শেষ হয়েছে ৫২ বছরের অপেক্ষা। ভারতের মহিলা ক্রিকেটারদের হাতে উঠেছে বহু প্রতিক্ষীত বিশ্বকাপ। বিশ্বসেরা হয়েছে ভারতের মেয়েরা। ১৯৮৩ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারতের পুরুষ দল আর মেয়েরা জিতল ২০২৫ সালে। ১২৫ কোটি ভারতবাসী এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী রইলেন। কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেটের এই পোডিয়াম ফিনিশের যাত্রাটা এখনকার মতো ছিল না। BCCI অন্যতম ধনী ক্রিকেট বোর্ড হলেও মেয়েদের ক্রিকেটকে তৈরি করতে অনেক সময় নিয়ে নিয়েছে তারা। কীভাবে বিশ্বকাপের যাত্রা পূরণ করলেন স্মৃতিরা। এই প্রতিবেদনে জেনে নেব সেটা (Indian Women Cricket History)।
Table of Contents
অপরিষ্কার ডরমেটরিতে থাকা, শৌচালয়ের অভাব, বিদেশ সফরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করতে না পারা, ক্রিকেট কিট ভাগ করে খেলা— একটা সময়ে এটাই ছিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের চিত্র। আজ সেই দল পাচ্ছে পুরুষের সমান বেতন, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট, কোটি টাকার বেতন। এক একজন ক্রিকেটার ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি ব্যবসাও করছেন।
এখন হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বে টিম ইন্ডিয়া যে বিল্ডিংয়ের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটার ভিত তৈরি করেছিলেন শান্থা রঙ্গস্বামী (Shantha Rangaswamy) এবং নূতন গাভাস্করের (Nutan Gavaskar) মতো কিংবদন্তিরা। আজকের মতো ছিল না পরিকাঠামো, প্রযুক্তি, বেতন। তা সত্ত্বেও তাঁরা লড়াই করে নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করেছিলেন।
উইমেন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার জন্ম এবং শুরুর কঠিন দিনগুলি: পেশাদারিত্ব ছিল কেবল স্বপ্ন
১৯৭৩ সালে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের পথচলা শুরু হয় উইমেন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার হাত ধরে। এটি ছিল হাতেগোনা কিছু মানুষের ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখার ফল। সেই সময়ের একজন WCAI-এর প্রাক্তন সম্পাদক নূতন গাভাস্কর (সুনীল গাভাস্করের ছোটো বোন) বলেন, ‘তখন কোনও টাকাপয়সা ছিল না, স্পন্সর ছিল না, আর বিদেশ সফর মানে ছিল এক বিরাট ঝক্কি।’
একদিকে ছিল BCCI। যেখানে ছেলেদের ক্রিকেটে ছিল অর্থ এবং সুবিধা। সেখানে WCAI ছিল অনেকটাই পিছনে। কারণ তাদের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও, তাদের বাজেট ছিল একেবারেই সীমিত। নূতন গাভাস্করের কথায়, তাঁদের বারবার বলা হতো যে মহিলাদের ক্রিকেট কোনও পেশাদার খেলা নয়। সেই কারণে প্লেয়ারদের কোনও বেতন বা ম্যাচ ফি-র দরকার নেই।

মহিলা ক্রিকেটারদের সংগ্রাম: কিট ভাগাভাগি ও অর্থ-সংকট (Indian Women Cricket History)
ক্রিকেট বরাবরই ব্যয়বহুল খেলা। কিট থেকে শুরু করে প্রস্তুতি সবেতেই খরচটা অনেক বেশি। আর এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামি হচ্ছে ক্রিকেট কিট। বর্তমানে একজন আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া ক্রিকেটারের কাছে একাধিক ব্যাট, প্যাড, গ্লাভস এবং অন্যান্য সুরক্ষার সরঞ্জাম থাকে। কিন্তু সেই সময়ে পরিস্থিতি ছিল করুণ। নূতন গাভাস্কার মজার ছলে বলেন, ‘একটি দলের কাছে হয়তো মোটে তিনটি ব্যাট থাকত। দু’জন ওপেনারের কাছে দু’টি, আর তিন নম্বর ব্যাট করত তৃতীয়জন। কোনও ওপেনার আউট হলে, চার নম্বর খেলোয়াড় সেই ব্যাট আর লেগ গার্ডস নিয়ে মাঠে নামত।’ ঠিক পাড়ার ক্রিকেটে যেটা দেখা যায়।
