আপনি কলকাতার বাসিন্দা হোন বা না হোন, শ্যামবাজার নামটা শুনেছেনই। কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শ্যামবাজারের নেতাজির মূর্তি একাধিক ঘটনার সাক্ষী। মহামারি, অতিমারি থেকে দুর্গাপুজোর রোশনাই, সবকিছুই ছুঁয়েছে এই এলাকাকে। কিন্তু কোনওদিন ভেবে দেখেছেন শ্যামবাজার নামে শ্য়াম এল কোথা থেকে? এই প্রতিবেদনে জেনে নিন শ্যামবাজার নামের ইতিহাস (Shyambazar Name History)।
Table of Contents
আপনি সকাল আটটায় যান বা রাত ১২টায়। শ্যামবাজার সবসময় জনবহুল, বাস, অটো, মেট্রো, ব্যক্তিগত গাড়ি সবসময় ভিড় করে রয়েছে এই এলাকায়। এটি শুধু একটি ব্যস্ত এলাকা নয়, বরং এটি কলকাতার এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যা তার অতীতকে সযত্নে বুকে ধারণ করে আছে। শহরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এই বাজারটির নামকরণ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এর পিছনে লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের এক প্রভাবশালী বাঙালি জমিদার এবং তার গভীর ধর্মীয় ভক্তির এক অসাধারণ গল্প।
ব্রিটিশ আমলের কলকাতা ও গোবিন্দরাম মিত্রের উত্থান
শ্যামবাজার নামের ইতিহাস জানতে গেলে আগে গোবিন্দরাম মিত্রকে চিনতে হবে। সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা এই তিনটে গ্রামকে মিলিয়ে কলকাতা শহর তৈরি করা হয়েছিল সেটা তো সকলেরই জানা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যবসাকে শক্তিশালী করতেই এই কাজ করেছিল। আর তাদের অধীনে বেড়ে উঠেছিলেন এক বাঙালি।যিনি তাঁর মেধা, বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতা দিয়ে বিপুল প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন। তাঁর নাম গোবিন্দরাম মিত্র।
Dharmatala Name History: ধর্মতলা নামে ‘ধর্ম’ এল কোথা থেকে? জেনে নিন ইতিহাস
কলকাতা শহরের জন্মের সময়ে গোবিন্দরাম মিত্র ছিলেন একজন প্রভাবশালী জমিদার এবং ব্যবসায়ী। তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা করে নিজের সম্পত্তি বাড়াতে থাকেন। ধীরে ধীরে তিনি কলকাতার অন্যতম ধনী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তাঁর খ্যাতি এতটাই বেশি ছিল যে, স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘ব্ল্যাক জমিদার’ বা ‘নেটিভ জমিদার’ নামে পরিচিত ছিলেন।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, গোবিন্দরাম মিত্রের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত বিলাসবহুল। তিনি উত্তর কলকাতায় একটি সুবিশাল এবং দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন, যা সেই সময়ের ইউরোপীয়দেরও চোখ ধাঁধিয়ে দিত।

শ্যামবাজার নামের ইতিহাস, নামকরণের নেপথ্যে এক গভীর ভক্তি (Shyambazar Name History)
গোবিন্দরাম মিত্রের আর্থিক প্রতিপত্তির পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন। জনশ্রুতি, তিনি তাঁর নিজের বাড়িতেই কৃষ্ণকে উৎসর্গ করে একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তিনি এই মন্দির তৈরিতে কোনও কার্পণ্যও করেননি। এই মন্দিরে তিনি শ্রীকৃষ্ণের একটি মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। যে বিগ্রহের পরিচিতি ছিল শ্যাম রায় ও শ্যামসুন্দর নামে। নিত্যপুজো থেকে শুরু করে বড় করে উৎসব সবকিছুই করতেন গোবিন্দরাম মিত্র। সেই থেকেই জন্ম হয় শ্যামবাজার নামের।
শ্যামের পাশে বাজার এল কী করে?
গোবিন্দরাম মিত্রের বাড়ির পাশে একটি বাজার তৈরি হয়েছিল। যেটা স্থানীয়দের কাছে ছিল অক্সিজেন। সেই বাজার তৈরির নেপথ্যে গোবিন্দরাম মিত্রের ভূমিকাও ছিল। অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তিনি। আর তিনিই সেই বাজারের নাম রাখেন শ্যামবাজার। এভাবেই, শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে সেই বাজারটির নাম হয়ে যায় শ্যামবাজার। ধীরে ধীরে এটি একটি বাজার থেকে ঠিকানা হয়ে ওঠে এবং পরিচিতির অংশ হয়ে ওঠে।
Supreme Court of India: দিল্লিতে নয়, কলকাতাতে ছিল সুপ্রিম কোর্ট, জানেন কোথায়?
একটি বাজার থেকে কলকাতার পরিচিতি
শ্রীকৃষ্ণকে উৎসর্গ করে একটি বাজার এখন কলকাতার পরিচিতি। গোবিন্দরাম মিত্রের মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারের দাপট কমতে থাকলেও শ্যামবাজার নামটির দাপট বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে এই এলাকাটি তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছোট বাজার থেকে এটা বড় হয়ে কলকাতার অন্যতম বড় বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখান থেকে কলকাতার বাকি অংশে, এছাড়াও শহরতলিতেও যাওয়া যায়।
উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দী থেকেই শ্যামবাজার কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। এই সময়ে এই অঞ্চলে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়। স্কটিশ চার্চ কলেজ এই এলাকার অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, এই এলাকার কাছেই অবস্থিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়)। ফলে, শ্যামবাজার শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং একটি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও তার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়
শ্যামবাজার নিয়ে কথা হলেও, শ্যামবাজার বলতে সকলেই বোঝেন পাঁচ মাথার মোড়কে। ঘোড়ায় চড়া নেতাজির মূর্তি হচ্ছে স্মরণীয় ক্রসিং। এই ক্রসিংটি কলকাতা এবং তার আশপাশের এলাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই পাঁচ মাথার মোড়ের একদিকে রয়েছে পুরনো দিনের দোকান, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক মল, ক্যাফে।
এই এলাকাটিতে এখনও কিছু পুরনো বাড়ি রয়েছে, সেগুলো দিয়েই এগিয়ে চলেছে অতীত। আর শ্যামবাজার এলাকার বাতাসে রয়েছেন গোবিন্দরাম মিত্র। ইংরেজদের দাপটের মাঝে সফল ব্যবসায়ী হয়ে তিনি যেটা করে দেখিয়েছেন সেটা বর্তমান প্রজন্মের কাছে একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে। তাঁর পরের প্রজন্ম সেই দাপট ধরে রাখতে না পারলেও তিনি রয়ে গিয়েছেন মানুষের মনে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















