এক বছরের অপেক্ষা শেষ, শুরু হয়েছে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো। এই পুজোয় ভারত থেকে শুরু করে নরওয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই পুজোর জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে দুর্গাপুজোর। অতীতে বনেদি বাড়ির পুজো এখন বারোয়ারি ও থিমে রূপ পেয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ছবিতে বদল এলেও পুজো নিয়ে উন্মাদনা কিন্তু কমেনি। কীভাবে শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো? জেনে নিন দুর্গাপুজোর ইতিহাস। (History of Durga Puja)
Table of Contents
দুর্গাপুজোকে ঘিরে যেমন থাকে আনন্দ, তেমনই এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে শত শত বছরের গৌরবময় ইতিহাস। আর প্রতিটা বছরে ধীরে ধীরে পারিবারিক পুজো থেকে দুর্গাপুজো আজ সকলের পুজো হয়ে উঠেছে।
দুর্গাপুজোর পৌরাণিক ভিত্তি ও শ্রী শ্রী চণ্ডীর কাহিনি (History of Durga Puja)
দুর্গাপুজোর ইতিহাসের কথা শুরু করতে গেলে মহিষাসুর বধের কথা বলতেই হবে। দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধ হয়েছিল। এই পৌরাণিক কাহিনী মার্কন্ডেয় পুরাণের শ্রী শ্রী চণ্ডী বা দেবী মাহাত্ম্য অংশে বর্ণিত আছে। পৌরাণিক কাহিনীতে রয়েছে, মহিষাসুর কঠোর তপস্যা করে ভগবান ব্রহ্মার কাছ থেকে অমরত্ব লাভ করেন। বর অনুযায়ী, তাঁকে কোনও পুরুষ বধ করতে পারবেন না। তিনি তাতে নিজেকে অমর হিসেবে ধরে নেন। কারণ মহিলাদের হাতে তাঁর মৃত্যু হবে সেটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তাই অমরত্মের অহংকারে তিনি অত্যাচার শুরু করেন। স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতাল—সব জায়গায় চলতে থাকে অত্যাচার। দেবতাদের স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেয় এবং নিজেই ত্রিলোকের রাজা হয়ে বসে। মহিষাসুরের অত্যাচারে যখন দেবতারা জর্জরিত হয়ে উঠলেন, তখন তাঁরা মহাদেব, ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু – এই ত্রিমূর্তির কাছে আশ্রয় চাইলেন।
এবার পুজোর প্ল্যান করুন Sharadotsav App দিয়ে, আপনার One stop solution
দেবতাদের কাতর প্রার্থনায় সৃষ্টি হলো দেবী। তিনিই মা দুর্গা। দেবীর দশটি হাত, প্রতিটাতে দেবতারা আলাদা আলাদা অস্ত্র তুলে দেন।
কোন দেবতা দেবী দুর্গাকে কী অস্ত্র দিয়েছিলেন?
