পাড়ার মোড়ের লাল ডাকবাক্স বা বাড়ির বাইরে লাগানো পোস্ট বক্সের সঙ্গে সকলেই পরিচিত। এখনও অনেকে পোস্ট বক্স ব্যবহার করেন। আবার অনেকে পোস্ট বক্সকে দূরে সরিয়ে রেখে বেছে নিয়েছেন ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপকে। তবে বিশ্বে এমন একটা পোস্টবক্স আছে যেটা মাটির উপরে নয়, জলের তলায় (underwater mailbox)। শুনতে আজব লাগলেও এটাই সত্যি। এমনই একটা পোস্ট বক্স রয়েছে জাপানে।
Table of Contents
underwater mailbox কোথায় আছে?
জাপানের ওয়াকায়ামা প্রিফেকচারের প্রত্যন্ত এক কোণে রয়েছে সুসামি নামের এক ছোট্ট গ্রাম। এটা জেলে গ্রাম নামেই পরিচিত। কারণ এই গ্রামে যারা থাকেন তাঁদের অধিকাংশের পেশা মাছধরা। এখানকার জীবন চলে খুব ধীরে। সারারাত মাছ ধরে সকালে নৌকাগুলো বন্দরে ফেরে। বছরের পর বছর ধরে সুসামি গ্রামের ছবি এমনই। বংশপরম্পরায় সকলে মাছের ব্যবসার সঙ্গেই যুক্ত। তবে এই শান্ত গ্রামকে শিরোনামে এসেছ সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত একটি লাল রঙের ডাকবাক্স।
বছরের পর বছর ধরে এটি সমুদ্রের নিচ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে চিঠি। এর চারপাশে ঘুরতে থাকা মাছ, প্রবালরা এর সাক্ষী।
কেন জলের তলায় চিঠির বাক্স?
underwater mailbox-এর গল্পের শুরুটা আজ থেকে বহু বছর আগে। তাও শুরু এক জেলের হাত ধরেই। কেনজি নামে সুসামি গ্রামের একজন তরুণ জেলে ভালোবাসত সমুদ্রের গভীরতা, তার নীরবতা। দিনের অধিকাংশ সময়টা মাছ ধরার জন্য তাঁর সমুদ্রেই কাটত। তিনি দেখছিলেন গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, কারণ নতুন প্রজন্মের যুবকরা কাজের খোঁজে বড় শহরে পাড়ি দিচ্ছিলেন।
সবার মধ্যে আগ্রহ আনতে কেনজির এক রাস্তা নেন। তাঁর প্রিয় সমুদ্রে মানুষকে আনতে উদ্যোগ নেন। কিন্তু কী ভাবে? গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে সবাই তা হেসে উড়িয়ে দিতে থাকে। কিন্তু কেনজি ছিলেন নাছোড়বান্দা।
গ্রামে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিলেন তসিহিকো মাতসুমোতো একজন অবসরপ্রাপ্ত পোস্টমাস্টার। পেশার জন্য তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে চিঠি দিয়ে। কেনজি তাঁর ভাবনাটি খুলে বললে সেই প্রাক্তন পোস্টমাস্টারকে। এরপরই শুরু হয় সেই অসাধ্য সাধন।
একদিন কেনজি তাঁর জেলে বন্ধুদের ডেকে সাহায্য চাইল। তাঁরা সবাই মিলে একটি পুরনো লাল ডাকবাক্স সংগ্রহ করল। সেটি ছিল প্রায় জরাজীর্ণ। তাঁরা এটিকে জলের নিচে রাখার জন্য তৈরি করল। লোহা ও ইস্পাতের কাঠামো তৈরি করে বক্সটিকে সুরক্ষিত করা হলো। দেখা হলো সমুদ্রের নোনা জলের জন্য যাতে এটা নষ্ট না হয়।
এটি তৈরি হওয়ার পর সেটিতে নামানো হলো সাগরের নিচে, ঘটনাটি ১৯৯৯ সালের। ১০ মিটার বা প্রায় ৩২ ফুট গভীরতায়, ডাকবাক্সটিকে রাখা হলো। শুরুতে গ্রামবাসীরা দর্শক হলেও এই খবরটা ছড়িয়ে পড়ার পর সকলে খোঁজ করতে শুরু করেন। এর পরই গ্রামবাসীরা আগ্রহ দেখাতে থাকেন।
