কাশ্মীর বললেই আমাদের সামনে দু’রকমের ছবি ভেসে ওঠে। একদিকে সেনা কনভয়, অন্যদিকে কাশ্মীরের ছবির মতো পরিবেশ। ভূস্বর্গ কাশ্মীর বরাবরই অশান্ত। যুব সমাজের কাছে কাজ না থাকা, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দাপট বরাবরই কাশ্মীরে অশান্ত করেছে। কিন্তু এই অশান্ত পরিস্থিতি থেকে কাশ্মীরে বাঁচিয়েছে ফুটবল। সৌজন্যে Real Kashmir FC. ২০১৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া এই ক্লাবটি আজ ভারতীয় ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কীভাবে শুরু হলো এই ক্লাবের যাত্রা? জেনে নিন Real Kashmir FC History.
Table of Contents
বন্যার জলে ভেসে যাওয়া স্বপ্ন থেকে শুরু
গল্পের শুরুটা ২০১৪ সাল। ভয়াবহ বন্যায় ধুয়ে গেয়েছিল কাশ্মীর উপত্যকা। তরুণ প্রজন্মের চোখে তখন হতাশা, হাতে কাজ নেই। অন্যদিকে কাশ্মীরের তরুণদের এই অসহায়তার সুযোগ নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাদের নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে চাইছে। ঠিক সেই সময় ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন দু’জন—শামিম মেরাজ এবং সন্দীপ চাট্টু। এদের মধ্যে শামিম কাশ্মীরের স্থানীয় সংবাদপত্রে সাংবাদিক ছিলেন এবং সন্দীপ চাট্টু ছিলেন কাশ্মীরের স্থানীয় ব্যবসায়ী। (Real Kashmir FC History)
তবে প্রথমে সন্দীপ ছিলেন না এই পরিকল্পনায়। সাংবাদিকতা করার সুবাদে শামিম দেখেছিলেন তরুণ প্রজন্মকে কী ভাবে ভুল পথে চালনা করছে একদল মানুষ। কিন্তু পেশাদার বাধ্যবাধকতায় তিনি পারছিলেন না। তাই ঠিক করলেন, যুবসমাজকে হতাশা থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র ফুটবল। নিজে চাকরি ছেড়ে সেই টাকা থেকে কিনলেন ১০০০টি ফুটবল। এবং তরুণদের মধ্যে বিলি করে দিলেন। সেই ফুটবল নিয়ে যুবকরা অনুশীলন শুরু করে। সেই ছোট উদ্যোগই ছিল Real Kashmir FC-র চলার প্রথম ধাপ।
কলেজের দল থেকে আইলিগ, জেনে নিন Rajasthan United FC I-League Journey
তবে ক্লাব তৈরি তো হলো, ফান্ড? এরজন্য দরকার একজন ইনভেস্টর। কাশ্মীরের সেই সময় যা পরিস্থিতি ছিল সেটা দেখে ফুটবলে বিনিয়োগের জন্য কেউই আগ্রহী হলেন না। শামিম একাধিক ব্যবসায়ীর কাছে গেলেও সাড়া পাননি। সেই সময় তাঁর পরিচয় হয় সন্দীপ চাট্টুর সঙ্গে। বলা ভালো, শামিমের মতো সন্দীপ চাট্টুও কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। এই দু’জন এক হয়ে শুরু করে দিলেন ক্লাব। শামিমের পরিশ্রম আর সন্দীপের বিনিয়োগ।
পথচলা শুরু Real Kashmir FC-র
২০১৬ সালে ক্লাব শুরুর পর সেটাকে জম্মু ও কাশ্মীর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। কিন্তু আইলিগ খেলতে গেলে দরকার ছিল AIFF-এর লাইসেন্স। সেটা পেলেও প্রথম পেশাদার ম্যাচ জন্য অপেক্ষা করতে হতো এক বছর। নতুন ক্লাব, হারিয়ে যেতে বসা ইয়ুথকে পথে আনার পর তাদের এক বছরের জন্য বসিয়ে রাখাটা ঝুঁকির হতো। তাই ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় ডুরান্ড কাপে অংশগ্রহণ করার। ২০১৬ সালে ডুরান্ড কাপে অংশগ্রহণ করে রিয়াল কাশ্মীর এফসি।

