শুক্রবার অর্থাৎ, ১৬ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টের ৪৪ তম বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন সুজয় পাল। সকালে রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। এই অনুষ্ঠানে সুজয় পালের শপথগ্রহণের থেকেও বেশি আলোচনায় তাঁর ব্যবহৃত Wig বা পরচুলা। যেটাকে বলা হয় Court Wig বা Colonial Style Court Wig. কেন এটি ব্যবহার করলেন তিনি? এর তাৎপর্য কী? রইল এই প্রতিবেদনে।
Table of Contents
Colonial Style Court Wig: কোর্ট উইগ কী?
কোর্ট উইগ হলো ঘোড়ার লেজের চুল (Horsehair) দিয়ে তৈরি এক ধরণের বিশেষ পরচুলা, যা সাধারণত সাদা বা ঘিয়ে রঙের হয়। এটি মূলত দুই প্রকারের হয়:
১. বেঞ্চ উইগ (Bench Wig): যা প্রতিদিনের শুনানির সময় বিচারপতিরা পরেন (এটি ছোট হয়)।
২. ফুল-বটম উইগ (Full-bottom Wig): এটি বড় এবং কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি মূলত বিশেষ অনুষ্ঠান, যেমন শপথগ্রহণ বা আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের সময় পরা হয়। সাধারণ টুপির মতো এটাকে মাথার উপরে পরতে হয়।
ভারতে প্রথম, সাক্ষী স্বাধীনতা আন্দোলনের, জেনে নিন কলকাতা হাইকোর্টের ইতিহাস
কোর্ট উইগের উৎপত্তি ও ইতিহাস
আদালতে পরচুলা পরার ইতিহাস ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর উৎপত্তি বিচার বিভাগ থেকে নয়, বরং তৎকালীন ফ্যাশন থেকে। (Colonial Style Court Wig)
- ফরাসি প্রভাব: ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অকালে চুল পড়ে যায় ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের। সেই সময়ে তিনি টাক ঢাকার জন্য পরচুল বা Wig পরা শুরু করেন। রাজাকে অনুসরণ করে এটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষরা পরতে শুরু করেন। শীঘ্রই এটি ইউরোপের অভিজাত মহলে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
- ব্রিটিশ আদালতে অন্তর্ভুক্তি: ১৬৮৫ সালের দিকে ব্রিটিশ আইনি পেশায় এটি বাধ্যতামূলক করা হয়। তৎকালীন সময়ে এটি কেবল ফ্যাশন ছিল না, বরং একজন বিচারকের সামাজিক মর্যাদা এবং গুরুত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম ছিল।
- ঔপনিবেশিক বিস্তার: ব্রিটিশরা যখন ভারত শাসন শুরু করে, তখন তারা তাদের আইনি কাঠামো ও পোশাক বিধিও এখানে নিয়ে আসে। এভাবেই কলকাতা, বম্বে এবং মাদ্রাজ হাইকোর্টে উইগের প্রচলন শুরু হয়।
কেন এটি এখনও ব্যবহার করা হয়?
- অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কেন এই ‘ব্রিটিশ বোঝা’ বয়ে বেড়ানো হচ্ছে? যেখানে ব্রিটিশদের নিয়ম বদলে ফেরা হচ্ছে সেখানে এই ছবি প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রথা। (Colonial Style Court Wig)
- ব্যক্তিগত পরিচয় বিসর্জন: উইগ পরার প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিচারপতির ব্যক্তিগত সত্ত্বাকে আড়াল করা। যখন একজন বিচারপতি উইগ এবং কালো গাউন পরেন, তখন তিনি কোনও ব্যক্তি নন, বরং ‘আইনের প্রতীক’ হয়ে ওঠেন। এটি বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- গাম্ভীর্য ও গরিমা: আদালতের পরিবেশে এক ধরণের কঠোর শৃঙ্খলা এবং গাম্ভীর্য বজায় রাখতে এই পোশাক সাহায্য করে। এটি সাধারণ মানুষের মনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে।
- ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: আইনের জগৎ ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। অনেক বিচারপতির মতে, এটি কেবল ব্রিটিশ প্রথা নয়, বরং আইনি ব্যবস্থার বিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী। (Colonial Style Court Wig)
ভারতের কোন কোন আদালতে এটি দেখা যায়?