শিব দেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দেন চক্র, ইন্দ্র দেন বজ্র, বরুণ দেন পাশ, এবং অন্য দেবতারা তাঁদের শক্তি অনুযায়ী অস্ত্র দান করেন।
দেবী দুর্গা তাঁর এই দশ হাতে দশ অস্ত্র নিয়ে মহিষাসুরকে বধ করেন। এতে পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসে। দেবীর এই জয়ের ফলে মর্ত্যে তাঁর পুজো শুরু হয়। এই চণ্ডীই দুর্গাপুজোর প্রধান গ্রন্থ, যা পুজোর সময় পাঠ করা হয়।

অকাল বোধন
বর্তমানে আশ্বিন মাসে যেই দুর্গাপুজো হয় সেটাকে বলা হয় অকাল বোধন। পুরাণ অনুযায়ী বসন্তকাল হচ্ছে দেবী দুর্গার পুজো করার আসল সময়। সেই সময়টা হয় বাসন্তী পুজো। কিন্তু রাবণকে বধ করার জন্য রামচন্দ্র আশ্বিন মাসে দেবীর পুজো করেন তাঁর আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য। রাম যে দুর্গাকে পুজো করেছিলেন তাঁর দশটি হাত রয়েছে এবং তিনি মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। ফলে বরাবর আমরা যে উৎসবকে দুর্গোৎসব বলে জেনে আসছি সেটার আরেক নাম হলো অকাল বোধন। (History of Durga Puja)
Durga Puja Special Kolkata Biryani: কলকাতায় কোন পুজোর কাছে রয়েছে সেরা বিরিয়ানি? রইল 5 জায়গার হদিশ
বাংলায় দুর্গাপুজোর সূচনা: প্রথম পারিবারিক পুজোর কাহিনি
বাংলায় দুর্গাপুজো শুরু নিয়ে নানা মহলে নানান মত রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলায় দুর্গাপুজোর সূচনা হয় ১৫০০ সালের দিকে, তবে এর শুরুর সঠিক সময় নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। দুটি বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, পুজোর সূচনা হয় রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায়। একটি মত দাবি করে, কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রথম পারিবারিক দুর্গাপুজোর শুরু করেন। তিনি তাঁর রাজত্বকালে এই পুজোকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন।
অন্য একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, ১৫৮৩ সালে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। কথিত আছে, তিনি এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায় পন্ডিতদের পরামর্শে তিনি প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করে দেবী দুর্গার পুজো করেন। এই পুজোটা এত বড় করে আয়োজন করেছিলেন তিনি যা দেখে আশপাশে জমিদারদের তাক লেগে যায়।

প্রাচীন বাংলায় শক্তি উপাসনা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রথা। বিভিন্ন পুরাণ এবং ঐতিহাসিক গ্রন্থে এটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এর পর মধ্যযুগে বাংলায় দুর্গাপুজোর একটি নতুন রূপ দেখা যায়। এই সময়ে হিন্দু রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি ব্যাপকভাবে উদযাপিত হতে থাকে। মুসলিম শাসনকালে দুর্গাপুজোর উপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তবে তা সত্ত্বেও বাংলার মানুষ তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চালিয়ে যায়।
ব্রিটিশ আমল: দুর্গোৎসবের বিস্তার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলায় হিন্দু রাজাদের আমলে যেই দুর্গাপুজো হতো ব্রিটিশদের আমলে তা আরও বাড়তে থাকে। কারণ সেই সময়ে কলকাতা সহ রাজ্যের জমিদার, ব্যবসায়ীদের ক্ষমতা বাড়তে থাকে এবং তাঁরা পুজো করতে থাকেন। এই পুজোগুলোতে ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হতো। এই পুজো একাধারে সামাজিক সম্মান এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জাঁকজমকপূর্ণ এই পুজোগুলোতে ইউরোপীয় নৃত্য, বিদেশি খাবার এবং ব্রিটিশ অতিথিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকত। এটি ছিল ব্রিটিশ এবং ভারতীয় উচ্চবিত্ত সমাজের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান। (History of Durga Puja)
