Google Maps-এ অস্ট্রেলিয়ার উত্তর পূর্ব দিকে খুঁজলে প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দেখতে পাবেন একটা ছোট্ট বিন্দু। অনেকটা জ়ুম করার পর দেখতে পাবেন একটা গোল আকৃতির দ্বীপ। যার আয়তন মাত্র ২১ বর্গকিলোমিটার, একটি ছোট্ট দ্বীপ। জনসংখ্যা ১০-১২ হাজার, এর নাম নাউরু (Nauru Bird Poop)। গুগল সার্চ করলে এই দেশটির ব্যাপারে বিশেষ কিছু পাওয়া যাবে না। দারিদ্রতা, দুর্নীতিতে ডুবে থাকা এই দেশটির অবস্থা এরকম ছিল না। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে এই দেশটির মাথাপিছু আয় আমেরিকা বা সৌদি আরবের চেয়েও বেশি ছিল। দেশটির পুলিশ প্রধান চালাতেন ল্যাম্বরগিনি, আর সাধারণ মানুষ শপিং করতে বিমানে চড়ে অন্য দেশে যেতেন।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু (Nauru)-র ইতিহাস ঠিক এমনই। কিন্তু এককালে বিত্তশালী এই দেশ কী করে এখন ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে গেল? রইল এই প্রতিবেদনে।
Table of Contents
‘প্লেজেন্ট আইল্যান্ড’ ও গুপ্তধনের খোঁজ
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় নাবিকরা যখন প্রথম এই দ্বীপে পা রাখেন, তখন এর নাম দিয়েছিলেন ‘প্লেজেন্ট আইল্যান্ড’ বা মনোরম দ্বীপ। নারকেল গাছ, স্বচ্ছ নীল জল আর আদিবাসীদের সহজ জীবনযাত্রা—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক স্বর্গ। মূলত শহরের কোলাহল থেকে দূরে থাকা এই দ্বীপ ছিল শান্ত। (Nauru Bird Poop)
কিন্তু ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে অ্যালবার্ট এলিস নামে এক ব্যক্তি আবিষ্কার করেন, এই দ্বীপের মাটি সাধারণ মাটি নয়। হাজার হাজার বছর ধরে লাখ লাখ অ্যালবাট্রস ও অন্যান্য সামুদ্রিক পাখি এই নির্জন দ্বীপে মলত্যাগ করেছে। এই পাখির বিষ্ঠা বা ‘Guano’ দ্বীপের প্রবাল চুনাপাথরের (Coral Limestone) সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে উচ্চমানের ফসফেট। যা আধুনিক কৃষিকাজে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

Nauru Bird Poop: পাখির পটি যখন ‘সাদা সোনা’
১৯৬৮ সালে Nauru অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং খনির পূর্ণ অধিকার নিজেদের হাতে নেয়। এরপরই শুরু হয় নাউরুর স্বর্ণযুগ।
৭০ এবং ৮০-র দশকে নাউরু হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ।
- সেই সময় নাউরুর মাথাপিছু আয় বা GDP Per Capita Income ছিল কুয়েত বা আমেরিকার চেয়েও বেশি।
- নাগরিকদের কোনও ইনকাম ট্যাক্স দিতে হতো না।
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ—সব ছিল বিনামূল্যে। সরকার নাগরিকদের বাড়ি তৈরি করে দিত। সেই সময়ে পরিস্থিতি এমন ছিল যে মানুষের কাছে অতিরিক্ত টাকা হয়ে গিয়েছিল, খরচ করার মতো কিছু ছিল না।
- কাজ করার কোনও প্রয়োজন ছিল না। দ্বীপের সমস্ত কায়িক শ্রমের কাজ করত বিদেশ থেকে আসা শ্রমিকরা (চিন, কিরিবাত্তি প্রভৃতি দেশ থেকে)। নাউরুর বাসিন্দাদের কাজ ছিল শুধু টাকা ওড়ানো। (Nauru Bird Poop)
শোনা যায়, নাউরুর পুলিশ প্রধান একটি ল্যাম্বরগিনি গাড়ি কিনেছিলেন, যদিও মাত্র ২১ কিমি রাস্তার ওই দ্বীপে স্পোর্টস কার চালানোর কোনও জায়গা ছিল না। এমনকি তিনি এত মোটা ছিলেন যে গাড়িতে ঢুকতেও পারতেন না!
