Site icon Unknown Story

Island of The Dolls, যেখানে দ্বীপ জুড়ে ঝোলানো পুতুল, পদে পদে রহস্য, রইল বিস্তারিত

Island of the Dolls

পুতুল নামটা শুনলেই মানুষের মন ভালো হয়ে যায়। একটা সুন্দর পুতুল যেমন বাচ্চাদের মাতিয়ে রাখতে পারে, তেমনই বড়দেরও মন ভালো করতে পারে। বিশ্বের এরকম অনেক জায়গা এবং উদাহরণ রয়েছে যেখানকার সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। আবার এমন কিছু জায়গা আছে যা আপনার রাতের ঘুম উড়িয়ে দেবে। সেই রকমই একটি জায়গা Island of The Dolls বা মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ। স্থানীয় ভাষার যার নাম ‘ইসলা দে লাস মিউনেকাস’ (Isla de las Muñecas)।

দিনের বেলাতেও এই দ্বীপের পরিবেশ থাকে থমথমে। গাছের ডালে, বেড়ার গায়ে, এমনকি মাটিতে—যেদিকেই তাকাবেন, দেখবেন হাজার হাজার পুরোনো, ভাঙা, নোংরা পুতুল আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। কারও চোখ নেই, কারও হাত ভাঙা, আবার কারও শরীরে পোকা বাসা বেঁধেছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই পুতুলগুলো সাধারণ কোনো খেলনা নয়; এদের ভেতরে নাকি বাস করে এক অতৃপ্ত আত্মা।

তবে শুরু থেকে ছবিটা এরকম ছিল না। কীভাবে তৈরি হলো এটি? আর কে সাজালো এই ভয়ঙ্কর দ্বীপ? কেনই বা হাজার হাজার পুতুল এখানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে? এই প্রতিবেদনে জেনে নিন তার ব্যাপারে। (Island of The Dolls)

Island of The Dolls: জোকিমিলকোর গভীরে এক ভুতুড়ে জগৎ

মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটি থেকে কিছুটা গেলেই রয়েছে একটা ছোট্ট কৃত্রিম দ্বীপ। জোকিমিলকো নামে এক খালের জলে ভাসমান এই ছোট্ট কৃত্রিম দ্বীপকেই বলা হয় পুতুলের দ্বীপ। জোকিমিলকো এমনিতে পর্যটকদের কাছে খুব প্রিয়, একে ‘মেক্সিকোর ভেনিস’ বলা হয়। ভেনিসের স্টাইলেই পর্যটকরা এখানে ঘুরতে আসেন। কিন্তু এই সুন্দর খালের এক গভীর নির্জন কোণে লুকিয়ে আছে এই বিভীষিকাময় দ্বীপটি।

বলা হয়, মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ-এ পা রাখলে বাতাসের শব্দও বদলে যায়। পর্যটকরা দাবি করেন, তাঁরা যখন নৌকা নিয়ে এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যান, তখন মনে হয় হাজার হাজার প্লাস্টিকের চোখ তাঁদের অনুসরণ করছে।

মেক্সিকোর মতো ভারতেও আছে এক রহস্যময় গ্রাম, পড়ুন মায়ং-এর কাহিনী

ডন জুলিয়ান এবং একটি মৃত শিশুর গল্প

এই দ্বীপের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি নাম—ডন জুলিয়ান সান্তানা ব্যারেরা (Don Julian Santana Barrera)। গত শতাব্দীর মাঝমাঝি সময়ে তিনি স্ত্রী ও সন্তান এবং সংসার ত্যাগ করে এই নির্জন দ্বীপে একা বসবাস শুরু করেন।

কেন তিনি সংসার ছেড়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে রহস্যের শুরু ১৯৫০-এর দশকে। জুলিয়ান দাবি করতেন, একদিন তিনি খালের জলে এক বাচ্চা মেয়েকে ডুবে যেতে দেখেন। তিনি মেয়েটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন ও মেয়েটি মারা যায়।

জুলিয়ানের দাবি, মেয়েটি মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তিনি জলের স্রোতে একটি পুতুল ভেসে আসতে দেখেন। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, এই পুতুলটি ওই মৃত মেয়েটিরই। মেয়েটির আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি সেই পুতুলটি জল থেকে তুলে একটি গাছে ঝুলিয়ে দেন। (Island of The Dolls)

ভয়ের বহিঃপ্রকাশ?