এটি ছিল বিশ্বের প্রথম স্বীকৃত underwater mailbox। ২০০২ সালে, এই ডাকবাক্সটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ‘বিশ্বের গভীরতম underwater mailbox’ হিসেবে স্থান করে নেয়, যা সুসামিকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়।
German Man Swims to Office: যানজটে বিরক্ত, প্রতিদিন 2 কিলোমিটার সাঁতার কেটে অফিস যান এই ব্যক্তি
সুসামি গ্রামের ইতিহাস
এটি প্রধানত মৎস্যজীবীদের গ্রাম, যেখানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। ঐতিহাসিক দিক থেকে, সুসামি বরাবরই তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং গভীর জলের জন্য পরিচিত। তবে এটি কখনও বড় কোনও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেনি। গ্রামের অর্থনীতি মূলত মাছ ধরা এবং কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। সেখান থেকে ছবিটা বদলাতে থাকে কেনজির উদ্যোগের পর।
Underwater mailbox-এর সমস্যা
তৈরি তো হলো, কিন্তু সমস্যাও রয়েছে। গ্রামের সবাই জলের তলায় যেতে পারেন না। তা হলে চিঠি দেওয়া হবে কী করে? উদ্যোগ নেয় একটি ডাইভিং কমিউনিটি। তারাই প্রথমে জলের নিচে গিয়ে চিঠি পোস্ট করতে থাকে।
- এই পোস্টবক্সে চিঠি পাঠাতে গেলে মানতে হয় কিছু নিয়ম
- পর্যটকদের প্রথমে স্থানীয় ডাইভিং শপ থেকে ওয়াটারপ্রুফ পোস্টকার্ড এবং মার্কার কিনতে হয়।
- তাঁরা সেই মার্কার দিয়ে পোস্টকার্ডে লেখেন
- এরপর তারা ডাইভিং স্যুটে পরে ডাইভারের সাহায্যে পোস্টবক্সের কাছে যান
- বক্সের কাছে গিয়ে নিজের চিঠি জমা দেন
- যারা ডাইভ করতে পারেন না, তাঁরা ডাইভারদের দিয়ে চিঠি পাঠান
ডাইভাররা এখান থেকে চিঠি তোলেন ও বিভিন্ন জায়গায় পাঠান।
ডাকবাক্সের রক্ষণাবেক্ষণ
এটি প্রতি ছয় মাস অন্তর একবার করে তোলা হয়, পরিষ্কার করা হয় এবং নতুন করে রং করা হয়। বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার চিঠি পাঠানো হয়েছে এই ডাকবাক্সের মাধ্যমে, যা সুসামিকে শুধু পরিচিতি দেয়নি, বরং তার অর্থনীতিরও উন্নতি ঘটিয়েছে।
এই ডাকবাক্সটিতে প্রতি বছর ১০০০ থেকে ১৫০০টি চিঠি দেওয়া হয়। প্রতিটি চিঠিই যেন এক একটি গল্প, এক একটি স্বপ্ন। কেউ লিখেছে তার প্রিয়জনকে ভালোবাসা কথা, কেউ লিখেছে তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, আবার কেউ হয়তো প্রকৃতির কাছে তার গোপন কোনও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এই চিঠিগুলো প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির এই যুগেও মানুষের মনে চিঠির আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বিশেষ করে, যখন সেই চিঠিটি আসে সমুদ্রের গভীর থেকে, তখন তার মূল্য আরও বেড়ে যায়।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন

