ভারত তথা কলকাতার ইতিহাসে David Hare-এর নামটা একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। ইংরেজদের খারাপ ছবির মধ্যে যিনি ব্যতিক্রম তিনি হলেন ডেভিড হেয়ার। কলকাতায় হিন্দু স্কুল এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ তাঁর হাতেই তৈরি। কিন্তু এই কিংবদন্তী শিক্ষানুরাগী সম্পর্কে যেই তথ্যটা সহজলভ্য, তাঁর গল্প আরও বেশি রয়েছে। বাংলার শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত মানুষটা আসলে পেশায় ছিলেন একজন ঘড়িবাবু বা ওয়াচমেকার। সহজ বাংলায় বলতে গেলে তিনি ঘড়ি সারাই করতেন। কিন্তু এই দরদি মানুষের মৃত্যুটা সুখের হয়নি। সমাজ থেকে বিতারিত হয়েছিলেন। জেনে নিন ডেভিড হেয়ারের শেষ দিনের লড়াই-
Table of Contents
ইংরেজদের শাসনে স্কটল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসে বিপুল টাকা অর্জন করেছিলেন ডেভিড হেয়ার। দেখলেন সেই সময় কলকাতার মানুষের যা অবস্থা তাতে একটা পরিবর্তনের দরকার ছিল। তাই মানুষের জন্য কাজ করা শুরু করলেন। এটা করতে গিয়েই খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর পরে ডেভিড হেয়ারের দেহ খ্রিস্টান কবরখানায় ঠাঁই পায়নি।
ভারতের ইতিহাসে David Hare কে ছিলেন?
ডেভিড হেয়ার স্কটল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসেছিলেন ঘড়ির ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে। সেটা করতেও পেরেছিলেন। সেটা করতে গিয়ে দেখেন, এদেশের দরিদ্র অথচ মেধাবী যুবকের সংখ্যা প্রচুর। তাঁদের প্রতি তাঁর একটা টান তৈরি হতে থাকে। কেবল অর্থ উপার্জনে থেমে না থেকে তিনি অকাতরে অর্থব্যয় করেছেন এদেশের মানুষের শিক্ষার প্রসারে। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা, স্কুল সোসাইটি গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
কোনও ভালো কাজ করতে গেলে সবাইকে খুশি করা যায় না। ডেভিড হেয়ারও তা পারেননি। অনেক শ্বেতাঙ্গ সাহেব তাঁর এই কাজে ক্ষুব্ধ হন। জীবদ্দশায় তাঁকে সরাসরি হেনস্থা করতে না পারলেও, তাঁর মৃত্যুর পরে সেই বিদ্বেষ চরম আকার ধারন করে।

শেষ দিন ও বন্ধুর প্রত্যাখ্যান: খ্রিস্টান কবরস্থানে ঠাঁই কেন হল না?
বিপুল টাকা আয় করলেও David Hare কলেরার মারা যান। ১৮৪২ সালের ১ জুন ছিল দিনটা। সেই সময়ে কলেরা ছিল প্রাণঘাতী এবং এর কোনও চিকিৎসাও ছিল না। হেয়ার সাহেব বুঝতে পারলেন মৃত্যু আসন্ন। তিনি বিচলিত না হয়ে কর্মচারীকে ডেকে নিজের কফিনের ব্যবস্থা করতে বললেন।
কথা মতোই কাজ হলো। ১ জুন তাঁর প্রয়াণের পর বন্ধুরা খ্রিস্টান কবরখানায় যোগাযোগ করলেন, সাধারণত এটাই হয়ে থাকে। এর পর থেকে শুরু সমস্যা। ডেভিড হেয়ার ধর্মে খ্রিস্টান হলেও, দেশের হিন্দু জনতার প্রতি তাঁর ভালোবাসাই কাল হলো। তাঁর এই ভারতীয়-প্রীতিকে কেন্দ্র করে গোরা সাহেবদের একাংশ খ্রিস্টান কবরখানা কর্তৃপক্ষকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিল। কবরখানার পক্ষ থেকে জানানো হলো, যেহেতু হেয়ার কলেরারা মতো ছোঁয়াচে রোগে মারা গিয়েছেন তাই খ্রীশ্চানদের কবরখানায় তাঁর ঠাঁই হবে না।
কিন্তু আসল কারণ ছিল, তাঁর উদারতা এবং হিন্দু জনতার জন্য তাঁর প্রাণপাত করা শ্রম। ফলে, ডেভিড হেয়ারের দেহের জন্য কোনো জমি বরাদ্দ করা হলো না।
Prince Anwar Shah Road-এর আনোয়ার শাহ কে? কেন তাঁর নামে রাস্তা? জেনে নিন ইতিহাস
শোকের মিছিল ও গোলদিঘিতে সমাধি