একটি পুতুল ঝোলানোর মাধ্যমেই যদি গল্পটি শেষ হতো, তবে আজ এই দ্বীপ নিয়ে এত আলোচনা হতো না। জুলিয়ান সান্তানা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ওই মৃত মেয়েটির আত্মা দ্বীপ ছেড়ে যায়নি। সে এখনও ওখানেই ঘুরে বেড়ায়।

জুলিয়ানের দাবি, তিনি নাকি প্রায় রাতেই কান্না শুনতে পেতেন। কখনও কখনও নাকি মেয়েটি রেগে গিয়ে চিৎকার করত। জুলিয়ান মনে করেন, সেই মেয়েটির আত্মাকে শান্ত করতে তিনি আরও পুতুল জোগাড় করা শুরু করেন। 

তিনি আবর্জনা থেকে ভাঙা পুতুল কুড়িয়ে আনতেন। কখনও কখনও স্থানীয়দের থেকে পুতুল কিনতেন। যেভাবে পুতুলটি তিনি কিনতেন সেভাবেই গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিতেন। অর্থাৎ, কোনও পুতুল নোংরা, কোনওটা আবার ভাঙা, এভাবেই চলত।

দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তিনি এই কাজ করে গেছেন। ধীরে ধীরে পুরো দ্বীপটি ভরে ওঠে হাজার হাজার পুতুলে এবং নাম হয় মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ। রোদ, বৃষ্টি আর ঝড়ে পুতুলগুলোর প্লাস্টিক গলে গিয়ে সেগুলোকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। অনেকের চোখের কোটরে বাসা বেঁধেছে মাকড়সা, কারও পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে গাছপালার শিকড়। (Island of The Dolls)

এভাবেই ঝোলানো হয়েছে পুতুল

২০০১ সালের সেই রহস্যময় মৃত্যু

ডন জুলিয়ানের জীবনের শেষ অধ্যায়টি আরও বেশি রোমহর্ষক। ৫০ বছর ধরে যে মৃত মেয়েটির ভয়ে তিনি দ্বীপটিকে পুতুল দিয়ে সাজিয়েছিলেন, শেষপর্যন্ত সেই ভয়ই তাঁর মৃত্যু ডেকে এনেছিল।

২০০১ সালে, জুলিয়ানের ভাইপো তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—ঠিক যেই জায়গায় ৫০ বছর আগে জুলিয়ান সেই ছোট মেয়েটিকে ডুবে যেতে দেখেছিলেন, ঠিক সেই একই জায়গায় জলেই ডুবে জুলিয়ানের মৃত্যু হয়।

মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এবং এর পর তিনি জলে পড়ে যান। কিন্তু স্থানীয় মানুষরা বিশ্বাস করেন, সেই মেয়েটির আত্মাই শেষ পর্যন্ত জুলিয়ানকে নিজের কাছে টেনে নিয়েছে।

জুলিয়ানের মৃত্যুর পর এই মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে জুলিয়ানের পরিবারের সদস্যরাই এটি দেখাশোনা করেন। কিন্তু এখানে ঘুরতে আসা সাহসী পর্যটকদের অভিজ্ঞতা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।

অনেক পর্যটক দাবি করেছেন:

অবশ্য বিজ্ঞানমনস্কদের মতে, এগুলো সবই মনের ভুল বা ‘ম্যাস হিস্টিরিয়া’। দ্বীপের ভৌতিক পরিবেশ এবং জুলিয়ানের গল্প মানুষের মনে এমন ভয়ের সঞ্চার করে যে তাঁরা হ্যালুসিনেশনে ভোগেন। (Island of The Dolls)

এক নজরে: আইল অফ ডলস

বিষয়তথ্য
আসল নামইসলা দে লাস মিউনেকাস (Isla de las Muñecas)
অবস্থানজোকিমিলকো খাল, মেক্সিকো সিটি
স্রষ্টাডন জুলিয়ান সান্তানা ব্যারেরা
পুতুলের সংখ্যাকয়েক হাজার (আনুমানিক)
বিখ্যাত কেন?প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি এবং ডার্ক ট্যুরিজম
জুলিয়ানের মৃত্যু২০০১ সাল (জলে ডুবে)
প্রবেশ মূল্যনৌকার ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল (গড়ে $৫০-$৭০)

কুসংস্কার নাকি ট্র্যাজেডি?

‘Island of The Dolls’ বা মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ কি আসলেই ভুতুড়ে, নাকি এটি এক নিঃসঙ্গ মানুষের মানসিক বিকারের ফসল? ডন জুলিয়ান কি সত্যিই কোনও মৃত মেয়েকে দেখেছিলেন, নাকি পুরোটাই ছিল তাঁর কল্পনা? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন মিলবে না।

তবে সত্য-মিথ্যার উর্ধ্বে গিয়ে এই দ্বীপটি আজ এক জীবন্ত ট্র্যাজেডি। হাজার হাজার প্লাস্টিকের চোখের আড়ালে এখানে লুকিয়ে আছে একাকিত্ব, ভয় এবং এক অজানা রহস্যের গল্প। মেক্সিকোর এই পুতুল দ্বীপ প্রমাণ করে—বাস্তব অনেক সময় কল্পনার চেয়েও বেশি ভয়ংকর হতে পারে।


Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন


Exit mobile version