সাধারণত যেই ক্লাবগুলো ছোট হয়, তাদের খুব একটা বেশি উত্থান দেখা যায় না। প্লেয়ারদের কেরিয়ারের শুরুর ক্লাব হিসেবেই থেকে যায়। তবে কিছু ক্লাব আছে ব্যতিক্রমী। যারা ছোট ক্লাব হিসেবে শুরু করেও পরে দারুণভাবে কামব্যাক করে ও সাফল্য পায়। লেখা হয় ইতিহাস। সেই রকমই একটি ক্লাব সুইডেনের Mjallby AIF। নামের দিক থেকে সেরকম জনপ্রিয় না হলেও সম্প্রতি এই ক্লাব একটি রেকর্ড তৈরি করেছে। সদ্য তারা জিতেছে সুইডেনের শীর্ষ লিগ আলসভেনসকানে। তবে লিগ জেতার থেকেও বেশি আকর্ষণীয় এই ক্লাবের উত্থান।
Table of Contents
মিয়ালবি এআইএফ-এর কাহিনি শুরু হয় ১৯৩৯ সালে, সুইডেনের ব্লেকিং প্রদেশের লিস্টারলান্ডেট নামে এক ছোট্ট, প্রায় বিচ্ছিন্ন উপদ্বীপে। আসলে ১৯৩৯ সালে এই ক্লাবটি তৈরি করা হয়েছিল শুধু ফুটবল খেলার জন্য নয়। এই ক্লাব তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দের এক করা। কারণ সেই দ্বীপে যারা থাকতেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন জেলে, অর্থাৎ, মাছই ছিল তাঁদের পেশা। জনসংখ্যা মেরেকেট ১০০০। সারাদিন সমুদ্রে থেকে মাছ ধরে সেটাকে বিক্রি করার পাশাপাশি জীবনে আলাদা কিছু ছিল না। তাই গ্রামের জেলে সম্প্রদায় এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ঠিক করেন এরকম কিছু একটা করার। তারই ফসল Mjallby AIF। ক্লাবের পুরো নাম, Mjällby Allmänna Idrottsförening, যার অর্থ ‘মিয়ালবি সাধারণ ক্রীড়া সমিতি’।
ছোট্ট জনপদ থেকে উঠে আসা মিয়ালবির যাত্রাটা কখনই মসৃণ ছিল না। তাদের হোম গ্রাউন্ড স্ট্রান্ডভালেন (Strandvallen) দেখলেই বোঝা যাবে। এই স্টেডিয়ামটা সুইডেনের বড় দলগুলোর কাছে অন্যতম কঠিন।
Mjallby AIF ক্লাবের প্রতিষ্ঠা ও প্রথম দিকের পথচলা
১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে, মিয়ালবি আঞ্চলিক লিগগুলোতে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। তাদের শুরুটা ছিল একেবারে মৌলিক স্তরে। স্থানীয় যুবকদের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং সংগঠন ছিল তাদের প্রাথমিক চালিকাশক্তি।
ক্লাবের প্রথম বড় সাফল্য আসে ১৯৮০ সালে। ক্লাবটি প্রথমবারের মতো সুইডেনের সর্বোচ্চ ফুটবল লিগ আলসভেনসকানে খেলার সুযোগ পায়। এই মুহূর্তটি ছিল লিস্টারলান্ডেটের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়।
তবে, সেই সুযোগটাকে খুব একটা বেশি কাজে লাগাতে পারেনি তারা। প্রথম বছর সর্বোচ্চস্তরে খেলার পরের বছরে দ্বিতীয় স্তরের লিগ সুপাররেটানে নেমে যায়। ধারাবাহিকভাবে এটা চলতে থাকে। পরপর দুই মরশুম তারা একই স্তরে খেলতে পারেনি। এই ধারাবাহিক উত্থান-পতনই ক্লাবটিকে সুইডিশ ফুটবলের ইয়ো-ইয়ো ক্লাব বলা হতে থাকে।
সংষ্কৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির মিশ্রণ, বিশ্বকাপের জন্য নতুন বল আনল ফিফা, জেনে নিন বিস্তারিত
উত্থান-পতনের রোলারকোস্টার: ব্যর্থতা ও টিকে থাকার লড়াই
এই ক্লাবটির অন্যতম কঠিন পর্ব হচ্ছে বারবার ধাক্কা খাওয়া ও ফিরে আসা। এই প্রত্যাবর্তনের সংগ্রাম করতে হয়েছে তাদের। যতবার তারা নিচের স্তরের লিগে নেমে গিয়েছে, প্রতিবারই কারণ হচ্ছে আর্থিক। ফর্ম সংক্রান্ত সমস্য়া কমই ছিল। অনেক সময়ে দেখা গিয়েছে, যেই প্লেয়ার একটা মরশুমে ভালো খেলেছে, তাঁকে পরের মরশুমে রাখা যায়নি, কারণ অর্থ নেই।
