কলকাতায় মাস্ট ভিজিট জায়গাগুলোর মধ্যে যেটা প্রথমেই রয়েছে তা হলো সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল চার্চ। কলকাতা ময়দানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও বিড়লা তারামণ্ডলের পাশে যেই সাদা রঙের বিশাল চূড়াটা রয়েছে সেটাই St. Paul’s Cathedral Kolkata। এটি শুধু একটি চার্চ নয়, এটি কলকাতার ‘সিটি অফ জয়’ হয়ে ওঠার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Table of Contents
১৮৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত, প্রায় ১৭৮ বছর ধরে এই স্থাপত্যটি দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের আভিজাত্য নিয়ে। কিন্তু আপনি কি জানেন, আজ আমরা যে চার্চটি দেখি, শুরুতে এটি দেখতে মোটেও এমন ছিল না? দু-দুবার ভূমিকম্পে এর চূড়া ভেঙে পড়েছিল! চলুন, ইতিহাসের পাতা উল্টে জেনে নিই এই আইকনিক স্থাপত্যের জন্মকথা এবং কেন এটি পর্যটকদের কাছে ‘মাস্ট ভিজিট’ ডেস্টিনেশন।
কেন তৈরি হলো St. Paul’s Cathedral?
১৭৪৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ জিতে ইংরেজরা যখন শাসন করা শুরু করে তখন ব্রিটিশদের হাত ধরে ইউরোপের নানা দেশের মানুষরা ভারতে আসতে থাকেন। আর তাদের গন্তব্য ছিল কলকাতা। সেই সময়ে কলকাতার প্রধান চার্চ ছিল ‘সেন্ট জনস্ চার্চ’ (St. John’s Church)। ১৮০০ সালের গোড়ার দিকে এই চার্চ ছিল অন্যতম প্রধান চার্চ। কিন্তু এত বেশি ইউরোপীয় আসতে থাকায় সেন্ট জনস্ চার্চের জায়গা কম পড়ছিল। সেন্ট জনস্ চার্চ আয়তনে ছিল ছোট, ফলে রবিবারের প্রার্থনায় সবার জায়গা হতো না।
তৎকালীন বিশপ ড্যানিয়েল উইলসন (Bishop Daniel Wilson) পরিকল্পনা করলেন এমন এক ক্যাথিড্রাল তৈরি করার, যা হবে ইংল্যান্ডের বড় বড় চার্চগুলোর মতোই বিশাল এবং জাঁকজমকপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘সেকেন্ড সিটি’ বা দ্বিতীয় শহর কলকাতার বুকে এমন এক স্থাপত্য তৈরি হোক, যা দেখে বিশ্ব অবাক হবে।
নির্মাণকাজ ও স্থপতি
১৮৩৯ সালে এই চার্চের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বিশপ উইলসন এতটাই আবেগী ছিলেন যে, তিনি এই চার্চ তৈরির জন্য নিজের পকেট থেকে সেই সময়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকা দান করেছিলেন।
স্থপতি: মেজর উইলিয়াম নায়ার্ন ফোর্বস (Major William Nairn Forbes)। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ মিলিটারি ইঞ্জিনিয়র।
দীর্ঘ ৮ বছর ধরে কাজ চলার পর, ১৮৪৭ সালে এই চার্চটি সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এটিই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে বিদেশে (Overseas Territory) তৈরি হওয়া প্রথম এপিস্কোপাল ক্যাথিড্রাল। মজার ব্যাপার হলো, এই চার্চের ঠিক নিচেই প্রতিষ্ঠাতা বিশপ ড্যানিয়েল উইলসনকে কবর দেওয়া হয়েছিল।
ভূমিকম্প ও ভাঙাগড়ার ইতিহাস: যেভাবে বদলাল চেহারা
সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল চার্চের ইতিহাস অনেকটা ফিনিক্স পাখির মতো। ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছে এই চার্চ। শুরুতে এই ক্যাথিড্রালের চূড়া বা স্পায়ার ছিল একদম সূচালো, অনেকটা তীরের ফলার মতো। কিন্তু ভূমিকম্পে সেই আকৃতি বদলাতে হয়।
- ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প: এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে সেই সূচালো চূড়ার উপরের অংশ ভেঙে পড়ে। পরে তা মেরামত করা হয়।
- ১৯৩৪ সালের ভূমিকম্প: বিহার ও নেপালে হওয়া ভূমিকম্পে ওই সূচালো চূড়াটি পুরোটাই ধসে পড়ে।
এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আর সূচালো চূড়ো তৈরি করা হবে না, সেটা ঝুঁকির এবং সেই সময় ভূমিকম্প প্রতিরোধী সে ভাবে তৈরি না হওয়ায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তাই ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবেরি ক্যাথিড্রালের ‘বেল হ্যারি টাওয়ার’ (Bell Harry Tower)-এর অনুকরণে বর্তমানের এই বর্গাকার বা চৌকো টাওয়ারটি তৈরি করা হয়। যা আজও কলকাতার স্কাইলাইনের অন্যতম প্রতীক।
কলকাতার ঐতিহ্য হয়ে ওঠার গল্প
St. Paul’s Cathedral শুধু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় নয়, এটি কলকাতার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
- ইন্দো-গথিক স্থাপত্য: মেজর ফোর্বস চেয়েছিলেন ইংল্যান্ডের চার্চের আদলে এটি তৈরি করতে, কিন্তু তিনি ভারতীয় আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখেছিলেন। এই বিশাল হলের ভিতরে কোনও পিলার বা স্তম্ভ নেই। বিশেষ লোহার কাঠামোর উপর ছাদটি দাঁড়িয়ে আছে, যা সেই সময়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক বিস্ময়।
- বড়দিনের উৎসব: ২৫ ডিসেম্বর বা ক্রিসমাসের রাতে এখানে যে ‘মিডনাইট মাস’ (Midnight Mass) হয়, তা দেখার জন্য ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। চার্চের আলোকসজ্জা তখন ময়দান চত্বরকে মায়াবী করে তোলে।
- শিল্পকর্ম: চার্চের ভিতরের রঙিন কাচের জানলা এবং দেওয়ালের ফ্রেস্কোগুলি ইউরোপীয় রেনেসাঁ শিল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়।
Shyambazar Name History: শ্যামের পরে বাজার এল কী করে? জেনে নিন শ্যামবাজার নামের ইতিহাস
সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রালে কেন যাবেন এবং কীভাবে যাবেন?
কেন যাবেন?
- শান্তির খোঁজে: কলকাতার ব্যস্ত ট্রাফিক, কিন্তু চার্চের বিশাল কাঠের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। মন ভালো করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা হয় না।
- স্থাপত্য ও ছবি: আপনি যদি ফটোগ্রাফি বা আর্কিটেকচার পছন্দ করেন, তবে সাদা ধবধবে এই বিল্ডিং এবং এর ভেতরের কারুকাজ আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
- লাইব্রেরি: চার্চের ভেতরে একটি পুরোনো লাইব্রেরি আছে, যেখানে প্রাচীন বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে।
সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রালে কীভাবে যাবেন?
সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল একদম কলকাতার হৃদপিণ্ডে অবস্থিত।
- মেট্রো: সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন হলো ময়দান অথবা রবীন্দ্র সদন। স্টেশন থেকে নেমে ৫-৭ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন।
- বাস: রবীন্দ্র সদন বা এক্সাইড মোড়গামী যেকোনো বাসে উঠলেই হবে।
- ল্যান্ডমার্ক: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের ঠিক মাঝখানে এটি অবস্থিত।
সময়সূচী:
- সোমবার থেকে শনিবার: সকাল ৯টা – দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৩টে – সন্ধ্যা ৬টা।
- রবিবার: সকাল ১০টা – সন্ধ্যা ৬টা।
এক নজরে St. Paul’s Cathedral
| বিষয় | তথ্য |
| অবস্থান | ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পাশে, কলকাতা |
| নির্মাণকাল | ১৮৩৯ – ১৮৪৭ সাল |
| স্থপতি | মেজর উইলিয়াম নায়ার্ন ফোর্বস |
| স্থাপত্য শৈলী | ইন্দো-গথিক (Indo-Gothic) |
| সবচেয়ে আকর্ষণীয় | পিলারেহীন বিশাল হল ও রঙিন কাঁচের কাজ |
| প্রবেশ মূল্য | বিনামূল্যে (Free) |
সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রালকে বাদ দিয়ে কলকাতার ইতিহাসের কথা ভাবাই যায় না। এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি এক স্থাপত্যের বিস্ময় যা মনে করিয়ে দেয় ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতি। আপনি যদি কলকাতায় থাকেন বা বেড়াতে আসেন, তবে অন্তত একবার এই সাদা দুর্গের অন্দরে প্রবেশ করে ইতিহাসের সাক্ষী থাকা আপনার কর্তব্য।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

