শিশুর জন্মের পর থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত একটা জিনিস সঙ্গী থাকে। তা হলে মধু। খুব সমস্যা না হলে কেউই মধু খাওয়া ছাড়েন না। আর ছাড়বেনই বা কেন। মধু এমন একটা জিনিস যা মুখের পাশাপাশি মনকেও মিষ্টি করে দেয়। কিন্তু এই মিষ্টি মধুকে আপনার টেবল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে অনেক প্রাণ, ঘাম, রক্ত। এই প্রতিবেদনে জেনে নিন সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবন (Sundarbans Honey Collectors Life)।
Table of Contents
সুন্দরবনের গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো মাটি স্পর্শ করতে পারে না, সেখানে প্রতি বছর বসন্তের শেষে শুরু হয় এক মরণপণ লড়াই। একদিকে পেটের জ্বালা, অন্যদিকে ওঁৎ পেতে থাকা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লড়াই করে যান একদল অকুতোভয় মানুষ—যাঁদের আমরা চিনি ‘মৌয়াল’ নামে, অর্থাৎ যারা মৌমাছির চাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন।
যাত্রা শুরুর আগে: বনবিবির আশীর্বাদ ও জঙ্গলের নিয়ম
এপ্রিল থেকে জুন—সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের সেরা সময় (যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘মধু সিজন’ বলা হয়)। বনদপ্তরের অনুমতিপত্র বা বিএলসি (Boat Licence Certificate) নিয়ে মৌয়ালরা ছোট ডিঙি নৌকায় পাড়ি দেন। একটি দলে সাধারণত ৬ থেকে ৭ জন থাকেন। কোনওদিন মৌয়ালরা একা যান না মধু সংগ্রহে।

আর মধু সংগ্রহ করতে জঙ্গলে ঢোকার আগে তাঁদের প্রধান কাজ হলো বনবিবির পুজো করা। সুন্দরবনে হিন্দু হোক বা মুসলমান—সবার রক্ষাকর্ত্রী মা বনবিবি। তাঁদের বিশ্বাস, জঙ্গলের রাজা ‘দক্ষিণ রায়’ (বাঘ) মানুষের রূপ ধরে ছলনা করে, আর বনবিবি তাঁদের সেই বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
তবে জঙ্গলে যাওয়া সহজ নয়। সেখানে মানতে হয় অনেক নিয়ম। সেটা মেনে চলেন মৌয়ালরা। যেমন: জঙ্গলে চিৎকার করা বা উচ্চস্বরে কথা না বলা, তাঁরা নিজেদের মধ্যে সাধারণ ভাষায় কথা বলেন না, এক বিশেষ সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন যাতে বাঘ বুঝতে না পারে, জঙ্গলে বাঘকে নাম ধরে ডাকা নিষেধ। (Sundarbans Honey Collectors Life)
Island of The Dolls, যেখানে দ্বীপ জুড়ে ঝোলানো পুতুল, পদে পদে রহস্য, রইল বিস্তারিত
বাঘের ডেরায় মধুর খোঁজ: এক রোমহর্ষক অভিযান
নৌকা যখন খাড়ির গভীরে ঢোকে, তখন শুরু হয় আসল পরীক্ষা। কাদার ওপর দিয়ে হাঁটা সুন্দরবনে কঠিন। কারণ ম্যানগ্রোভের শক্ত শিকড় মাটির উপর উঠে থাকে, যা পায়ে বিঁধলে ইনফেকশন হতে সময় লাগে না।
মৌয়ালরা আকাশের দিকে তাকিয়ে মৌমাছির ওড়ার পথ লক্ষ্য করেন। মৌমাছি যেদিকে উড়ে যাচ্ছে, চাক সেদিকেই থাকবে। চাক খুঁজে পাওয়ার পর শুরু হয় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
- ধোঁয়া দেওয়া: শুকনো হেঁতাল পাতা বা খড় দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে মৌমাছি তাড়ানো হয়।
- চাক কাটা: একজন গাছে ওঠেন, বাকিরা নিচে পাহারায় থাকেন। হাতে থাকে দা বা কাস্তে।
আর এই সময়টাই বাঘের আক্রমণের জন্য সবচেয়ে আদর্শ। কারণ, ধোঁয়া দেওয়ার পর মৌয়ালরা উপরের দিকে তাকিয়ে মৌমাছির চাক দেখেন এবং ধোঁয়ার জন্য চোখ ঝাপসাও হয়ে থাকে। বাঘ এই সুযোগটাই নেয়। (Sundarbans Honey Collectors Life)