আসলে সুইডেনের বড় শহরগুলোর ক্লাবের তুলনায় মিয়ালবির আয়ের রাস্তা কম ছিল। কারণ এই ক্লাবটা যেখান থেকে আসত সেখানকার মানুষের ট্যাঁকের জোর ছিল কম। ফলে স্পনসর সহ সদস্য সমর্থক সবার থেকেই কম আয় করত ক্লাব। এর ফলে প্লেয়ার তৈরি করা বা ধরে রাখতে পারছে না। এর ফলে অভিজ্ঞতা, নতুন প্রতিভা তুলে আনার কাজ তারা করতে পারেনি। সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল ২০০১ সালে, যখন আর্থিক সংকটের কারণে ক্লাবের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। তবে স্থানীয়রা সেই সময় চাঁদা তুলে, ঋণ করে ক্লাব বাঁচায়।
তবে এই বাধাগুলোকে তারা সমস্যা হিসেবে দেখেনি। বরং এই বাধাগুলো ছিল তাদের কাছে জেদ।
কামব্যাক ও বর্তমান সাফল্য
২০০৯ সালে দীর্ঘ বিরতির পর Mjallby AIF আলসভেনসকানেতে ফিরে আসে, তখন মনে হয়েছিল এটি হয়তো সেই পুরোনো ইয়ো-ইয়ো প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি। কিন্তু ২০১০ সালে ক্লাবে বড় পরিবর্তন আসার ফলে তাদের আর সমস্যা হয়নি। তারা শুধু প্রমোশন পাওয়াই নয়, বরং শীর্ষ লিগে টিকে থাকা এবং নিজেদের একটি মাঝারি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নেয়।
Mjallby AIF-এর বর্তমান সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো তাদের খেলোয়াড় তৈরি করার দর্শন। তারা এখন কেবল স্থানীয় খেলোয়াড়দের উপর ভরসা রাখে না, বরং দক্ষিণ সুইডেনের অপেক্ষাকৃত ছোট অঞ্চলের প্রতিভাবান তরুণদেরও সুযোগ দেয়, যারা হয়তো বড় ক্লাবগুলোর নজর এগিয়ে যান। তাদের লক্ষ্য একটাই, বিনামূল্যে সেরা জিনিসটা দলে নেওয়া।
ক্লাবের প্রধান ব্যক্তিত্ব: খেলোয়াড় ও কোচের ভূমিকা
একটা দলকে সাফল্য পেতে গেলে সবাইকে সমানভাবে পরিশ্রম করতে হবে। তার আদর্শ উদাহরণ মিয়ালবি। দলের কোচ ও খেলোয়াড় প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মিয়ালবি থেকে এমন কিছু প্লেয়ার উঠে এসেছেন, যারা ছোট জায়গা থেকে উঠে এসে সুইডেনের বড় মঞ্চে জায়গা করেছেন।
Mjallby AIF-এর কোচিংয়ের দর্শন আবার আলাদা। ছোট ক্লাব হলেও পেশাদারিত্বে ত্রুটি নেই। কঠোর, সুসংগঠিত ও দলগত প্রচেষ্টার উপর ভর করে এই কোচিং চলে। এখানে প্রত্যেক প্লেয়ারকে সবসময় হাইপ্রেসিং ম্যাচের জন্য় তৈরি করা হয়। এতে প্লেয়াররা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে তৈরি থাকেন। ডিরেক্ট ফুটবল, উইং প্লে-তে জোর দেওয়া হয় বেশি। এতে প্লেয়াররা ম্যাচের গতি নিজেদের হাতে রাখতে পারেন।
যেমন স্থানীয় এক স্কুলের প্রিন্সিপাল আন্দ্রেস ট্রসটেনসন দলের কোচ। তিনি ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পরপর দুটো মরশুমে দলকে জোড়া সাফল্য দেন। ক্লাব প্রোমোশন পায় এবং সুইডেনের ফুটবল লিগের শীর্ষে নিয়ে যায় ক্লাব। ২০২৪ সালে ক্লাব পঞ্চম স্থানে শেষ করে, এর পর ২০২৫ সালে চ্যাম্পিয়ন।
44 বছর বয়সে বিশ্বরেকর্ড, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ব্রাজ়িলের এই গোলকিপারের
Mjallby AIF-এর ভবিষ্যৎ: সুইডিশ ফুটবলে তাদের স্থান
মিয়ালবি এআইএফ-এর ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ছোট ক্লাব হওয়া সত্ত্বেও তারা সুইডিশ ফুটবলের উচ্চ স্তরে নিজেদের অপরিহার্য করে তুলেছে। তাদের ব্যর্থতাগুলো কখনই তাদের শেষ হয়ে ওঠেনি, বরং প্রতিবারই তারা নতুন করে শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে।
মিয়ালবি এআইএফ-এর ভবিষ্যতের পথও নিশ্চয়ই চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। শীর্ষস্তরে বড় ক্লাবগুলোর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার সবসময় কঠিন। তবে তাদের যুব একাডেমি এবং স্থানীয় জনগণের অটুট সমর্থন— যতদিন থাকবে, ততদিন মিয়ালবি টিকে থাকবে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

