রাজ্য দেশ বিদেশ খেলা খাবার ও রেসিপি লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও গ্যাজেটস অন্যান্য খবর Utility News

---Advertisement---

Attention Economy: মন নিলে গো শুধু

By Raja
Published on: August 21, 2025
attention economy
---Advertisement---

সৌমিক চট্টোপাধ্যায়

একসময় আমাদের বড়রা বলতেন, “পড়াশোনায় মন দাও।” এখন যদি তারা বলে ওঠেন “মন দে!”, এ প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়তো স্মার্টফোনে স্ক্রল করতে করতে বলবেন, “মন তো আমি আগেই দিয়ে ফেলেছি , Instagram Reels কে!”

মনোযোগের বাজারে হাট বসেছে। স্বাগতম Attention Economy-র জগতে। এখানে আমাদের মনোযোগই হলো নতুন মুদ্রা। টাকা নেই, চিন্তা নেই— ৮ সেকেন্ডের চোখের পলকহীন স্ক্রোলটাই এখন বিলিয়ন ডলারের ইনভেস্টমেন্ট।

Attention Economy কী?

Attention Economy-র ধারণাটা নতুন নয়। ১৯৭১ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হার্বার্ট সাইমন বলেছিলেন-
“Information consumes the attention of its recipients. Hence, a wealth of information creates a poverty of attention.” অনেক তথ্য মানেই কম মনোযোগ।

তথ্যের অতিরিক্ত সরবরাহ, অ্যাপ ও বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি, কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে এক নতুন ডিজিটাল বাস্তুতন্ত্রের প্রতিদিন মানুষ গড়ে ৫০০০-এর বেশি বিজ্ঞাপন দেখে। সোশ্যাল মিডিয়াতে একেকজন ব্যবহারকারী দিনে গড়ে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট কাটায়।

দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় attention span কমে যাচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালে যেখানে গড় মনোযোগ ১২ সেকেন্ড ছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৮.২৫ সেকেন্ডে।

কেন ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন করে তৃণমূল? জানুন ইতিহাস

মনোযোগই মূল্যবান সম্পদ

তথ্য ও প্রযুক্তির বিস্ফোরণ ঘটে গেলেও মানুষের মনোযোগ রয়ে গেছে সীমিত। এই সীমিত মনোযোগই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এই সবকিছু গড়ে তুলেছে এক নতুন ধরণের অর্থনীতি। যার নাম Attention Economy বা মনোযোগের অর্থনীতি। ভারতে, যেখানে ৮২ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, সেখানে মনোযোগের অর্থনীতির সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

ভারতের সমসাময়িক রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে এই Attention Economy রীতিমতো এক শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারে তারা ডিজিটাল মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, মাইক্রো-টার্গেটিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের মনোযোগকে দখল করে। তারপর নিজেদের নির্মিত মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক ভাষ্যকে ছড়িয়ে দেয় নানা কৌশলে। সেই নির্মিত ভাষ্য প্রভাবিত করছে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ভাবনা , নির্বাচনী সিদ্ধান্তকে।

ডিজিটাল বাস্তুতন্ত্রে, রাজনৈতিক প্রচার কৌশলের ভিত হলো Attention Economy।

Attention Economy-কে রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার

রাজনৈতিক প্রচারে এটি ব্যবহৃত হয় ভোটারদের দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব প্রচার সামগ্রী দেখাতে। বিরোধীদের প্রচারকে ছাপিয়ে যেতে এবং মনের গভীরে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ গেঁথে দিতে। একজন ভোটার যতক্ষণ একটি দলের প্রচার কনটেন্ট দেখছেন, তত বেশি সম্ভবত তিনি সেই ভাষ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শে প্রভাবিত হচ্ছেন।

ভারতীয় জনতা পার্টি ২০১৪ সাল থেকেই “Digital First” কৌশল গ্রহণ করে। তারা প্রথম রাজনৈতিক দল যারা নির্বাচনী প্রচারে IT Cell গঠন করে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়।

China AI Technology: বিশ্বজুড়ে এক থ্রেট ও ভারতে এর প্রভাব

প্রতিটি ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট, ইউটিউব চ্যানেল এবং WhatsApp গ্রুপকে একটি attention capturing unit হিসেবে ব্যবহার করে।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সোশ্যাল মিডিয়ায় ৫০ কোটির বেশি ইমপ্রেশন তৈরি করেছিল মাত্র এক সপ্তাহে।

‘ম্যায় ভি চৌকিদার’ ভিডিও ক্যাম্পেইনটি মাত্র ২ দিনে ১ কোটির বেশি বার দেখা হয়েছিল ইউটিউবে।

রাজনৈতিক প্রচার ও ডিজিটাল মিডিয়া

বিজেপি মাইক্রো-টার্গেটিং পদ্ধতিতে তাদের ডেটা অ্যানালিটিক্স টিম ব্যবহার করে ভোটারদের লোকেশন, ধর্ম, বয়স, পছন্দ, সামাজিক স্তর অনুযায়ী বিভাজন করে। প্রত্যেক উপ-গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট ভাষা ও বার্তা তৈরি করে, যাতে মনোযোগ স্থির থাকে। উত্তর প্রদেশে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় “তিন তালাক বিল”, দলিত এলাকায় “স্বচ্ছ ভারত অভিযান” এবং যুবকদের জন্য “নতুন ভারত”-এর কনটেন্ট প্রচার করা হয়।

সোশ্যাল মিডিয়াতে ইনফ্লুয়েন্সার, অভিনেতা, ইউটিউবারদের মাধ্যমে দলীয় বার্তা ছড়ানো হয়। এতে নিরপেক্ষ মনে হলেও বার্তাটি আসলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। যদিও সেই ইনফ্লুয়েন্সার, অভিনেতা, ইউটিউবারদের বেশীরভাগই ছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির ভাড়াটে সেনা।

এর সঙ্গে প্রকাশ্যে কোনও ব্র্যান্ডিং ছাড়া বিজেপি ঘনিষ্ঠ অনেক ইউটিউবার নিয়মিত “anti-opposition” কনটেন্ট তৈরি করে, যা অ্যালগরিদমে ছড়িয়ে যায়।

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম বুঝে ও অপ্টিমাইজ করে BJP-র আইটি সেল ও তাদের রাজনৈতিক সহযোগী সংস্থাগুলো (আইপ্যাক, শোটাইম) এমন কনটেন্ট তৈরি করে যা বেশি শেয়ার, প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক তৈরি করে। বিতর্কিত কনটেন্টই বেশি মনোযোগ ধরে রাখে। অ্যালগরিদম কে ব্যবহার করে সমাজ মাধ্যমে জনগণের মনোযোগ ধরে রাখার এই পন্থার সাবেক নাম Attention Engeenering।

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে BJP শুধুমাত্র ফেসবুক অ্যাডে ব্যয় করে ₹২৭ কোটি।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে শুধু ফেসবুক বিজ্ঞাপনেই বিজেপি ব্যয় করেছে ₹২৫ কোটি (সূত্র: Meta Ad Library)। উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের মনোযোগ দখল করা।

দেশের আবেগ উসকাতে হাতিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া

CAA/NRC নিয়ে দেশ জুড়ে বিতর্ক চলাকালীন BJP-র প্রচার “Nation First” বার্তা দিয়ে আবেগ উসকে দেয়—যা মানুষের মনোযোগকে কেন্দ্রীভূত করেছিল।

মনোযোগ দখলের যুদ্ধে অনেক সময় ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর হেডলাইন বা ক্লিকবেট ভিডিও ব্যবহৃত হয়। BJP-র IT সেল-এর বিরুদ্ধে বহু ভুয়ো ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। AltNews, BoomLive এর মতো ফ্যাক্টচেক সংস্থাগুলো বারবার ভারতীয় জনতা পার্টি ঘনিষ্ঠ সোশ্যাল হ্যান্ডেলগুলোর ভুয়ো কনটেন্ট চিহ্নিত করেছে।

মনোযোগ হরনের এই প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র নজর কেড়ে রাখার জন্য নয়, বরং আরও গভীরতর মনোভাব নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার, নারী নির্যাতনের মত ধারণ গুলিকে মান্যতা দেওয়ার জন্য। মনোভাবের একরৈখিকরণের উদ্দেশ্যে।

“লাভ জেহাদ”, “আরবান নকশাল”, “অ্যান্টি ন্যাশনাল” ইত্যাদি শব্দচয়ন এবং তদনুযায়ী কনটেন্টের মাধ্যমে জনমত তৈরি করা হয়েছে, যাতে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি তাদের নীতিগত অবস্থান থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

একজন নেতা ১০ মিনিটের বক্তৃতা দেন, কিন্তু মিডিয়া দেখায় ১০ সেকেন্ডের ক্লিপ, যেখানে তিনি হয় ভুল বলেছেন অথবা বিরোধীকে গাল দিয়েছেন। বিরোধী পক্ষ মিম বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়, হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং হয়: #Papaji #LOLneta।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম Attention Economy–র বারুদে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এখানে সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য হয় না, মনোযোগ পেলেই জয়। Google, Facebook, Instagram – সবই ফ্রি। কিন্তু মূলত আপনি নিজেই হচ্ছেন বিক্রয়ের বস্তু।


আগামী দিনে হয়ত AI আপনার চিন্তা পড়ে জানাবে আপনি কী দেখতে চান—আপনি জানার আগেই!

আমরা এখন এমন এক যুগে আছি, যেখানে মনোযোগ সবচেয়ে দামি সম্পদ।
এমনকী সময়ের থেকেও দামি।
কারণ সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু মনোযোগ বেঁচে দেওয়া যায়।

একটা মিম দিয়ে শেষ করি-
“Used to be afraid of nuclear war. Now afraid of not getting likes.”


লেখক পরিচিতি

Attention Economy
Attention Economy: মন নিলে গো শুধু 2

সৌমিক চট্টোপাধ্যায় কলকাতার কাশীপুরের জৈন কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি একজন প্রাবন্ধিক।


Unknown Story-কে ফেসবুকইন্সটাগ্রামে ফলো করুন



Discover more from Unknown Story

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

---Advertisement---

Raja

লেখালেখি পছন্দ করেন। পেশাদার লিখিয়ে নন। নিজের কাজের পাশাপাশি এখন UnknownStory.in-এ লিখছেন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Reply