কলকাতা তথা বিশ্বের যেকোনও প্রান্তে গিয়ে মিষ্টির কথা বলতে সবার আগে আসবে রসগোল্লার নাম। আদতে রসগোল্লা হলেও অবাঙালিরা এটাকে রসগুল্লা বলেন। নাম থেকেই বোঝা যায় এর অর্থ কী। রসের গোল্লা। তবে রসগোল্লা কী সেটা নিয়ে নতুন করে বলার দরকার নেই। রসগোল্লা যিনি চেনেন না, তিনি অন্তত বাঙালি হতে পারেন না। তবে কীভাবে জন্ম হয় রসগোল্লার (history of rosogolla)? এত মিষ্টির মাঝে কীভাবে এখনও মানুষের প্রিয় হয়ে রইল? জেনে নিন এই প্রতিবেদনে-
Table of Contents
রসগোল্লার পটভূমি: ছানার বিপ্লব ও ইউরোপীয় প্রভাব (history of rosogolla)
রসগোল্লা বাঙালির হাতে তৈরি হলেও, এর প্রধান উপাদান হলো ছানা। এটির উৎপত্তি কিন্তু বাংলার আদি রন্ধনশৈলীতে ছিল না। দুধ কেটে ছানা তৈরির এই পদ্ধতি আসে পর্তুগিজ়দের হাত ধরে। পর্তুগিজ়রা ভারতে বসবাস শুরু করলে তাদের থেকে বাঙালিরা শেখে ছানা বানানো।
পর্তুগিজ়দের আগে বাঙালি রান্নাঘরে দুধ নষ্ট হলে বা কেটে গেলে সেটাকে ফেলে দেওয়া হলো। যখন ছানা তৈরি হলো এবং তার গুণ মানুষ বুঝতে শিখল সেই সময় সেটাকে মিষ্টি বানাতে কাজে লাগানো হলো। আগে বাংলায় মূলত ক্ষীর, রাবড়ি, সন্দেশ বা পনিরের মতো দুধের তৈরি মিষ্টি প্রচলিত ছিল, যেখানে দুধকে সরাসরি ফোটানো হতো বা ঘন করা হতো। সেখানে জায়গা করতে থাকে ছানা। বাঙালি ময়রারা উপলব্ধি করেন এই নরম, দানাদার পদার্থটি মিষ্টি তৈরির জন্য এক অসাধারণ কাঁচামাল। (history of rosogolla)
তবে ছানার জন্ম হলেও সেটা থেকে স্পঞ্জের মিষ্টি তৈরির ধারণা তখনও আসেনি। সেই সময়কার ছানার মিষ্টিগুলি হতো শুকনো, ফলে খেতে খুব একটা জমত না। সকলেই চেষ্টা করছিলেন এমন মিষ্টি তৈরি করতে যাতে রস থাকবে এবং আকৃতি একই থাকবে। সেটাই করেন নবীন চন্দ্র দাস।
আরও পড়ুন: 103 বছরের নস্টালজিয়া, কলকাতায় মুঘলাই মানে এখনও অনাদি কেবিন
নবীন চন্দ্র দাস: রসগোল্লার স্রষ্টা
রসগোল্লার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো নবীন চন্দ্র দাস। তিনি প্রথম তৈরি করেন রসগোল্লা। পেশায় কলকাতার বাগবাজারের একজন সাধারণ ময়রা ছিলেন। বাকিদের মতো তাঁরও স্বপ্ন ছিল এমন এক মিষ্টি তৈরি করার যা মুখে দিলেই গলে যাবে ও আকারে অটুট থাকবে।

রসগোল্লা উদ্ভাবনের সংগ্রাম
১৮৪৫ সালে নবীন চন্দ্র দাস মিষ্টি তৈরি শুরু করেন। কিন্তু সেই সময়ে যেই মিষ্টিগুলো বাজারে চলছিল তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। মিষ্টি শুকনো হোক তা ছিল তাঁর অপছন্দ। তাঁর লক্ষ্য ছিল ছানার সঙ্গে ময়দা বা সুজি মিশিয়ে এমন মিষ্টি তৈরি করা যা ফুটন্ত চিনির রসে সেদ্ধ করার পরেও ভেঙে যাবে না এবং মিষ্টির রস শুষে নেবে। নিজের স্বপ্নকে পূরণ করতে নবীন চন্দ্র দাস লেগে পড়েন। কিন্তু এতে সমস্য়া ক্রমে বাড়তে থাকে। বারবার ছানা সেদ্ধ করতে গেলে সেটা হয়তো ভেঙে যেত, নয়তো অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যেত। (history of rosogolla)
চেষ্টা করতে করতে অবশেষে ১৮৬৮ সালে তিনি পেলেন সাফল্য। ছানার সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণে সুজি বা ময়দা মিশিয়ে তা দিয়ে ছোট ছোট বল তৈরি করে সেটাকে ফুটন্ত চিনির রসে নিখুঁত তাপমাত্রায় সেদ্ধ করা হয়। ছানার বলগুলো যখন ফুটন্ত রসে দেওয়া হয়, তখন সেটির ভিতরে থাকা আর্দ্রতা উবে গিয়ে বলের ভিতরে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি করে। আর সেগুলো চিনির রস শুষে নেয়, যার ফলে মিষ্টিটা হয়ে ওঠে নরম, রসালো।
রসগোল্লার জন্ম ও কে. সি. দাসের অবদান
কথিত আছে নবীন চন্দ্র দাস রসগোল্লা তৈরির পর তিনি সবার প্রথম এটি খাওয়ান এক ব্যক্তিকে। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর থেকে একজন জল চান। নবীন চন্দ্র দাস তাঁকে জলের সঙ্গে একটি রসগোল্লা দেন। সেই পথিক তাঁর মিষ্টির সুখ্যাতি করেন।

