সাউথ সিটি মল, নবীন সিনেমা, যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী কলেজ — এই জায়গাগুলোর যেই রাস্তার উপর সেটার নাম হলো Prince Anwar Shah Road। দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় এবং ব্যস্ত রাস্তাগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। সারাক্ষণ এখানে মানুষের ভিড় লেগে থাকে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন যা নামে এই রাস্তা অর্থাৎ, সেই Prince Anwar Shah কে ছিলেন? আদতে কলকাতার বাসিন্দা না হলেও কলকাতার ইতিহাসে কীভাবে তিনি ঢুকে গেলেন? এর নেপথ্যে রয়েছে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সময়ের এক বিস্মৃত রাজপুত্র এবং ব্রিটিশ-বাংলা সম্পর্কের এক অধ্যায়। জেনে নিন এই প্রতিবেদনে-
Table of Contents
প্রিন্স আনোয়ার শাহ কে ছিলেন? (Who Was Prince Anwar Shah?)
ভারতের ইতিহাসে মুঘল সাম্রাজ্য একটা বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্য ইতিহাসে থাকলেও প্রিন্স আনোয়ার শাহ খুব একটা বেশি জায়গাজুড়ে নেই। তিনি ছিলেন মুঘল রাজবংশের শেষ দিকের এক সদস্য। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের মতো তাঁকে বা তাঁর জীবন নিয়ে খুব একটা বেশি নথি নেই বাংলায়। ইতিহাসবিদদের মতে তিনি ছিলেন টিপু সুলতানের এক পুত্র।
১৭৯৯ সালে অ্যাঙ্গলো-মহীশূর যুদ্ধে টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেয় ব্রিটিশ সরকার। তাদের মধ্যে টিপু সুলতানের দুই পুত্র প্রিন্স ঘুলাম মহম্মদ শাহ ও প্রিন্স আনোয়ার শাহকে কলকাতা পাঠানো হয়। কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং ক্ষমতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল মুঘলদের আলাদা জায়গায় রাখা, যাতে তারা শক্তি না পায় এবং নজরদারিতে রাখা যায়।
শহরে এসে ঘুলাম মহম্মদ শাহ ও আনোয়ার শাহ দক্ষিণ কলকাতায় থাকা শুরু করেন পরিবার নিয়ে। যেখানে থাকা শুরু করেন তার আশপাশের জায়গার নাম ছিল রুশা পাগলা, যা বর্তমানে টলিগঞ্জ নাম হয়েছে। কিন্তু নবাবের ব্যাটা হয়ে ৩০০ জনের পরিবারকে নিয়ে দুই প্রিন্সের খুব সমস্যা হচ্ছিল। রাজকীয় জীবন থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষ, সংষ্কৃতির সঙ্গে মানাতে পারছিলেন না তাঁরা।
মুঘল পরিবার ও কলকাতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার: এই রাজপুত্রদের হাত ধরেই কলকাতায় মুঘল খাবার, পোশাক এবং ফার্সি বা উর্দু ভাষার সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। যেহেতু ৩০০ জনের একটা বিশাল পরিবার ছিল তাই নিজেদের জন্য আলাদা কিছু করার ক্ষমতা ছিল দুই রাজপুত্রের কাছে। ধীরে ধীরে সেটা অনেকে গ্রহণ করতে থাকেন।
প্রিন্স আনোয়ার শাহের জীবন ছিল এই সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক মিশ্রণ। তিনি মুঘল বংশের হলেও তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করত ব্রিটিশ সরকার।
এর পর পরিবারের সদস্যরা ঠিক করে একটি মসজিদ তৈরির। বেছে নেওয়া হয় এসপ্ল্যানেড এলাকাকে। শহরের মধ্যে হওয়ায় বাছা হয় এই জায়গাকে। তৎকালীন গর্ভনর লর্ড অকল্যান্ডের থেকে অনুমতি নিয়ে প্রিন্স ঘুলাম মহম্মদ শাহ তৈরি করেন মসজিদ। এসপ্ল্যানেড এলাকায় ১৮৪২ সালে তৈরি করা সেই মসজিদের নাম দেন টিপু সুলতান মসজিদ। এটি তৈরির পর স্থানীয় মুসলিমদের পাশে পাওয়ার পর তাঁরা ধীরে ধীরে টলিগঞ্জ এলাকায় বাড়ি ও মসজিদ বানাতে থাকেন।

মুঘলরা কলকাতায় কী কী নির্মাণ করেছিল?
