রাজস্থান! নামটা শুনলেই সামনে ভেসে ওঠে সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা, মরুভূমি, উট আর কিছুটা জুড়ে ক্রিকেট, সৌজন্যে IPL-এ রাজস্থান রয়্যালস। এই রাজাদের রাজ্যের ইতিহাসের পাতায় না থেকেও নতুন করে যারা ইতিহাস লিখছে তারা রাজস্থান ইউনাইটেড (Rajasthan United FC I-League Journey)। রাজস্থানের প্রথম পেশাদার ফুটবল দল। বর্তমানে আইলিগে খেলা এই দলের শুরুটা কিন্তু পরিকল্পনা করে হয়নি। স্টপগ্যাপ দল হিসেবে শুরু হয়েছিল, আর তারাই এখন অন্য উচ্চতায়। এই প্রতিবেদনে জেনে নিন ভারতীয় ফুটবলে নবীন দল রাজস্থান ইউনাইটেড এফসির ইতিহাস ও তৈরির কাহিনী (Rajasthan United FC History)।
Table of Contents
গোড়াপত্তন: কলেজ দলের জন্ম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী শুরু
বর্তমানে রাজস্থান ইউনাইটেড এফসিকে যেভাবে আমরা দেখছি এটা শুরুতে এরকম ছিল না। এই ক্লাবের জন্ম হয় ২০১৮ সালে। জয়পুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (JECRC) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র এবং ফুটবলপ্রেমী কমল সিং সরোহা খেয়াল করেন, তাঁর কলেজ এবং রাজ্যে একটি পেশাদার ফুটবল দল নেই। এরপর তিনি নিজে উদ্যোগ নেন দল তৈরি করার। তাই তাঁর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পড়ুয়াদের মধ্যে যারা ফুটবল ভক্ত তাঁদের নিয়ে তিনি কলেজের একটি ফুটবল দল তৈরি করেন ও সেটির নাম দেন JECRC CF। (Rajasthan United FC History)
ঐতিহাসিকভাবে ক্রিকেটের জন্য পরিচিত রাজস্থানে এটি ছিল প্রায় অলক্ষিত একটি ছোট্ট পদক্ষেপ। কিন্তু এই ছোট্ট দলটি বড় এক লাফ দেয় তাদের যাত্রায়। ২০১৯ সালে, অল রাজস্থান এফসির প্রতিনিধি কমল সিং সরোহার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে। রাজস্থানের রাজ্য লিগ ‘R-League’-এ একটি দল কম পড়ায় JECRC CF-কে খেলার জন্য প্রস্তাব দেন তাঁরা। কিছু না ভেবে সরোহা রাজি হয়ে যান।
সরোহা এবং তাঁর দল সাহসের সঙ্গে ২০১৯ সালের প্রথম R-League A ডিভিশনে খেলে। সীমিত সম্পদ এবং প্রবল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, তারা দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে চ্যাম্পিয়ন হয়। এই জয়ের পর তারা মানসিক দিক থেকে জোর পায় এবং পরিচিতি আরও বাড়তে থাকে।
খরচ 20 হাজার টাকারও কম, সস্তায় ঘুরে আসুন রাজস্থান
অপেশাদার থেকে পেশাদার ক্লাবে উত্তরণ
R-League-এর A ডিভিশনে জেতার পর সারোহার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা শেষ হয়। তিনি ডিগ্রি অর্জন করার পর গুরগাঁওয়ের একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি নেন। কিন্তু ফুটবলের নেশা কখনই তাঁকে ছাড়েনি। (Rajasthan United FC History)
সারোহা এই নেশার জন্য মাত্র ছয় মাস পরই চাকরি ছেড়ে জয়পুরে ফিরে আসেন। তিনি সঙ্গে পান তাঁর সহকর্মী প্রতিষ্ঠাতা রজত মিশ্র এবং স্বপ্নিল ঢাকাকে। তিনজনে মিলে JECRC CF-কে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২০ সালে JECRC CF-এর নাম বদলে হয় রাজস্থান ইউনাইটেড এফসি (Rajasthan United FC)। এটি নিছক নাম পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল একটি অপেশাদার কলেজ দলের পেশাদার হওয়া। তাদের লক্ষ্য ছিল আইলিগে খেলা।