এরপর নবীন চন্দ্র দাস তাঁর বাগবাজারের দোকানে এই নতুন মিষ্টিটি বিক্রি শুরু করেন, দ্রুত সেটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর পর নবীন চন্দ্র দাস মিষ্টির নাম দেন রসগোল্লা বা রসের গোল্লা।
নবীন চন্দ্র দাসের পুত্র কৃষ্ণ চন্দ্র দাস বা কে. সি. দাস এই ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যান। নবীন চন্দ্র দাস ছিলেন ময়রা। তিনি নিজের দোকানে মিষ্টি বিক্রি করতেন। তবে তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন না। অন্যদিকে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস ছিলেন ব্যবসায়িক মানসিকতার। তিনি মিষ্টি তৈরির গুণ বাবার থেকে পেয়ে সেটাকে ব্যবসার রূপ দেন।
কে.সি. দাসই প্রথম রসগোল্লাকে টিনের কৌটোয় করে সংরক্ষণ এবং বিক্রি করার পদ্ধতি শুরু করেন। এই প্যাকেজিংয়ের ফলে রসগোল্লাকে দীর্ঘদিন ভালো থাকে। এর ফলে রসগোল্লাকে কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাঠানো যায়। রসগোল্লার পাশাপাশি রসমালাইয়ের মতো আরেকটি জনপ্রিয় মিষ্টির উদ্ভাবনও তাঁর। সেই কে. সি. দাস তাঁর নামে মিষ্টির দোকান খোলেন। যা এখন কে. সি. দাস নামেই পরিচিত।
রসগোল্লা কার? বাংলা না ওডিশার?
নবীন চন্দ্র দাসের হাত ধরে রসগোল্লা শুরু হলেও এর জন্মস্থান নিয়ে বাংলা এবং ওডিশার মধ্যে তীব্র বিতর্ক ছিল, যা শেষে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ওডিশার দাবি, রসগোল্লা আসলে ক্ষীর মোহন নামে তাদের প্রাচীন মিষ্টির পরিবর্তিত রূপ, এই মিষ্টি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেবতাকে নিবেদন করা হয়ে আসছে। ওডিশাবাসীর মতে, রসগোল্লার উৎপত্তি পুরীর কাছে পাহালা নামক স্থানে, যেখানে বহু বছর ধরে ছানা ও সুজি দিয়ে এই মিষ্টি তৈরি হতো। তবে ওডিশার ঐতিহ্যবাহী রসগোল্লা বাংলার রসগোল্লার চেয়ে আলাদা। এটা কম স্পঞ্জি এবং চিবোতে হয়। এটি মুখে দিলে গলে যায় না। (history of rosogolla)

আরও পড়ুন: ধর্মতলা নামে ‘ধর্ম’ এল কোথা থেকে? জেনে নিন ইতিহাস
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর, GI রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গকে বাংলার রসগোল্লার জন্য জিআই (Geographical Indication) ট্যাগ প্রদান করে। এই ট্যাগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘স্পঞ্জি রসগোল্লা’-এর উৎপত্তি পশ্চিমবঙ্গেই (Rasgulla origin)।
রসগোল্লাকে বলা হয় মিষ্টির রাজা। বিয়ে, শ্রাদ্ধ, জন্মদিন বা বাড়িতে অথিতি এলে যেই মিষ্টিটা কমন থাকে সেটা হলো এই রসগোল্লা। এটা সাধারণ মিষ্টি নয়, এটা বাঙালির পরিচিতি, আবেগ। নবীন চন্দ্র দাসের হাত ধরে যে মিষ্টির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের রসনাকে মুগ্ধ করে চলেছে এবং বাংলার সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে কাজ করছে। (history of rosogolla)
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
Who Invented Rasgulla?
নবীন চন্দ্র দাস
কত সালে রসগোল্লার জন্ম?
১৮৬৮ সালে
নবীন চন্দ্র দাসের পুত্রের নাম কী?
কে. সি. দাস
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