Durga Puja 2025: কলকাতায় কোন মেট্রো স্টেশনের কাছে কোন বিখ্যাত পুজো? জানুন এক ক্লিকে
তবে তাতেও দুর্গাপুজোর দোর খুলল না সাধারণ মানুষদের জন্য। প্রচলিত আছে, ব্রিটিশবাবুদের তাঁবেদারি করতে সেই সময়কার পুজো উদ্যোক্তারা সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দিতেন না। এলাহি আয়োজন, খাওয়া দাওয়া দূর থেকে দেখতেন সাধারণ মানুষরা। ফলে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে পুজো করার ইচ্ছা বাড়তে থাকে। আর এই ইচ্ছা থেকেই দুর্গাপুজোকে সর্বজনীন করার কাজ শুরু হয়। সেখান থেকেই জন্ম হয় বারোয়ারি পুজোর।
বারোয়ারি বা সর্বজনীন পুজোর সূচনা হয় ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায়। ১২ জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে এই পুজোর আয়োজন করেন। ১২ জন হওয়ায় এটির নাম হয় বারোয়ারি। এই পুজোর লক্ষ্য ছিল, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, প্রথমবারেই তা বাজিমাত করে। এই ধারণাটি ধীরে ধীরে কলকাতা এবং বাংলার অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পারিবারিক পুজোর পাশাপাশি সর্বজনীন পুজোও জনপ্রিয়তা লাভ করে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে দুর্গাপুজোর ভূমিকা
এককালে ব্রিটিশদের মুগ্ধ করতে যেই দুর্গাপুজোয় তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকত, সেই ব্রিটিশদের তাড়াতে দুর্গাপুজোকে কাজে লাগানো হয়। দেবী দুর্গার লড়াই হয়ে ওঠে প্রতীক। দেবী দুর্গা কেবল একজন দেবী নন, তিনি হয়ে ওঠেন ভারত মাতার প্রতীক। পুজোর মধ্যে দিয়ে মানুষকে স্বাধীনতার জন্য অনুপ্রাণিত করা হতো। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ বলেছিলেন, ‘দুর্গাপুজো শুধু মায়ের পুজো নয়, এটি আমাদের দেশের জাগরণ।’

বাড়ির পুজো থেকে বর্তমানের পুজো
স্বাধীনতার পর দুর্গাপুজো একটি ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক মহোৎসবে পরিণত হয়। বারোয়ারি পুজোর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় কমিটি তৈরি হয় এবং সবাই মিলে চাঁদা তুলে পুজোর আয়োজন করে। ধীরে ধীরে সেই পুজোয় চাঁদার সঙ্গে যোগ হতে থাকে স্পনসর। এই পুজোই এখন সর্বজনীন দুর্গোৎসব নামে পরিচিত।
থিম পুজোর আগমন
গত ২০ বছর ধরে থিম পুজো জনপ্রিয় হয়েছে। একই ধাঁচের মন্ডপ তৈরি না করে পুজো কমিটিগুলো বেছে নিচ্ছে আলাদা আলাদা থিম। প্রতিটা থিমের মধ্যে দিয়ে বার্তা দেওয়া হচ্ছে। যা উপর ভিত্তি করে প্যান্ডেল, প্রতিমা এবং আলোকসজ্জা তৈরি করা হচ্ছে। এই থিমগুলি বিভিন্ন সামাজিক, ঐতিহাসিক বা পরিবেশগত বিষয় নিয়ে তৈরি করা হয়। এই থিম পুজোর সঙ্গে জুড়ছেন বিদেশিরাও। (History of Durga Puja)
Durga Puja 2025: নামমাত্র খরচে এবার ঠাকুর দেখুন এসি বাসে চড়ে, বিশেষ উদ্যোগ রাজ্যের
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
দুর্গাপুজো বাংলার অর্থনীতিতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে। পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই কেনাকাটা, প্যান্ডেল তৈরি, এবং প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ ছোট-বড় দোকানের মধ্যে দিয়ে এই সময় আয় করেন। একটা পুজোকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার মানুষের সংসার চলে। মূর্তি, ডেকরেটার্স, শিল্পী, জামা, জুতো, মেকআপ, ঘুঘনি, শপিং মল প্রতিটা ক্ষেত্রের ব্যবসায়ীরা যুক্ত হয়ে পড়েন।

দুর্গাপুজো, যা একসময় কেবল কিছু জমিদারের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তা সর্বসাধারণের। এখন পারিবারিক পুজোর সংখ্যা কমে আসছে। যেগুলো আছে সেগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। এখন পুজো জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে একই ছাতার তলায় নিয়ে আসে। পুজোর এই পাঁচটা সকলে এক হয়ে দুঃখ ভুলে উদযাপনে মেতে ওঠেন।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