বর্তমানে ভারতের অধিকাংশ আদালতে এই প্রথা বিলুপ্ত। বিশেষ করে ২০০৬ সালের পর বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (BCI) আইনজীবীদের জন্য উইগ পরা ঐচ্ছিক এবং প্রায় নিষিদ্ধ করে দেয়। (Colonial Style Court Wig)
| আদালতের নাম | বর্তমান স্থিতি |
| সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া | সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। বিচারপতিরা উইগ পরেন না। |
| কলকাতা হাইকোর্ট | ভারতের একমাত্র আদালত যেখানে আজও কিছু আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে (শপথগ্রহণ) এর ব্যবহার দেখা যায়। |
| বম্বে ও মাদ্রাজ হাইকোর্ট | বর্তমানে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। স্বাধীনতার পর পর এগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। |
| জেলা ও দায়রা আদালত | কখনোই এর ব্যাপক ব্যবহার ছিল না, বর্তমানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। |
কেন এই প্রথা বর্জন করা উচিত?
ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এস.এ. বোবদে থেকে শুরু করে বর্তমানের ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের মতো অনেকেই ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় ব্রিটিশ ছোঁয়া এড়ানোর পক্ষে। তাঁরা বিচার ব্যবস্থায় ‘ভারতীয়করণ’ করার পক্ষে। তাঁদের মতে:
- জলবায়ু সমস্যা: ভারতের মতো ক্রান্তীয় বা গরম দেশে পশমের পরচুলা এবং ভারী গাউন পরা অবৈজ্ঞানিক ও কষ্টকর।
- ঔপনিবেশিক দাসত্ব: এটি ব্রিটিশ রাজত্বের শোষণের স্মৃতি বহন করে, যা স্বাধীন সার্বভৌম ভারতের সঙ্গে বেমানান। যেখানে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে এ দেশে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা হয়েছে, সেখানে ব্রিটিশদের ঐতিহ্য বহন করা অযৌক্তিক। (Colonial Style Court Wig)
ধর্মতলা নামে ‘ধর্ম’ এল কোথা থেকে? জেনে নিন ইতিহাস
কেন বিচারপতি সুজয় পালের এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ?
বিচারপতি সুজয় পালের এই সিদ্ধান্তকে আইনি বিশেষজ্ঞরা দুইভাবে দেখছেন। একদিকে এটি কলকাতা হাইকোর্টের প্রাচীন ঐতিহ্য ও আভিজাত্যকে তুলে ধরেছে। কলকাতা হাইকোর্ট সবসময়ই তার প্রথাগত রীতিনীতি বজায় রাখার জন্য পরিচিত। অন্যদিকে, এটি আইনি মহলে একটি বার্তা দিয়েছে যে—পোশাক যাই হোক না কেন, আইনের লক্ষ্য হলো নিরপেক্ষ বিচার। (Colonial Style Court Wig)
বিচারপতি সুজয় পালের এই সাদা উইগ পরিহিত ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভারতের আইনব্যবস্থা এক বিশাল বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন ডিজিটাল কোর্ট এবং পেপারলেস বিচারব্যবস্থা, অন্যদিকে অনলাইন স্ট্রিমিং। সেখানেই কলকাতা হাইকোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানে আজও টিকে আছে শতবর্ষের ঐতিহ্য। এই ‘পুরনো’ এবং ‘নতুন’-এর মেলবন্ধনেই ভারতীয় বিচারব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
FAQ
কোর্ট উইগ কি সব বিচারপতিকে পরতে হয়?
না, এটি বাধ্যতামূলক নয়। ভারতে এটি কেবল একটি আলঙ্কারিক বা ঐতিহ্যবাহী প্রথা।
এই পরচুলা কী দিয়ে তৈরি হয়?
আসল কোর্ট উইগ ঘোড়ার লেজের চুল দিয়ে তৈরি হয়। এটি অত্যন্ত টেকসই এবং অনেক বছর ভালো থাকে।
আধুনিক আইনজীবীরা কেন এটি পরেন না?
বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার সংশোধিত পোশাক বিধি অনুযায়ী আইনজীবীদের সাদা শার্ট, কালো কোট এবং ব্যান্ডের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গরমের দেশের কথা ভেবে উইগ বর্জন করা হয়েছে।