25 বছর পর ডুবে যাবে এই দেশ, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে মানচিত্র থেকে
ভুল বিনিয়োগ ও অপচয়: যখন সুখের অসুখ হলো
কিছু না করেই হঠাৎ করে হাতে কাঁচা টাকা আসলে যা হয়, নাউরুর ক্ষেত্রেও তাই হলো। সরকার এবং জনগণ ভবিষ্যতের কথা না ভেবে দেদার খরচ করতে শুরু করল।
- একঘেয়েমি কাটাতে নাউরুর মানুষ বিমানে করে অস্ট্রেলিয়া বা সিঙ্গাপুরে লাঞ্চ করতে যেতেন। নতুন গাড়ি কেনা বা দামী ইলেক্ট্রনিক্স কেনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
- নাউরু সরকার বিদেশের মাটিতে হোটেল, গলফ কোর্স এমনকি লন্ডনে ‘লিওনার্দো’ নামক একটি মিউজিক্যাল শো-তে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে, যা শেষ পর্যন্ত ফ্লপ হয়। দুর্নীতির কারণে ‘নাউরু ফসফেট রয়্যালটি ট্রাস্ট’-এর বিশাল অর্থ ভাণ্ডার শূন্য হতে থাকে। অর্থাৎ, হাতে টাকা থাকলেও তা অবাঞ্ছিত খরচ চলতে থাকে। (Nauru Bird Poop)
পরিবেশের বিপর্যয়: স্বর্গের মৃত্যু
মাটি থেকে ফসফেট তুলে তা বিক্রি করে যত টাকা আসতে লাগল, ততই বেশি লোভ হতে থাকল নাউরুর বাসিন্দাদের। ফলে তারা নিজেদের দ্বীপকেই খুঁড়ে ফেলল। খনি থেকে ফসফেট বের করতে গিয়ে দ্বীপের উপরিভাগের মাটি খুঁড়ে ফেলা হলো।
- আজ নাউরুর দিকে তাকালে মনে হবে যেন চাঁদের পিঠ। দ্বীপের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ জমি এখন বসবাসের অযোগ্য। এবড়োখেবড়ো তীক্ষ্ণ চুনাপাথরের স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কোনও গাছ জন্মায় না, মানুষও বাস করতে পারে না।
- দ্বীপের মানুষ এখন কেবল উপকূলীয় সরু এক ফালি জমিতে গাদাগাদি করে বাস করে। ৯০% মানুষ কৃষিকাজ করেন।
- বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে, যা নাউরুর অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। কিন্তু তাদের পিছু হটার জায়গা নেই, কারণ দ্বীপের ভেতরটা তো আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। (Nauru Bird Poop)

স্বাস্থ্য সংকট: বিশ্বের সবথেকে ‘মোটা’ দেশ
টাকা আসার সঙ্গে নাউরুর মানুষের হাতে বিকল্প বেড়ে গিয়েছিল অনেক। সেই প্রভাবটা পড়ে তাদের খাদ্যাভ্যাসে। টাটকা মাছ আর ফলের বদলে তারা প্যাকেটজাত খাবার, ক্যানড ফুড, জাঙ্ক ফুড এবং প্রচুর পরিমাণে অ্যালকোহল ও সোডা খেতে শুরু করে। এমনও ব্যক্তি ছিলেন যারা দিনের পর দিন জল না খেয়ে শুধু কোক খেতেন। হাতে টাকা থাকায় কায়িক পরিশ্রম বন্ধ হয়ে যায়, এর ফলে তাদের শরীরে বাসা বাঁধে রোগ।
বর্তমানে নাউরু বিশ্বের অন্যতম ‘Obese’ বা স্থূল মানুষের দেশ।
- দেশটির প্রায় ৭১% মানুষ স্থূলতার শিকার।
- ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগের হারেও তারা বিশ্বে শীর্ষে। এখানকার মানুষের গড় আয়ুও কমে গেছে।
Island of The Dolls, যেখানে দ্বীপ জুড়ে ঝোলানো পুতুল, পদে পদে রহস্য, রইল বিস্তারিত
বর্তমান নাউরু: দেউলিয়া এক রাষ্ট্র
৯০-এর দশকের শেষের দিকে ফসফেটের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসতে শুরু করে। আর তখনই নাউরুর ঘুম ভাঙে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। (Nauru Bird Poop)
- টাকা ফুরিয়ে যাওয়ার পর নাউরু কালো টাকার স্বর্গে পরিণত হয়। রাশিয়ান মাফিয়াদের টাকা পাচারের কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই দ্বীপ। আন্তর্জাতিক চাপে পরে তা বন্ধ করতে হয়।
- অর্থের প্রয়োজনে তারা বিদেশিদের কাছে নাগরিকত্ব বিক্রি করতে শুরু করে, বদলে টাকা নিতে থাকে।
- বর্তমানে নাউরুর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলো অস্ট্রেলিয়া সরকারের দেওয়া অনুদান। অস্ট্রেলিয়া অবৈধ অভিবাসীদের (Refugees) মূল ভূখণ্ডে জায়গা না দিয়ে নাউরুর একটি ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখে। এর বিনিময়ে নাউরু টাকা পায়। একসময়ের গর্বিত জাতি এখন অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
- দেশে একটা বিমানবন্দর থাকলেও সেখানে সপ্তাহে একটা বিমান আসে। তাও যাত্রী কম হলে বাতিল হয়ে যায়। বছরে ২০০-৩০০ পর্যটক যান সেখানে।
এক নজরে নাউরুর উত্থান ও পতন
| বিষয় | স্বর্ণযুগ (১৯৭০-৮০) | বর্তমান অবস্থা (২০২৬) |
| প্রধান সম্পদ | পাখির বিষ্ঠা (ফসফেট) | বিদেশি সাহায্য ও ডিটেনশন সেন্টার |
| মাথাপিছু আয় | বিশ্বের সর্বোচ্চ স্তরে | অত্যন্ত নিম্নগামী ও সাহায্য নির্ভর |
| পরিবেশ | সবুজ ও মনোরম | ৮০% ভূমি ধ্বংসপ্রাপ্ত (Moonscape) |
| জীবনযাত্রা | বিলাসবহুল | দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্য সংকটে জর্জরিত |
নাউরুর গল্প কেবল একটি দ্বীপের গল্প নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রকৃতি আমাদের সম্পদ দেয়, কিন্তু সেই সম্পদ যদি আমরা পরিকল্পনা করে ব্যবহার না করি, তা হলে ধ্বংস অনিবার্য। পাশাপাশি কোনও একটা আয়ের উপর ভরসা না করে আয়ের উৎসকে ভাগ করতে হবে। যেমন সৌদি আরব, ওমান, কাতারের মতো দেশ শুধু তেলের আয়ের উপর ভরসা না করে অন্যক্ষেত্রেও বিনিয়োগ করছে। সেটা নাউরু করলে তাদের এই দিনটা হয়তো দেখতে হতো না। (Nauru Bird Poop)
আজ নাউরুর সেই জৌলুস নেই, ল্যাম্বরগিনিগুলো মরচে ধরে নষ্ট হয়ে গেছে, আর পড়ে আছে কেবল খনি খুঁড়ে বের করা এক কঙ্কালসার দ্বীপ।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.



