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ‘মাস্টারমাইন্ড’ শিকার পদ্ধতি
সুন্দরবনের বাঘ পৃথিবীর অন্যান্য বাঘের চেয়ে আলাদা। নোনা জল খেয়ে এদের লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে মেজাজ থাকে সবসময় খিটখিটে। বাকি বাঘের থেকে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার জন্মগতভাবে চালাক হয়।
বাঘ সাধারণত সামনে থেকে আক্রমণ করে না।
- সাইলেন্ট কিলার: বাঘ এত নিঃশব্দে সাঁতার কাটতে পারে যে নৌকায় বসে থাকা মৌয়াল টেরও পান না।
- পিছন থেকে ওয়ার: বাঘ লক্ষ্য করে দলের সবচেয়ে শেষের ব্যক্তিটিকে বা যিনি দলছুট হয়ে পড়েছেন। ঘাড়ের ওপর এক মরণ কামড় দেয়, আর মুহূর্তের মধ্যে গভীর জঙ্গলে উধাও হয়ে যায়। (Sundarbans Honey Collectors Life)
মাথার পিছনে মানুষের মুখ: বাঁচার এক অভিনব কৌশল
সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবন অনেকটাই অংশ বিভিন্ন ট্রিকসের পিছনে চলে যায়। যার মধ্যে এটা অন্যতম, পিছন থেকে বাঘের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে মৌয়ালরা এক অভিনব পদ্ধতি বের করেন। তাঁরা মাথার পিছনের দিকে একটি মুখোশ পরেন, যা মানুষের মুখের আদলে তৈরি করা।
যুক্তি হলো—বাঘ যদি দেখে শিকার তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তবে সে সাধারণত আক্রমণ করে না। যদিও এই কৌশল সবসময় কাজ দেয় না, তবুও বাঁচার তাগিদে এই মুখোশই তাঁদের একমাত্র বর্ম। (Sundarbans Honey Collectors Life)

‘বিধবা পল্লী’: যেখানে বাতাস ভারী কান্নায়
মৌয়ালদের এই লড়াইয়ের সবচেয়ে করুণ চিত্রটি দেখা যায় সুন্দরবনের গ্রামগুলোতে, বিশেষ করে গোসাবা, বালি দ্বীপ বা সাতজেলিয়া এলাকায়। এখানে এমন কিছু গ্রাম আছে যাকে লোকমুখে বলা হয় ‘টাইগার উইডো ভিলেজ’ বা ‘বিধবা পল্লী’।
এই গ্রামগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এমন একজন মহিলা আছেন, যার স্বামী মারা গিয়েছেন বাঘের আক্রমণে। কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ অনেক সময় এই বিধবাদের ‘অপয়া’ বা ‘স্বামী-খেকো’ বলে দাগিয়ে দেয়। সরকারি ক্ষতিপূরণ পাওয়াও অনেক সময় দীর্ঘ আইনি জটিলতায় আটকে যায়। সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবন-এ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটাই। (Sundarbans Honey Collectors Life)
কেন এই পেশা?
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, এত ঝুঁকি জেনেও কেন তাঁরা বারবার ফিরে যান সেই মৃত্যু উপত্যকায়?
উত্তর—খিদে এবং অভাব।
সুন্দরবনের নোনা মাটিতে চাষবাস প্রায় হয় না বললেই চলে। নদীতে মাছ কাঁকড়া ধরা বা মধু সংগ্রহ ছাড়া আয়ের অন্য কোনও উৎস নেই।
- এক কেজি খাঁটি মধুর বাজারদর ৪০০-৫০০ টাকা হলেও, মহাজনদের কাছে মৌয়ালরা পান তার অর্ধেক বা তারও কম।
- একটি বড় চাক থেকে ১০-১৫ কেজি মধু মেলে। পুরো মরশুমে একটি দল হয়তো ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় করে, যা দিয়ে সারাবছর সংসার চালানো কঠিন। তবুও, সন্তানদের মুখে ভাত তুলে দিতে বাবারা বাঘের মুখে ঝাঁপ দেন। একেই হয়তো বলে—”পেটে খিদে থাকলে বাঘের ভয়ও তুচ্ছ মনে হয়।”
সুপারমার্কেট থেকে আমরা যখন সুন্দর প্যাকেজিং করা মধু কিনি, তখন একবারও ভাবি না সুন্দরবনের সেই কাদা মাখা মানুষগুলোর কথা। তাঁরা কোনও আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই, শুধুমাত্র সাহসকে সম্বল করে এই প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের কাছে পৌঁছে দেন। (Sundarbans Honey Collectors Life)
মৌয়ালদের জীবন কোনো অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা নয়, এটি এক নিষ্ঠুর বাস্তব। সরকারি উদ্যোগ, বিমা ব্যবস্থা এবং বিকল্প আয়ের সংস্থানই পারে তাঁদের এই মরণখেলা থেকে মুক্তি দিতে। ততদিন পর্যন্ত, সুন্দরবনের গহনে বাঘ আর মানুষের এই লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকবে।
সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবন নিয়ে অজানা কিছু তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
| সবচেয়ে দামী মধু | সুন্দরবনের ‘খলিসা’ ফুলের মধু হলো সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং দামী। |
| বাঘের রং | সুন্দরবনের কাদার সাথে মিশে থাকার জন্য এখানকার বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগ অনেক বেশি গাঢ় হয়। |
| মৌয়ালদের সংখ্যা | প্রতি বছর প্রায় ৩-৪ হাজার মানুষ বৈধ অনুমতি নিয়ে জঙ্গলে ঢোকেন, অবৈধভাবে ঢোকার সংখ্যা আরও বেশি। |
| এপ্রিল ১ | প্রতি বছর এই দিনটিতে বনদপ্তর মধু সংগ্রহের জন্য জঙ্গল খুলে দেয়। |
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