Rajasthan United FC I-League Journey
ভারতীয় ফুটবলের প্রথম সারিতে ঢুকতে গেলে আইলিগে খেলতেই হবে। সেটা করার জন্য সামনে ছিল আইলিগের যোগ্যতাঅর্জন পর্বের লড়াই। সেটা করতে সাহায্য করেছেন কোচ বিক্রান্ত শর্মা। তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল, অল্প সময়ের মধ্যে দল গঠন করা এবং খেলোয়াড়দের তৈরি করা। পেশাদার খেলোয়াড় পেতে গেলে খরচ করতে হয়। পাশাপাশি কোনও প্রতিষ্ঠিত প্লেয়ার নতুন একটা ক্লাবে আসতে সহজে রাজি হন না।
বিক্রান্ত শর্মা যতজন প্লেয়ারকে পেয়েছেন তাদের নিয়ে নেমে যান। তাঁর বার্তা ছিল ‘যদি তোমরা নিজেদের জন্য একটা ভবিষ্যৎ গড়তে চাও, তবে তার জন্য লড়তে হবে এবং ছিনিয়ে নিতে হবে।’ এই লড়াকু মানসিকতাই প্লেয়ারদের চাগিয়ে তোলে এবং দলকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যায়। (Rajasthan United FC History)
কোয়ালিফায়ারে জয়
২০২১ সালের আইলিগ কোয়ালিফায়ার ছিল রাজস্থান ইউনাইটেডের প্রথম বার R-League খেলার মতো। কারণ তাদের সামনে আর্থিক ও পেশাগত দিক থেকে শক্তিশালী দল। এখানে রাজস্থান ইউনাইটেডের শক্তি ছিল প্লেয়ারদের শক্তিশালী মানসিকতা। তার উপর ভর করে তারা কোয়ালিফায়ার জেতে। এর পর তারা আইলিগের যোগ্যতা অর্জন করে।
আইলিগ এবং তার পরবর্তী পথ: বড় লিগের চ্যালেঞ্জ
আইলিগে খেলা রাজস্থান ইউনাইটেড এফসি-র জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। কারণ আইলিগ বরাবরই কঠিন। ২০২১-২২ সালের তাদের অভিষেক মরশুমে প্রথম ম্যাচটি ছিল বেশ কঠিন, সেই ম্যাচে তারা মাত্র নয়জন খেলোয়াড় নিয়ে মাঠে নেমেছিল। সেই ম্যাচে তাদের মানসিকতা ছিল প্রশংসনীয়। (Rajasthan United FC I-League Journey)
প্রথম মরশুমে কিছুটা উত্থান-পতন থাকলেও, তারা আইলিগ ষষ্ঠস্থানে শেষ করে। ২০২২-২৩ মরশুমে তারা আরও বড় চমক দেয়। ডুরান্ড কাপে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছয় এবং তারা ISL-এর দল ATK মোহনবাগানকে (বর্তমানে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট) পরাস্ত করে। এটি ছিল তাদের যোগ্যতার এক বড় প্রমাণ।
তবে শুধু লড়াই করেই হয় না। দরকার অর্থ, আর সেখানে কমল সিং সারোহা ব্রিগেড পিছিয়ে পড়ে। ক্লাবের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালে ক্লাবটি ভার্টাক গ্রুপ (Vertak Group)-কে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই নতুন গ্রুপ এসে ক্লাবকে আরও উন্নত করে। অ্যাকাডেমি তৈরি করেছে রাজস্থানের ভিওয়ান্ডিতে এবং ক্লাবে বিদেশি প্লেয়ার এসেছে। সব মিলিয়ে পুরোপুরি পেশাদার মোড়কে মোড়া হয়েছে রাজস্থান ইউনাইটেডকে।
রাজস্থান ইউনাইটেড এফসি-র যাত্রা এক অনুপ্রেরণা। একটি সাধারণ কলেজ দল থেকে শুরু করে আইলিগে লড়াই করা। এই দল শুধু ভারতের ফুটবল মানচিত্রে রাজস্থানকে যুক্ত করেনি, বরং রাজ্য থেকে আসা ভবিষ্যতের ফুটবলারদের জন্য একটি স্পষ্ট পথ তৈরি করেছে। এই ক্লাবের সাফল্যের গল্প এক আশার আলো, যা দেখায় যে যথেষ্ট মনোবল, আকাঙ্ক্ষা এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতেও প্রত্যাশিত করে তোলা যায়।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