শান্থা রঙ্গস্বামী এবং ডায়ানা এডুলজিদের (Diana Edulji) মতো খেলোয়াড়দের জন্য ম্যাচ ফি বা দৈনিক ভাতা ছিল এক সম্পূর্ণ অচেনা ধারণা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল—তাঁদের খেলাটা যেন চলতে থাকে, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, খেলা বন্ধ করা যাবে না, খেলে গেলেই আসবে সাফল্য।
এশিয়া ক্রিকেটের দ্বিতীয় শক্তি, দেখে নিন Afghanistan Cricket Journey
ট্র্যাভেলিং ট্র্যাজেডি: জেনারেল কামরা ও অস্বাস্থ্যকর ডরমেটরি
আজ যেখানে ভারতীয় মহিলা দল চার্টার্ড ফ্লাইটে বিজনেস ক্লাসে আন্তর্জাতিক সফর করে, সেখানে একসময় তাদের যাত্রা ছিল বিভীষিকা।
পথপ্রদর্শক শান্থা রঙ্গস্বামী তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, সেই দিনগুলিতে তাঁরা ট্রেনে জেনারেল কামরায় ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ভ্রমণ করতেন ম্যাচ খেলার জন্য। ট্রেনের টিকিট নিজেদের পকেট থেকেই দিতে হতো। কিট ব্যাগই ছিল তাঁদের বিশ্রামের জায়গা। (Indian Women Cricket History)
খেলতে গিয়ে থাকার ক্ষেত্রে এখন যেমন প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ঘর পান, সেই বিলাসিতা ছিল না। এখন প্রত্যেক প্লেয়ারের জন্য আলাদা আলাদা ঘর এবং আলাদা আলাদা শৌচালয়। সেই সময় সেটা ছিল কল্পনা। প্রায়শই তাঁদের ২০ জনের দলকে এমন সব ডরমেটরিতে থাকতে হতো, যেখানে হয়তো মাত্র চারটি শৌচাগার ছিল, এবং সেগুলোর অধিকাংশই পরিচ্ছন্ন থাকত না। কারণ টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য বাজেট ছিল কম। থাকার জায়গার সঙ্গে খাবারের মানও ছিল খারাপ। ডায়েটের খাবার তো দূরের কথা তখন খেলতে গিয়ে ভাত ডাল মিলত প্লেয়ারদের। একটা বড় পাত্র থেকে সবাই ভাগ করে খেতেন।

অর্থ সংগ্রহের লড়াই: মন্দিরা বেদী ও NRI পরিবারের সহায়তা
আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা ছিল অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশ ট্যুরের জন্য ক্রিকেট বোর্ড বাইরে থেকে অর্থ সাহায্য চাইত। নূতন গাভাস্কার সেই সব দিনের কথা মনে করিয়ে জানান, কী ভাবে টাকা জোগাড়ের জন্য তাঁদের প্রতি মুহূর্তে লড়তে হতো।
একবার ইংল্যান্ড সফরের জন্য বিমান টিকিটের টাকা জোগাড় হচ্ছিল না। সেই সময়ে অভিনেত্রী মন্দিরা বেদী একটি বিজ্ঞাপনের তাঁর আয় করা টাকা টিম ইন্ডিয়াকে দিয়েছিলেন টিকিট কাটার জন্য। কিছু কিছু সিরিজ়ে এয়ার ইন্ডিয়ার মতো সরকারি সংস্থা টিকিটের দাম দিত।
বিদেশ সফরে গিয়েও মিলত না হোটেল। একে তো অন্য দেশ, সেখানকার কারেন্সি ভাঙানো খরচের। এই পরিস্থিতিতে প্লেয়াররা থাকতেন NRI পরিবারগুলোর কাছে। যেহেতু বিদেশে ভারতীয়দের একটা বড় সংখ্যা রয়েছে তাই প্লেয়াররা ভাগাভাগি করে সেই পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। এতে খরচ কমত। (Indian Women Cricket History)
সাদা থেকে রংচংয়ে জার্সি, সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে যাচ্ছে ক্রিকেট
নতুন ভোর: BCCI-এর হাত ধরে পেশাদারিত্বের যাত্রা
ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে যখন WCAI (Women’s Cricket Association of India) পুরুষদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা BCCI (Board of Control for Cricket in India)-এর সঙ্গে এক হয়। এটি ছিল মহিলা ক্রিকেটের জন্য এক টার্নিং পয়েন্ট।
