গড়িয়াহাট মানে সবার আগে আসে ফুটপাথে শপিং। শপিংপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য এই গড়িয়াহাট। কম খরচে বাজার করতে সবাই ছোটেন এই গড়িয়াহাটে। কোনও ভেবে দেখেছেন গড়িয়াহাট নাম কী করে এল? আর কী করে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠল এটি? এই প্রতিবেদনে জেনে নিন বিস্তারিত (History of Gariahat Market)।
গড়িয়াহাট নামের ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই গড়িয়া ‘গ্রাম’, কৃষক, নদী, হাট এবং প্রাচীন পথঘাটের দিকে।
Table of Contents
‘গড়িয়াহাট’ নামের ভাষাগত ও ঐতিহাসিক উৎপত্তি (History of Gariahat Market)
‘গড়িয়াহাট’ নামটি মূলত দুটি শব্দের সমন্বয়ে তৈরি—
গড়িয়া এবং হাট (অর্থাৎ বাজার)
বর্তমানে গড়িয়া এমন একটা জায়গা যেটা কলকাতার অন্যতম বড়। এই গড়িয়া এলাকাটা দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও কলকাতা দুই জেলা জুড়ে বিস্তৃত। পাশাপাশি গড়িয়া এলাকায় কমপক্ষে তিনটে পিনকোড রয়েছে। এটা অন্য কোনও জায়গায় ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
এই গড়িয়া এলাকাটা নতুন না। প্রাচীনকালে বর্তমান গড়িয়াহাট অঞ্চলে কোনও স্থায়ী শহর বা বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল না। এটি ছিল মূলত গড়িয়া এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের তৈরি করা একটি খোলা হাট বা সাপ্তাহিক বাজার। গড়িয়া থেকে কৃষিজ পণ্য, মাছ, দুধ, চাল-ডাল, শাকসবজি ইত্যাদি নিয়ে মানুষ এখানে এসে বেচাকেনা করত। তাই এই স্থান পরিচিত হয়ে ওঠে ‘গড়িয়ার হাট’ নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারণ সহজ করতে গিয়ে ‘গড়িয়ার হাট’ বদলে দাঁড়ায় গড়িয়াহাট। (History of Gariahat Market)
গুগল ম্যাপ দেখলে গড়িয়া রেল স্টেশন থেকে গড়িয়াহাট ক্রসিংয়ের দূরত্ব ৮ থেকে সাড়ে ৮ কিলোমিটার। ইতিহাস মানলে অতীতে এই রাস্তাটা মানুষ হেঁটে বা গরুর গাড়িতে যেতেন বাজার করতে। অর্থাৎ, বর্তমানে বাঘাযতীন, যাদবপুর, ঢাকুরিয়া এলাকার উপরে থাকা পুকুর, জঙ্গল টপকে মানুষ যেতেন বাজার করতে বা বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি করতে।
Prince Anwar Shah Road-এর আনোয়ার শাহ কে? কেন তাঁর নামে রাস্তা? জেনে নিন ইতিহাস
গড়িয়া এলাকার প্রাচীন ইতিহাস: গড়িয়াহাটের মূল শিকড়
বর্তমান গড়িয়া একসময় ছিল গ্রাম। যেখানকার মানুষের প্রধান পেশা ছিল চাষ। এই গড়িয়া নামের উৎস নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। ইতিহাসবিদদের মতে, ‘গড়িয়া’ শব্দের উৎপত্তি সম্ভবত ‘গড়’ থেকে—অর্থাৎ দুর্গ বা প্রতিরক্ষা স্থাপনা। মধ্যযুগে বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট গড় বা সেনা ঘাঁটি ছিল। সেই গড়কে ঘিরে যে জনবসতি তৈরি হত, তাকেই বলা হত ‘গড়িয়া’। গড়িয়া রেল স্টেশনের বোর্ডে একটা সময়ে ‘গড়ে’ লেখা থাকত। (History of Gariahat Market)

আবার অন্য একটা অংশের দাবি অন্য। তাদের দাবি, গড়িয়ার ডানা বিছানো রয়েছে বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি জুড়ে। গড়িয়া নামটির সঙ্গে জুড়ে আছে শ্রীগৌরাঙ্গের স্মৃতি। ১৫১০ সালে শ্রীচৈতন্যদেব শান্তিপুর থেকে রওনা দিয়েছিলেন নীলাচলের পথে। তাঁর যাত্রাপথ ছিল আদিগঙ্গার তীর ধরে। শোনা যায়, গড়িয়া ও পদ্মশ্রীর মাঝামাঝি কোনও এক বিশাল পুকুরের পাড়ে তাঁবু পড়েছিল শ্রীচৈতন্যের। সেখানে গ্রামের ভিতর দিয়ে রথতলায় এসে নদীতে স্নান সেরেছিলেন তিনি। সেখানে নদীতীরেই নাকি ছিল এক মহাশ্মশান। আজ অবশ্য তার অস্তিত্ব মেলে না। আর সেই থেকে বৈষ্ণবঘাটা নামটাও আসে।
ফিরে আসা যাক আলোচনায়, গড়িয়া অঞ্চল দিয়ে একসময় প্রবাহিত হত বহু খাল ও জলপথ। কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং নদীকেন্দ্রিক জীবনই ছিল এখানকার মানুষের মূল জীবিকা। এই গ্রামীণ সমাজে বাণিজ্য ছিল নির্ভরশীল হাটের ওপর। সেই হাট বসতই আজকের গড়িয়াহাট অঞ্চলে। (History of Gariahat Market)
অর্থাৎ, গড়িয়াহাট আসলে গড়িয়ার অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের ফল।
কীভাবে গড়িয়া থেকে গড়িয়াহাটে আসত মানুষ?