খ্রিস্টান কবরখানায় যখন ঠাঁই হলো না, তখন ঠিক হলো, কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ পাড়ে তাঁর নিজের জমিতেই তাঁকে কবর দেওয়া হবে। এই জায়গাটিই তখনকার দিনে গোলাকার পুকুরটির জন্য গোলদিঘি নামে পরিচিত ছিল।
খবর ছড়িয়ে পড়ল, ১৮৪২ সালের ২ জুন ঠিক হলো তাঁকে কবর দেওয়া হবে তাঁরই জমিতে। সে দিন কলকাতায় ছিল প্রবল ঝড়বৃষ্টি। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগও তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের ভিড় থামাতে পারেনি। প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ ডেভিড হেয়ারের শবদেহ নিয়ে শোক মিছিলে যোগ দেন।
কলেজ স্কোয়ারে David Hare-এর দেহ যখন সমাহিত করা হয়, তখন সেখানে প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব, রসময় দত্ত এবং রামতনু লাহিড়ীর মতো সে যুগের বিখ্যাত সমাজসংস্কারক ও বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। পথের দু’ধারে দাঁড়িয়েছিল হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ।

পানীয় জলের বিতর্ক: কবর সরানো নিয়ে মামলা
বৃষ্টি ও চোখের জলে David Hare-এর দেহ সমাহিত করা হলো, কিন্তু তৈরি হলো এক নতুন ঝামেলা। বর্তমানে যেটা কলেজ স্কয়্যারের ঝিল, তার পাশে ডেভিড হেয়ারকে কবর দেওয়া হয়েছিল। আর সে যুগে সাধারণ মানুষ এই ঝিলের জল পান করতেন। পুকুরটি খোঁড়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাসিন্দাদের খাবার জলের অভাব দূর করা।
তাই David Hare সাহেবকে সেখানে কবর দেওয়া অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। কবরের কিছু দিনের মধ্যেই Calcutta Star নামে একটি ইংরেজি সংবাদপত্রে ৬০ জন বাসিন্দার একটি অভিযোগ চিঠি প্রকাশিত হয়। চিঠিতে লেখা ছিল, গোলদিঘির পাড়ে সাহেবের মৃতদেহ পুঁতে রাখার ফলে পুকুরের জল অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে এবং হিন্দু শাস্ত্রমতে তা পান করার উপযুক্ত নয়। তারা সেখান থেকে কবর সরানোর দাবি জানায়।
এর পাল্টা জবাব দেন হেয়ারের ৮২ জন অনুগামী। তাঁরা পাল্টা যুক্তি দিয়ে কলকাতার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি আবেদন করেন। যেটা বলা ছিল, গোলদিঘি কোনও হিন্দুর প্রতিষ্ঠা করা পুকুর নয়। তাছাড়া, পুকুরের জল থেকে অনেকটাই দূরে আছে ওই কবর, তাই সেই কবর থেকে জল দূষিত হতে পারে না। ম্যাজিস্ট্রেট সমস্ত দিক বিচার করে রায় দিলেন—কবর যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে।
ধর্মতলা নামে ‘ধর্ম’ এল কোথা থেকে? জেনে নিন ইতিহাস
আজও যেখানে শুয়ে আছেন David Hare
ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ের ফলে সেই কবর আজও আছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ পাড়ে, যা মির্জাপুর স্ট্রিট (বর্তমানে সূর্য সেন স্ট্রিট) ধরে হাঁটলে দেখতে পাওয়া যায়। কবরের উপরেই তৈরি হয় একটি স্মৃতিসৌধ। এই সৌধটি তৈরি হয়েছিল হেয়ার সাহেবের গুণমুগ্ধদের চাঁদায়। জনপ্রতি মাত্র এক টাকা চাঁদা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই স্মৃতিসৌধ।
সেই থেকে সৌধটি আজও রয়েছে। ঝিলের এক কোণে এককালেন ঘড়িবাবু ও মানুষের জন্য কাজ করা মানুষটা শুয়ে রয়েছেন। তাঁর কবরের পাশে হিন্দু স্কুল, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শোনা যাচ্ছে পড়ুয়াদের আওয়াজ আর এগিয়ে চলেছে সময়, বেজেই চলেছে সময়ের ঘড়ি।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