- অর্থনৈতিক সুরক্ষা: BCCI-এর অধীনে আসার পর মেয়েদের ক্রিকেট ধীরে ধীরে পেশাদার হয়। খেলোয়াড়দের জন্য কেন্দ্রীয় চুক্তি চালু করা হয়। চুক্তির ফলে খেলোয়াড়দের একটি নিশ্চিত বার্ষিক আয় হওয়া শুরু হয়, এর ফলে অনেকে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া শুরু করেন। এবং তাঁদের দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এগিয়ে আসতে থাকে।
- পরিকাঠামোগত উন্নতি: প্রশিক্ষণ শিবির, জিম, আন্তর্জাতিক মানের মাঠ এবং সর্বোপরি, উন্নতমানের ভ্রমণ ও থাকার ব্যবস্থা হয় মহিলা ক্রিকেটারদের জন্য।
- জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: মিডিয়া কভারেজ বা প্রচার বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। টিভিতে খেলা দেখানো শুরু হয়, যা দর্শকদের কাছে দলটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
যদিও এই পরিবর্তন রাতারাতি আসেনি, তবে ২০০০ সালের প্রথম দিক থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রাটি মহিলা ক্রিকেটের বর্তমান সাফল্যের ভিত্তি স্থাপন করে। (Indian Women Cricket History)
বিশ্বমঞ্চে উত্থান: স্বপ্নের বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতের পথ
দীর্ঘদিনের সেই কঠিন পথচলার ফসল এখন ঘরে তোলার পালা। বর্তমান দলের খেলোয়াড়রা সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। তাঁরা এখন ক্রিকেট কিট ভাগাভাগি করেন না, বরং স্পন্সরদের দেওয়া উন্নতমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করেন। এখন প্রত্যেকেই কোটি টাকা আয় করেন। জাতীয় দলের পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেট, WPL, বিদেশে ফ্র্য়াঞ্চাইজ়ি ক্রিকেট খেলে এক একজন কোটি টাকা আয় করেন।
বর্তমানে মহিলা ক্রিকেটের উত্থানের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হচ্ছে ২০১৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ। মিতালি রাজের নেতৃত্বে দল ফাইনালে পৌঁছেছিল, এবং সেই পারফরম্যান্স দেশে মহিলা ক্রিকেটের প্রতি মানুষের ধারণা বদলে দেয়। এরপর থেকে নারী ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, বরং দেশের একটি গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।

শান্থা রঙ্গস্বামী অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা খুবই খুশি যে আজকের খেলোয়াড়রা সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। তাদের প্রাপ্য এটি। ৫০ বছর আগে আমরা যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলাম, তারই ফল এখন দেখতে পাচ্ছি।’ (Indian Women Cricket History)
আইসিসি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া কেবল একটি ম্যাচের লড়াই নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণের এক প্রতীক। নূতন গাভাস্কর এবং শান্থা রঙ্গস্বামীর মতো মহিলারা যে ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন, সেই ত্যাগের মূল্য হিসেবে এই সাফল্যকে দেখা যেতে পারে। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের এই যাত্রা কেবল ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতি নয়, এটি সমাজের সেই পরিবর্তনকেও প্রতিফলিত করে, যেখানে মহিলারা এখন সর্বোচ্চস্তরে নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম। এই যাত্রা ভবিষ্যতে আরও অনেক মেয়েকে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নিতে উৎসাহিত করবে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.



















