এখন রাস্তায় বেরোলে বিভিন্ন সংস্থার গাড়ির ভিড়। কোনওটা পেট্রোল, আবার কোনওটা ডিজ়েল, অনেকগুলো আবার ইভি। তবে একটা সময়ে ছিল যখন ভারতে রাস্তার রাজা ছিল একজন। সেটা অ্যাম্বাসেডর (Ambassador Car)। সাদা রঙের এই গাড়িটি শুধু একটি বাহন ছিল না, এটি ছিল ভারতের আভিজাত্য, ক্ষমতা এবং মধ্যবিত্তের স্বপ্নের প্রতীক। প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী, সাধারণ ট্যাক্সি চালক থেকে সরকারি অফিসার—সবার প্রথম পছন্দ ছিল এই মজবুত গাড়িটি। জেনে নিন History of Ambassador Car.
Table of Contents
কিন্তু আজ হারিয়ে যাওয়া গাড়িতে কেন বলা হতো ‘King of Indian Roads’? কীভাবে ব্রিটিশদের ডিজাইন করা একটি গাড়ি হয়ে উঠল ভারতের নিজস্ব আইকন? আর কেনই বা ২০১৪ সালে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল এর চাকা? আজকের এই প্রতিবেদনে জেনে নিন বিস্তারিত
অ্যাম্বাসেডরের জন্ম: ব্রিটিশ নকশা ও ভারতীয় স্বপ্ন
অ্যাম্বাসেডরের গল্প শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। ভারতীয় সংস্থা হিন্দুস্তান মোটরস ব্রিটেনের মরিস মোটরসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই গাড়িটি তৈরি শুরু করে। ব্রিটেনের ‘Morris Oxford Series III’ মডেলটিতে অদলবদল করে ভারতে ‘অ্যাম্বাসেডর’ নামে লঞ্চ করা হয়।
সবচেয়ে ভালো হচ্ছে এর প্রথম কারখানা ছিল আমাদের রাজ্যের হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। এটি ছিল এশিয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় অটোমোবাইল কারখানা। ১৯৫৮ সালে যখন প্রথম অ্যাম্বাসেডর রাস্তায় নামে, তখন এর চেহারা সকলকে চমকে দিয়েছিল।
কেন সব স্কুল বাসের রং হলুদ হয়? জেনে নিন আসল কারণ
History of Ambassador Car: কেন অ্যাম্বাসেডরকে বলা হতো ‘রাস্তার রাজা’?
দীর্ঘ প্রায় ৫ দশক ধরে ভারতের রাস্তায় একচেটিয়া রাজত্ব করেছে এই গাড়ি। এর পেছনে ছিল তিনটি প্রধান কারণ:
সোফার মতো সিট
অ্যাম্বাসেডরের পেছনের সিটকে তুলনা করা হতো ড্রয়িং রুমের সোফার সঙ্গে। চওড়া এবং আরামদায়ক সিট সেই সময়ের অন্য কোনো গাড়িতে ছিল না। পুরো পরিবার একসঙ্গে যাতায়াত করার জন্য এটি ছিল আদর্শ। বর্তমানে গাড়িগুলো অনেক কমপ্যাক্ট, কিন্তু অ্যাম্বাসেডর ছিল পুরো আলাদা।
ট্যাঙ্কের মতো মজবুত
ভারতের খানাখন্দ ভরা রাস্তায় চলার জন্য অ্যাম্বাসেডরের কোনও বিকল্প ছিল না। এর বডি ছিল এতটাই শক্ত যে লোকে একে আদর করে ‘ট্যাঙ্ক’ বলতো। ছোটখাটো ধাক্কায় এই গাড়ির কিছুই হতো না।
ক্ষমতার প্রতীক
সাদা অ্যাম্বাসেডর, মাথায় লাল বাতি এবং সামনে জাতীয় পতাকা—এটি ছিল ভারতীয় রাজনীতিবিদের ট্রেডমার্ক। দীর্ঘকাল ধরে এটিই ছিল ভারতের ভিআইপিদের একমাত্র বাহন। আমলা থেকে মন্ত্রী, অ্যাম্বাসেডর ছাড়া তাঁদের চলতো না। ফলে বাড়িতে একটা অ্যাম্বাসেডর থাকা মানে সেটা সমাজে একটা স্ট্যাটাস সিম্বল।
রাজত্ব হারাতে শুরু করল রাজা
আশির দশক পর্যন্ত অ্যাম্বাসেডরের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ছবিটা বদলে যায়। সেই সময় বাজারে আসে Maruti 800। ছোটো, সস্তা এবং তেল সাশ্রয়ী এই গাড়িটি দ্রুত মধ্যবিত্তের মন জয় করে নেয়। এর নেপথ্যে কারণ ছিল পার্কিং। অ্যাম্বাসেডর গাড়ি আকারে অনেকটা বড়। ফলে যাদের পার্কিংয়ে সমস্যা ছিল তাঁরা বেছে নেন এই মারুতি ৮০০। (History of Ambassador Car)
১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি উন্মুক্ত হওয়ার পর Hundai, Ford, Honda-র মতো বিদেশি কোম্পানিরা বাজারে আসে। তাদের আধুনিক ডিজাইন, এসি এবং পাওয়ার স্টিয়ারিং-এর সামনে অ্যাম্বাসেডরকে পুরানো এবং ধীরগতির হয়ে যায়। মাইলেজের সমস্যা এবং আধুনিক ফিচারের অভাব গাড়িটিকে পিছিয়ে দেয়।
গড়িয়ার থেকে জন্ম গড়িয়াহাটের? কী করে কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠল এই এলাকা?