সাফল্যের সিঁড়ি: শূন্য থেকে শিখরে
রিয়াল কাশ্মীরের যাত্রা মোটেও ফুলের বিছানা ছিল না।
- ২০১৬: ডুরান্ড কাপে প্রথমবার অংশগ্রহণ করেই তারা শোচনীয়ভাবে হেরে যায়। সবাই ভেবেছিল এই ক্লাবের ভবিষ্যৎ নেই।
- ২০১৭-১৮: কিন্তু হার মানেনি তারা। পরের বছরই আইলিগ দ্বিতীয় ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা ইতিহাস গড়ে। প্রথম কাশ্মীরি ক্লাব হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করে আইলিগে খেলার।
- জায়ান্ট কিলার: আইলিগে এসে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের মতো বড় বড় দলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় তারা। বরফে ঢাকা মাঠে তাদের হারানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় বিপক্ষ দলের কাছে। ২০১৮-১৯ মরশুমে তারা লিগ টেবিলে ৩য় স্থান অধিকার করে সবাইকে চমকে দেয়।
আর এই সাফল্য এসেছে বিদেশি কোচের জন্যই। রিয়াল কাশ্মীর প্রথমে এক স্থানীয় কোচকে নিয়োগ করেছিল। কিন্তু তাঁর দক্ষতা জাতীয় স্তরে লড়ার মতো ছিল না। ২০১৬ সালে ব্যর্থতা, প্লেয়ারদের মধ্যে সমস্যার কারণে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে তারা নিয়োগ করে স্কটল্যান্ডের কোচ ডেভিড রবার্টসনকে। তাঁর হাত ধরেই ঘুরে দাঁড়াতে থাকে ক্লাব।
স্কটিশ কোচের আগমন: ডেভিড রবার্টসন
প্রথমে রবার্টসন যখন শ্রীনগরে পা রাখলেন, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর ইন্টারনেটহীন পরিবেশ দেখে তিনি বেশ ভয় পেয়েছিলেন। কারফিউ আর লোডশেডিংয়ের মধ্যে কোচিং করানো ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন স্থানীয় ছেলেদের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা, তিনি কাশ্মীরে থেকে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এমনকি নিজের ছেলে মেসন রবার্টসনকেও নিয়ে এলেন টিমে খেলার জন্য।

এক নজরে রিয়াল কাশ্মীর
| বিষয় | তথ্য |
| ডাকনাম | স্নো লেপার্ডস (Snow Leopards) |
| প্রতিষ্ঠাকাল | ২০১৬ সাল |
| প্রতিষ্ঠাতা | শামিম মেরাজ ও সন্দীপ চাট্টু |
| হোম গ্রাউন্ড | টিআরসি টার্ফ গ্রাউন্ড, শ্রীনগর |
| বড় সাফল্য | আইলিগ দ্বিতীয় ডিভিশন চ্যাম্পিয়ন (২০১৭-১৮), আইএফএ শিল্ড জয় (২০২০, ২০২১) |
| জনপ্রিয় স্লোগান | #SheeniSeh (কাশ্মীরি ভাষায় তুষার চিতা) |
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বিবিসির তথ্যচিত্র
রিয়াল কাশ্মীরের এই রূপকথার গল্প শুধু ভারতেই আটকে থাকেনি। বিবিসি স্কটল্যান্ড এদের নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করে, যার নাম “Real Kashmir FC” (এবং পরে “Return to Real Kashmir FC”)। এই তথ্যচিত্রটি ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি স্কটল্যান্ড অ্যাওয়ার্ড (BAFTA Scotland) জিতে নেয় এবং সারা বিশ্ব জানতে পারে কাশ্মীরের এই লড়াকু ক্লাবের কথা। সম্প্রতি সোনি লিভ (SonyLIV)-এ এই দলকে নিয়ে একটি ওয়েব সিরিজ়ও তৈরি হয়েছে।

মালিকানা বদল ও নতুন দিশা
শামিম ও সন্দীপ যেই যাত্রাটা শুরু করেছিলেন সেই যাত্রায় বদল এসেছে। ২০১৮ সালে সন্দীপ চাট্টুর মৃত্যুর পর ক্লাবের ফান্ডিংয়ে সমস্যা হয়। সেই সময় এগিয়ে আসেন ব্যবসায়ী আরশাদ শল। তিনি ২০১৯-২০ মরশুমে ক্লাব পরিচালনায় প্রবেশ করেন। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাবের মালিকানা নেন। এখন তিনি ক্লাবের কর্ণধার ও বিনিয়োগকারী। তাঁর পেশাদারিত্বে Real Kashmir FC-তে পেশাদারিত্ব আসে এবং দলের শক্তিও বাড়ে।
কাশ্মীরে পাথর ছোড়া বা গুলির আওয়াজ হয়তো এখনও থামেনি, কিন্তু রিয়াল কাশ্মীর এফসি প্রমাণ করে দিয়েছে যে খেলার মাঠেই আসল বিপ্লব সম্ভব। সন্দীপ চাট্টু এবং শামিম মেরাজের এই উদ্যোগ আজ হাজার হাজার কাশ্মীরি যুবকের বাঁচার স্বপ্ন। ফুটবল যে শুধু একটি খেলা নয়, এটি যে সম্প্রীতি আর ঘুরে দাঁড়ানোর হাতিয়ার—রিয়াল কাশ্মীর তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.



















