বর্তমানে যারা মোবাইল বা ল্যাপটপে কাজ করেন তাঁরা প্রত্যেকেই কম বেশি AI ব্যবহার করে থাকেন। এখন অনেক স্মার্টফোনে তো ইনবিল্ট AI থাকে। মেইল লেখা হোক বা ছবি এডিটিং, AI নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনি যত বেশি AI ব্যবহার করবেন তত বেশি প্রকৃতির ক্ষতি করছেন (AI water Consumption)?
Table of Contents
মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে আনা হয়েছে AI-কে। অনেকটা আমার আপনার সহকারি হিসেবে কাজ করছে এই AI। কিন্তু আমরা যখন AI-এর সঙ্গে চ্যাট করি কিংবা ChatGPT দিয়ে কোনও মেইল লিখিয়ে নিই, তখন মনে হয় পুরো প্রক্রিয়াটি বুঝি অদৃশ্য কোথাও হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে, আপনার পাঠানো প্রতিটি ছোট AI কোয়ারি বা একটি ১০০ শব্দের ইমেইল প্রসেস করতে খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রায় হাফ লিটার জল। (AI water Consumption)
সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক পেংফেই লি এবং শাওলেই রেন-এর ‘মেকিং AI লেস থার্স্টি’ (Making AI Less Thirsty) শীর্ষক একটি গবেষণাপত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
AI water Consumption: AI টেকনোলজির এত জলের প্রয়োজন কেন?
আপনার মনে হতেই পারে অতীতে তো Google Search করলেই রেজাল্ট চলে আসত, তখন তো AI ছিল না, তা হলে তখন তো জল নিয়ে এত কথা হয়নি। তা হলে AI ব্যবহার করতে জল লাগছে কেন? আসলে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করা বা সাধারণ ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চেয়ে AI-এর কাজ অনেক বেশি জটিল। AI-এর জন্য ব্যবহৃত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) একেকটি ছোটখাটো রেডিয়েটরের মতো উত্তাপ তৈরি করে। (AI water Consumption)
- সার্ভার ঠান্ডা রাখার লড়াই: ডাটা সেন্টারগুলোর এই তীব্র তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পাইপের মাধ্যমে জল দেওয়া হয়।
- বাষ্পীভবন ও অপচয়: এই পদ্ধতিতে উত্তপ্ত জল বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে যায়। দেখা গিয়েছে, ডাটা সেন্টারের কুলিং সিস্টেমে যে জল ঢোকানো হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায়।
- বিশাল ব্যবহার: বর্তমানে একটি বড় AI ডাটা সেন্টার ক্যাম্পাস দিনে ১০,০০০ মানুষের সমান জল ব্যবহার করে।
আরও পড়ুন: ফোন হারিয়ে যাওয়ার আগে সাবধান, এই 2 কাজ না করতে বিপদ
গুগল, মাইক্রোসফট ও মেটা-র জলের হিসাব
প্রযুক্তি জায়ান্টদের নিজেদের পরিবেশগত রিপোর্ট থেকেই স্পষ্ট যে, AI-এর কারণে তাদের জলের ব্যবহার রকেট গতিতে বাড়ছে।
- গুগল (Google): ২০২৪ সালে গুগল রেকর্ড ৮.১ বিলিয়ন গ্যালন জল ব্যবহার করেছে, যা ২০২৩ সালের চেয়ে ৮% বেশি। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গুগলের জল ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৬ সালে সেটা কতগুণ লাগবে তা আপনি আন্দাজ করতে পারেন।
- মাইক্রোসফট (Microsoft): ২০২২ সালে তাদের জল ব্যবহার এক ধাক্কায় ৩৪% বেড়ে ১.৭ বিলিয়ন গ্যালনে পৌঁছয়। OpenAI-এর GPT-4 মডেলটি ট্রেইন করার সময় আইওয়ার একটি ডাটা সেন্টার থেকেই মাসে কোটি কোটি গ্যালন জল শুষে নেওয়া হয়েছিল।
- মেটা (Meta): ২০২৩ সালে প্রায় ৮১৩ মিলিয়ন গ্যালন জল খরচ করেছে, যার ৯৫% গিয়েছে ডাটা সেন্টারে। (AI water Consumption)
আমেরিকার লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ডাটা সেন্টারগুলোর সরাসরি জল ব্যবহারের পরিমাণ দ্বিগুণ বা চারগুণ হয়ে যেতে পারে।
যেখানে জল নেই, সেখানেই থাবা বসাচ্ছে ডাটা সেন্টার?
গবেষকদের মতে, ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী AI-এর জন্য বছরে ৪.২ থেকে ৬.৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটার জল প্রয়োজন হবে। সহজ ভাষায়, এটি পুরো আমেরিকার বার্ষিক জল ব্যবহারের প্রায় অর্ধেক!