২০১৪ সালের সেই কালো দিন
একদিকে চাহিদা কমতে থাকা এবং লোকসান বাড়তে থাকায় ২০১৪ সালের ২৪ মে উত্তরপাড়া কারখানায় ‘সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক’ বা কাজের স্থগিতাদেশ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। থেমে যায় ভারতের অটোমোবাইল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়। যেই কারখানা একসময় গমগম করতো, তা আজ নীরব। (History of Ambassador Car)
২০১৭ সালে হিন্দুস্তান মোটরস মাত্র ৮০ কোটি টাকায় অ্যাম্বাসেডর ব্র্যান্ডটি ফরাসি কোম্পানি Peugeot (PSA Group)-এর কাছে বিক্রি করে দেয়।
এক নজরে Ambassador Car
| বিষয় | তথ্য |
| উৎপাদনকারী | হিন্দুস্তান মোটরস (Hindustan Motors) |
| কারখানা | উত্তরপাড়া, পশ্চিমবঙ্গ |
| উৎপাদন কাল | ১৯৫৮ থেকে ২০১৪ |
| মূল মডেল | Morris Oxford Series III |
| ডাকনাম | King of Indian Roads, Amby |
| বর্তমান মালিক | Peugeot (PSA Group) |
অ্যাম্বাসেডর সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্য
- বিশ্বসেরা ট্যাক্সি: বিবিসি-র জনপ্রিয় শো ‘টপ গিয়ার’ (Top Gear) অ্যাম্বাসেডরকে বিশ্বের সেরা ট্যাক্সির খেতাব দিয়েছিল। তারা এটিকে নিয়ে বহু কঠিন পরীক্ষা করেছিল এবং সবকটিতেই এটি পাস করে।
- প্রথম ডিজেল গাড়ি: অ্যাম্বাসেডর ছিল ভারতের প্রথম গাড়ি যাতে ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছিল।
- কলকাতার আইকন: হলুদ ট্যাক্সি হিসেবে অ্যাম্বাসেডর আজও কলকাতার ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাওড়া ব্রিজ আর হলুদ ট্যাক্সি—এই ছবি ছাড়া কলকাতা অসম্পূর্ণ।

কেন হারিয়ে গেল অ্যাম্বাসেডর
এর নেপথ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে সময়ের সঙ্গে মানাতে না পারা। ধরুন এখন 5G-র যুগে কোনও সংস্থা যদি ঘটা করে তাদের নতুন কীপ্যাড ফোন বাজারে আনে তাতে কেউ আগ্রহ দেখাবেন? নিশ্চই না। দেখালেও হাতেগোনা কয়েকজন। একই অবস্থা হয়েছিল অ্যাম্বাসেডরের। বিদেশি কোম্পানিগুলো এসে যেই নতুন ফিচারগুলো আমদানি করেছিল অ্যাম্বাসাডর তা দিতে পারেনি, বলা ভালো সময়ের সঙ্গে সেগুলো তারা গ্রহণ করতে পারেনি। যেমন এসি, পারেনি। আধুনিক মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম, পারেনি করতে। মাইলেজের দিক থেকেও গাড়ির ইঞ্জিনকে উন্নত করতে পারেনি। সব মিলিয়ে অ্যাম্বাসেডর চলে যাওয়াটা একটা ধাক্কা হলেও সময়কে বুঝতে না পারাটাও একটা কারণ এদের হারিয়ে যাওয়ার জন্য। শুধু গাড়ির ক্ষেত্রে নয়, দৈনন্দিন জীবনে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানাতে না পারলে একদিন অ্যাম্বাসেডরের মতোই হারিয়ে যেতে হবে।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
FAQ on History of Ambassador Car
অ্যাম্বাসেডর গাড়ি কি এখনো পাওয়া যায়?
না, ২০১৪ সালে হিন্দুস্তান মোটরস অ্যাম্বাসেডরের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। তবে পুরনো গাড়ি হিসেবে পাওয়া যেতে পারে।
অ্যাম্বাসেডর ব্র্যান্ডের মালিক কে?
২০১৭ সালে সি.কে. বিড়লা গ্রুপ অ্যাম্বাসেডর ব্র্যান্ডটি ফরাসি কোম্পানি Peugeot-এর কাছে ৮০ কোটি টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে।
অ্যাম্বাসেডর কি আবার নতুন রূপে ফিরে আসবে?
শোনা যাচ্ছে, Peugeot গ্রুপ অ্যাম্বাসেডরকে ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল’ বা ইভি (EV) হিসেবে পুনরায় বাজারে আনতে পারে, তবে এ নিয়ে এখনো কোনও ঘোষণা করা হয়নি।
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

