প্রাচীনকালে গড়িয়া থেকে বর্তমান গড়িয়াহাট অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল—
- কাঁচা মাটির রাস্তা
- নৌকা ও জলপথ
- গরুর ও ঘোড়ার গাড়ি
সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে গড়িয়ার কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে হাজির হতেন এই হাটে। এখান থেকে সেই পণ্য ছড়িয়ে পড়ত তৎকালীন কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে। গড়িয়াহাট ছিল মূলত গ্রাম ও শহরের সংযোগস্থল।
এই কারণেই গড়িয়াহাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি ছিল গ্রামবাংলা ও শহুরে কলকাতার মধ্যে যোগসূত্র।
ধর্মতলা নামে ‘ধর্ম’ এল কোথা থেকে? জেনে নিন ইতিহাস
ঔপনিবেশিক যুগে গড়িয়াহাটের পরিবর্তন
ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে যখন কলকাতা দ্রুত শহরে রূপান্তরিত হতে শুরু করে, তখন দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলও বদলাতে থাকে। (History of Gariahat Market)
বিশেষ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে রাস্তা নির্মাণ শুরু হয়, ট্রামলাইন গড়ে ওঠে, ইউরোপীয়দের বসবাস বাড়তে থাকে, বাজার স্থায়ী রূপ পেতে শুরু করে।

গড়িয়ার গ্রামীণ হাট ধীরে ধীরে রূপ নিতে থাকে একটি স্থায়ী শহুরে বাজারে। কাঠের দোকানের জায়গায় ইটের দোকান গড়ে ওঠে, বাড়ি তৈরি হয়, আশপাশে স্কুল, কলেজ, মিশন, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই সময় থেকেই ‘গড়িয়ার হাট’ আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত হতে থাকে ‘গড়িয়াহাট’ নামে।
দেশভাগের পর গড়িয়াহাট ও গড়িয়ার সম্পর্ক আরও মজবুত
দেশভাগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল এই দক্ষিণ কলকাতা অঞ্চলে। সেখানে গড়িয়াহাট ব্যতিক্রম ছিল না। এই এলাকা দেখেছে দেশভাগ। সেই সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর একটি বড় অংশ আশ্রয় নেন দক্ষিণ কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে—বিশেষ করে গড়িয়া, যাদবপুর, টালিগঞ্জ ও বাঘাযতীন এলাকায়। জঙ্গল কেটে জনবসতি তো তৈরি হলো। কিন্তু বাজার? তখনই গুরুত্ব বাড়তে থাকল গড়িয়াহাটের।
গড়িয়াহাটের বাজার দ্রুত বিস্তার লাভ করে, স্থায়ী দোকানের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে থাকে, গড়িয়াহাট হয়ে ওঠে দক্ষিণ কলকাতার প্রধান কেনাকাটার কেন্দ্র। (History of Gariahat Market)
গড়িয়া–গড়িয়াহাট: শুধু নাম নয়, এক অটুট সামাজিক যোগ
আজও এই দুই অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। গড়িয়ার বহু পরিবার রুজি-রোজগারের জন্য নির্ভরশীল গড়িয়াহাট বাজারের উপর। আবার গড়িয়াহাটের ব্যবসায়ীদের বড় অংশই গড়িয়া ও আশপাশের এলাকা থেকে উঠে আসা মানুষ।
এই বাস্তব সম্পর্কই প্রমাণ করে, গড়িয়াহাট নামের ভিতরে লুকিয়ে থাকা ‘গড়িয়া’ শব্দটি কেবল ইতিহাস নয়, আজও বাস্তবতা।
এ কারণেই গড়িয়াহাটকে বলা হয়—‘আধুনিক কলকাতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো গ্রামবাংলা’। সেই গ্রামবাংলা এখন কলকাতার অন্যতম দামি এলাকা। গড়িয়াহাটের আশপাশে থাকা বালিগঞ্জ প্লেস, বালিগঞ্জ ফাঁড়ি, ভবানীপুর, গোলপার্ক অন্যতম দামি এলাকা। আর গড়িয়াহাটে এখন ঝাঁ চকচকে শপিংমল, ক্যাফে, বার রয়েছে। আর সঙ্গে রয়েছে ফুটপাথের দোকান এবং স্মৃতি। (History of Gariahat Market)
গড়িয়াহাট নামটি আজ শুধু একটি বাজারের নাম নয়—এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, গ্রাম ও শহরের মিলনের প্রতীক। গড়িয়ার মাটিতে জন্ম নেওয়া এক সাধারণ হাট আজ পরিণত হয়েছে কলকাতার হৃদস্পন্দনে। সময় বদলেছে, চেহারা বদলেছে, কিন্তু গড়িয়া আর গড়িয়াহাটের আত্মিক সম্পর্ক বদলায়নি।
এই সম্পর্কই গড়িয়াহাটকে অন্য সব বাজার থেকে আলাদা করে তোলে—এটি শুধু বাজার নয়, এটি ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