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল পরিমাণ জলের একটি বড় অংশ আসছে এমন সব এলাকা থেকে, যেগুলো ইতিমধ্যেই তীব্র জলসংকটে ভুগছে। মাইক্রোসফট নিজেই স্বীকার করেছে, তাদের ব্যবহৃত জলের ৪২% আসে জলসংকট প্রবণ এলাকা থেকে। এর ফলে স্থানীয় স্তরে ক্ষোভ দানা বাঁধছে:
- চিলি ও উরুগুয়ে: তীব্র খরা পরিস্থিতির কারণে চিলিতে গুগলের ২০০ মিলিয়ন ডলারের ডাটা সেন্টার প্রজেক্ট স্থগিত করতে হয়েছে। উরুগুয়েতেও গুগলের প্রজেক্ট নিয়ে বিতর্ক চলছে, কারণ সেখানে প্রতিদিনের জল ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৫৫,০০০ মানুষের দৈনিক চাহিদার সমান।
- মেক্সিকো ও আমেরিকা: মেক্সিকোর কোয়েরেতারো-তে শতাব্দীর ভয়াবহতম খরার মধ্যেও মাইক্রোসফট ভূগর্ভস্থ জল তোলার অধিকার পেয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে একটি ১৪ বিলিয়ন ডলারের ডাটা সেন্টার প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। (AI water Consumption)
আরও পড়ুন: পুরনো ল্যাপটপ কচ্ছপের মতো স্লো? মাত্র 10 মিনিটের এই সেটিংসে হবে Superfast
আসল তথ্য কি আড়াল করছে টেক কোম্পানিগুলো?
বিশেষজ্ঞদের দাবি, কোম্পানিগুলো রিপোর্টে যা দেখাচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। কর্পোরেট রিপোর্টগুলোতে মূলত ৩টি বড় ফাঁক বা ‘গ্যাপ’ থেকে যাচ্ছে:
উত্তোলন বনাম অপচয়: তারা কতটা জল তুলছে আর কতটা বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে, তার সঠিক হিসাব একসঙ্গে দেয় না।
পরোক্ষ জল ব্যবহার: ডাটা সেন্টার চালাতে যে বিপুল বিদ্যুৎ লাগে, সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে জল খরচ হয় (যা সরাসরি খরচের চেয়ে ১২ গুণ বেশি), তা প্রায় কোনও কোম্পানিই রিপোর্টে দেখায় না।
স্থানীয় তথ্য গোপন: বৈশ্বিক বা গড় হিসাব দিলেও, খরা-কবলিত কোনও নির্দিষ্ট এলাকার ডাটা সেন্টার স্থানীয় মানুষের জলের স্তরে কতটা ক্ষতি করছে, তা প্রকাশ করা হয় না। (AI water Consumption)
জল বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
২০৩০ সালের মধ্যে AI অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে। কিন্তু জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যেই বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষ তীব্র জলসংকটের মুখোমুখি হবে।
প্রশ্ন হলো, AI কি এই জলসংকট আরও বাড়াবে, নাকি নিজের উন্নত প্রযুক্তির (যেমন সঠিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা দক্ষ সেচ ব্যবস্থা) মাধ্যমে জল ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করবে? উত্তরটি এখনই নিশ্চিত নয়, তবে বর্তমান ধারা বজায় থাকলে মানবজাতির জন্য এক বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
একটি এআই কোয়েরি বা ইমেইল তৈরিতে কেন এত জল খরচ হয়?
এআই (AI) মডেলগুলো যেসব প্রসেসর বা চিপের (যেমন Nvidia GPU) ওপর কাজ করে, সেগুলো প্রসেসিংয়ের সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। ডাটা সেন্টারের এই তীব্র উত্তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সার্ভারগুলোকে ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ জল ব্যবহার করা হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।
পরোক্ষ জল ব্যবহার (Indirect Water Consumption) কী?
ডাটা সেন্টারগুলো দিনরাত সচল রাখতে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে যে জল খরচ হয়, তাকেই পরোক্ষ জল ব্যবহার বলে। গবেষকদের মতে, এআই ডাটা সেন্টারে সরাসরি কুলিংয়ের তুলনায় এই পরোক্ষ জল খরচের পরিমাণ প্রায় ১২ গুণ বেশি।
টেক কোম্পানিগুলো কি তাদের জল ব্যবহারের সঠিক তথ্য প্রকাশ করে?
না, বেশিরভাগ বড় টেক কোম্পানি তাদের রিপোর্টে জল ব্যবহারের আসল চিত্র পুরোপুরি প্রকাশ করে না। তারা মূলত বিশ্বব্যাপী গড় বা বার্ষিক হিসাব দেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো খরা-কবলিত এলাকায় তাদের ডাটা সেন্টার স্থানীয় ভূগর্ভস্থ জল কতটা শুষে নিচ্ছে বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে কত জল যাচ্ছে, সেই পরোক্ষ হিসাবগুলো এড়িয়ে যায়।
এআই-এর কারণে কোন কোন দেশ বা এলাকা সবচেয়ে বেশি জলসংকটে পড়েছে?
চিলি, উরুগুয়ে, মেক্সিকো (কোয়েরেতারো) এবং আমেরিকার অ্যারিজোনা বা আইওয়ার মতো খরা-প্রবণ ও জলসংকট এলাকায় ডাটা সেন্টার তৈরি করায় স্থানীয় স্তরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চিলি এবং অ্যারিজোনাতে ইতিমধ্যে তীব্র গণপ্রতিরোধের মুখে গুগলের মতো প্রজেক্ট স্থগিত বা বাতিল করতে হয়েছে।
২০২৭ সালের মধ্যে এআই-এর জল ব্যবহারের পূর্বাভাস কী?
‘Making AI Less Thirsty’ গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এআই-এর বার্ষিক জল ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৪.২ থেকে ৬.৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। এই পরিমাণ জল গোটা যুক্তরাজ্যের (UK) মোট বার্ষিক জল ব্যবহারের প্রায় অর্ধেকের সমান।

