। ইংল্য়ান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক জো রুটের টানা অ্যাশেজ হারের ফলে তাঁকে নিন্দার মুখে পড়তে হয়েছিল। আবার অস্ট্রেলিয়ায় অজ়িদের সঙ্গে ইংরেজ প্লেয়ারদের পার্টি করা নিয়েও চর্চা হয়েছিল।
চলছে 225 বছর ধরে, কেন উইম্বলডনে সাদা পোশাক পরেন খেলোয়াড়রা?
অ্যাশেজ সিরিজ় কেন এত জনপ্রিয়?
এটি কেবল ক্রিকেটের প্রতিযোগিতা নয়, এটি ঐতিহ্যের লড়াই। ১৮৮২ সালের পর থেকে এই দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য। যখনই কোনো অ্যাশেজ সিরিজ় শুরু হয়, সেই শোকবার্তা যেন নতুন করে লেখা হয়, যেখানে পরাজিত দল আবারও তাদের গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.




















1 thought on “ক্রিকেট সিরিজ়ের নাম ‘ছাই’? কোথা থেকে এল The Ashes? জানুন 143 বছরের ইতিহাস”