তালিকায় রয়েছে
শাহনি বেগম মসজিদ (একবালপুর)– CMRI হাসপাতালের পাশে তাকালেই দেখা যাবে একটা গেট। সেটাই মসজিদের। শাহনি বেগম ছিলেন টিপু সুলতানের পুত্র প্রিন্স শাহারারুদ্দিনের কন্যা।
জ়োহরা বেগম মসজিদ (মহাবীরতলা)– তারাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো ধরে যাওয়া যাবে মহাবীরতলায়। জ়োহরা বেগম ছিলেন টিপু সুলতানের দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৯৪১ সালে এই মসজ়িদ তৈরি করা হয়।
টলিগঞ্জ ক্লাব– শহর কলকাতার অন্যতম অভিজাত ক্লাব এটি। ইতিহাসবিদদের মতে, এই এলাকায় প্রথমে টিপু সুলতানের দুই সন্তান তাঁদের পরিবারকে নিয়ে থাকা শুরু করেন। সেকানে প্রিন্স ঘুলাম মহম্মদ শাহ একটি বিল্ডিং তৈরি করেন। ১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার সেটাকে অধিগ্রহণ করে খেলার জন্য তৈরি করে।

টিপু সুলতান মসজিদ (প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড)– শহরের দ্বিতীয় টিপু সুলতান মসজিদ। ১৮৪৩ সালে তৈরি করা হয়েছিল এটি। প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের ক্রসিংয়েকরয়েছে এটি।
অর্থাৎ, উপরে দেওয়া এই মসজিদগুলো তৈরি করেছিলেন টিপু সুলতানের দুই সন্তান ঘুলাম মহম্মদ শাহ ও আনোয়ার শাহ।
প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের নামকরণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রিন্স আনোয়ার শাহের নামে রাস্তার নামকরণ হওয়ার নেপথ্যে তাঁর ব্যক্তিগত অবদান বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। নামকরণ করা হয়েছিল তাঁকে ও তাঁর বংশকে স্বীকৃতি দিতে। আসলে ব্রিটিশরা যেভাবে টিপু সুলতানের বংশধরদের নজরে রেখেছিল, সেটা থেকে নজর ঘোরাতেই ছিল এই রাস্তার নামকরণ।
সেই প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড এখন দক্ষিণ কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল টলিগঞ্জ এবং যাদবপুরকে যুক্ত করেছে এই রাস্তা। প্রথমে এই এলাকাটি ছিল প্রধানত জলাভূমি এবং কৃষিজমি। ধীরে ধীরে কলকাতা শহর যখন উত্তর-মধ্য হয়ে দক্ষিণের দিকে পা বাড়াতে থাকল, সেই সময়ে এই জায়গাগুলো ভরাট করে বসতবাড়ি হতে থাকে ও রাস্তার গুরুত্ব বাড়ে।
কেন প্রিন্স আনোয়ার শাহের নামে রাস্তা দেওয়ার জন্য এটিকেও বেছে নেওয়া হলো?
আসলে মুঘলের বংশ থাকত টলিগঞ্জে। যেহেতু রাস্তাটি টলিগঞ্জের সঙ্গেও যুক্ত তাই এটিকে বেছে নেওয়া হয়। কারণ এই বংশের প্রভাব ও জনপ্রিয়তা সেই এলাকায় বেশি ছিল।
১৯৩০-এর দশকের কাছাকাছি সময়ে প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের নামকরণ করা হয়।
প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে কী করে যাবেন?
যাদবপুর থানার সামনে থেকে যেই রাস্তাটা সাউথ সিটি মলের দিকে যাচ্ছে সেটাই প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড। আপনি গুগল ম্যাপে সাউথ সিটি মল, নবীনা সিনেমা হল বা যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী কলেজ সার্চ করলে যেই লোকেশনগুলো পাবেন, সেগুলো প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের পাশে অবস্থিত।
Prince Anwar Shah Road PIN Code কত?
তিনটে পিনকোড রয়েছে। 700045, 700068, 700033
কেন ইতিহাসে প্রিন্স আনোয়ার শাহকে নিয়ে তথ্য নেই?
মুঘলদের নিয়ে বা মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে যেই পরিমাণ চর্চায় হয় আনোয়ার শাহ-কে নিয়ে সেই পরিমাণ চর্চায় হয় না। এএর প্রধান কারণগুলি হলো:
ঐতিহাসিক নথির অভাব: প্রিন্স আনোয়ার শাহ ছিলেন সাম্রাজ্য পতনের পরের একজন অপ্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর কোনও সামরিক বিজয় বা বিশাল প্রশাসনিক সাফল্য ছিল না, ফলে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করার মতো কিছু করেননি তিনি।
রাস্তার প্রাধান্য: সময়ের সাথে সাথে, রাস্তার নামটি তাঁর পরিচয় ছাপিয়ে গেছে। এখন মানুষ এই নামটি ব্যবহার করে শুধু গন্তব্যের নির্দেশ দিতে, রাজপুত্রের ইতিহাস জানতে নয়।
তবুও, যখন আমরা দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ত ট্র্যাফিকের মধ্যে দিয়ে যাই, তখন এই নামটির মাধ্যমে আমরা যেন মুঘল ঐতিহ্যের একটি ক্ষীণ স্পন্দন শুনতে পাই। প্রিন্স আনোয়ার শাহ হয়তো সরাসরি কিছু রেখে যাননি, কিন্তু তাঁর নাম কলকাতার মানচিত্রে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছেন।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
Prince Anwar Shah Road PIN Code কত?
তিনটে পিনকোড রয়েছে। 700045, 700068, 700033
প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে কী করে যাবেন?
যাদবপুর থানার সামনে থেকে যেই রাস্তাটা সাউথ সিটি মলের দিকে যাচ্ছে সেটাই প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড।
প্রিন্স আনোয়ার শাহ কে ছিলেন?
টিপু সুলতানের সন্তান। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর আনোয়ার শাহকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















