সময় এগিয়ে গেলেও অধিকাংশ বাঙালির একটা অভ্যাস এখনও রয়ে গিয়েছে, সেটা হলো ঘুম থেকে উঠে সংবাদপত্র পড়া। কর্মস্থলের জন্য তৈরি হতে হতে খবরের কাগজে চোখ বোলানোর অভ্যাসটা এখনও বদলায়নি, সংখ্যাটা অবশ্য কমেছে। এই একই ছবি প্যারিসেও। ইউরোপের অন্যতম ধনী শহর প্যারিসের মানুষও সংবাদপত্র পড়েন। কিন্তু পার্থক্য একটাই, সেখানে ‘কাগজওয়ালা’ বাড়িতে গিয়ে বিলি করে না (Last newspaper hawker in France)। এখানেই পার্থক্য তৈরি করছেন ৭২ বছর বয়সি আলি আকবর। গত ৫০ বছর ধরে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আলি আকবর প্যারিসের রাস্তায় খবরের কাগজ বিক্রি করছেন।
Table of Contents
পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে প্যারিসের রাস্তায় (Last newspaper hawker in France)
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের পথে গেলে আপনি এক পরিচিত দৃশ্য দেখতে পারেন। হাতে সংবাদপত্র, ঠোঁটে তাজা শিরোনাম, আর মুখে এক অদম্য হাসি। এই মানুষটির নাম আলি আকবর। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম নেওয়া আলি গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্যারিসের রাস্তায় কাগজ বিক্রি করছেন। সেটা করে এ বার তিনি ফ্রান্স সরকারের থেকে বিশেষ সম্মান পেতে চলেছেন।
Ali Akbar-এর যাত্রা
১৯৭৩ সালে আলি কাগজ বিক্রি শুরু করেন। সেই সময়ে তাঁর সঙ্গে প্যারিসে আরও ৩৫-৪০ জন কাগজ বিক্রেতা ছিলেন। কে আগে সব কাগজ বিক্রি করতে পারবে সেটা ছিল টানটান উত্তেজনা। তবে প্রথমে টিভি ও এখন মোবাইলের জন্য এই কাগজের বিক্রি ধাক্কা খেয়েছে। ফলে আলির সঙ্গে ব্যবসা করা ৩৫-৪০ জনও সরে গিয়েছে অন্য পেশায়।
কিন্তু ধুঁকতে থাকা পেশাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন আলি আকবর। বিক্রি হোক বা না হোক, নিজের কাজটা করে গিয়েছেন তিনি।
প্যারিসের রাস্তায় কাগজ বিক্রি করছেন আলি আকবর, এই লিঙ্কে ক্লিক করে দেখুন ভিডিয়ো
Ali Akbar-কে ফরাসি সরকারের স্বীকৃতি
আগামী মাসে ফ্রান্সের প্রেসি-কেডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ Ali Akbar অর্ডার অফ মেরিট (Order of Merit) দেবেন, এটা প্যারিসের অন্যতম সেরা সম্মান। মজার ব্যাপার হলো, ছাত্রজীবনে ম্যাক্রোঁ নিজেও আলি আকবরের কাছ থেকে সংবাদপত্র কিনেছিলেন।
ধুঁকতে থাকা পেশাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন Ali Akbar
সাক্ষাৎকারে আলি বলেন, ‘এখন সবকিছু ডিজিটাল। মানুষ শুধু ফোনে খবর পড়তে চায়।’
তবে তিনি এই পেশায় একা হলেও খুব একটা বেশি ভাবেন না। কারণ তাঁর থেকে যারা এখনও কাগজ কেনেন তাঁরা সবসময় কাগজ পড়া চালিয়ে যাবেন বলে মনে করেন আলি আকবর। কারণ, কাগজ পড়া একটা অভ্যাস।
আলি সাক্ষাৎকারে জানান, বর্তমানে তিনি দিনে প্রায় ৩০ কপি Le Monde (প্যারিসের সংবাদপত্র) বিক্রি করতে পারেন। বিক্রি হওয়া পেপারের অর্ধেক টাকা তিনি পান। যেগুলো বিক্রি হয় না, সেগুলোর টাকা পান না। জানান, ইন্টারনেট মোবাইলে আসার আগে তিনি দিনে এক ঘণ্টার মধ্যেই ৮০ কপি বিক্রি করতেন।
আলি আকবরের কাজের প্রতি ভালোবাসা
আলির জন্য এটি কেবল একটি পেশা নয়, এটি স্বাধীনতার প্রতীক, এটা ভালোবাসা। তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দে থাকতে ভালোবাসি। আমি স্বাধীন। কেউ আমাকে আদেশ দেয় না। তাই আমি এই কাজ করি।’
তাই ৭২ বছরের এই উদ্যমী মানুষটি এলাকার সবার পরিচিত। কেউ তাঁকে ভাইয়ের মতো দেখেন, কেউ বন্ধুর মতো। তাঁর হাসিখুশি স্বভাব এবং সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা করেছে।
আলির পাকিস্তান থেকে প্যারিসে আসা
প্যারিসের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পাওয়ার পথটা অবশ্য সহজ ছিল না। তাও আবার পাকিস্তানের মতো একটা দেশে জন্মে। আলির জন্ম রাওয়ালপিন্ডিতে।
- ১৯৬০ সালের সময়ে তিনি ইউরোপে আসেন, প্রথমে আমস্টারডামে গিয়ে ক্রুজ চাকরি করা শুরু করেন।
- ১৯৭২ সালে তাঁর জাহাজ ফ্রান্সের রুয়ান বন্দরে আসে, এবং এক বছর পর তিনি প্যারিসে স্থায়ীভাবে চলে আসেন।
- ১৯৮০-এর দশকে তিনি ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পান।
Every Resident Own a Plane: গাড়ি নয়, এখানে নিত্যদিনের সঙ্গী বিমান, চেনেন এই নগরীকে?
প্যারিসের সেন্ট-জার্মেইন: এক সময়ের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
একসময় সেন্ট-জার্মেইন এলাকায় লেখক, প্রকাশক, শিল্পী, অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পীদের ভিড় ছিল। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন আলি আকবরের গ্রাহক। তালিকায় ছিলেন এলটন জন, যিনি একদিন তাঁকে দুধ চা খাওয়ান। তিনি সায়েন্সেস প্রো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের অনেক রাজনীতিবিদের সঙ্গে পরিচিত হন, যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁও ছিলেন।
আলি আকবর বর্তমানের সেন্ট-জার্মেইন এলাকা নিয়ে মনে করেন, সেই এলাকার আত্মা হারিয়ে গেছে। সংষ্কৃতি হারিয়ে গিয়েছে। সেখানে এখন পর্যটকদের রমরমা।
ডিজিটাল যুগে চ্যালেঞ্জের মুখে সংবাদপত্র বিক্রি
আজকের দিনে সংবাদপত্র বিক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়া কেবল প্যারিস নয়, গোটা বিশ্বে একটি সমস্যা। ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, মোবাইল অ্যাপ, ই পেপার ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে লোকে এখন কাগজ কিনে বাসি খবর পড়তে চান না। তাই এই পেশাটা চ্যালেঞ্জের মুখে। এই কারণে অতীতে ৩৫-৪০ জন কাগজ বিক্রেতা থেকে এখন আলি একা।
এই ছবি শুধু প্যারিসে নয়, গোটা বিশ্বে, আপনার পাড়াতেও। তাই খবরের কাগজ পড়ুন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখান। এখনবার দিনে পড়া খুবই কম হয়।

