কলকাতায় শপিংয়ের কথা আসলে সবার আগে যেই জায়গার নাম আসে সেটা ধর্মতলা। এসপ্ল্যানেড স্টেশন থেকে শুরু করে টানা নিউ মার্কেট পর্যন্ত হাঁটলে আপনি পরিবারের সকলের জন্য শপিং করতে পারবেন। লম্বা সময় ধরে ঘুরে শপিং করা আর হাঁটার পর খিদে পাওয়াটা স্বাভাবিক। আর ধর্মতলা চত্বরে খিদে পেলে সবার আগে আসবে অনাদি কেবিনের কথা। ১০৩ বছরের পুরনো এই কেবিন বয়ে বেড়াচ্ছে ঐতিহ্য। এই প্রতিবেদনে জেনে নিন তারই ইতিহাস (Anadi Cabin History).
Table of Contents
কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায় গেলে একবার ঢুঁ মারবেন সেখানে। এসএন ব্যানার্জি রোড ধর্মতলায় যেখানে গিয়ে শেষ হচ্ছে ঠিক তার বাঁ হাতে রয়েছে এই কেবিন। ছোট্ট, পরতে পরতে পুরনো দিনের ছোঁয়া লাগা এই কেবিনে গেলে আপনি ঝাঁ চকচকে ছোঁয়া না পেলেও পাবেন পুরনো কলকাতার টাচ।
করোনাকালে চারমাস বন্ধ ছিল অনাদি কেবিন। সেই সময় প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল এটির ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে ফের শুরু হয়। সেই থেকে চলছে। আর এই কেবিন যার হাত ধরে পথচলা শুরু করেছিল তিনি হলেন বলরাম জানা। তাঁর জাদুতেই অনাদির মোগলাই এতটা জনপ্রিয়। সেটার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কষা মাংস। ১০৩ বছর আগে যেই দুটো পদ এদের হট ফেভারিট ছিল, এখনও একই। দাম বাড়লেও জনপ্রিয়তা কমেনি।
Dharmatala Name History: ধর্মতলা নামে ‘ধর্ম’ এল কোথা থেকে? জেনে নিন ইতিহাস
অনাদি কেবিনের প্রতিষ্ঠাতা বলরাম জানা কে?
ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম নেই। বা এখন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দোকানগুলোর মতো ফুড চেনও তৈরি করে উঠতে পারেনি, ফলে বলরাম জানা মুখে মুখেই রয়ে গিয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুর মহকুমার ধুইপাড়ার বাসিন্দা বলরাম কাজের সন্ধানে ১৬ বছর বয়সে গ্রামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। ইতিহাস ঘেঁটেও সেই সালটা জানা যায়নি।
শুরুর দিকে বলরাম দিনে কাজ করতেন ও হাওড়ায় একজনের বাড়িতে থাকতেন। এর পর একটি খাবারের দোকানে কাজ নেন ও সেই দোকানেই থাকতেন। ধীরে ধীরে টাকা জমিয়ে নিজের একটা খাবারের দোকান তৈরি করেন। সেটা ছিল ঢাকাই পরোটার দোকান। কিন্তু দোকানটা ধর্মতলার ভিতরের দিকে হওয়ায় বিক্রিবাট্টা খুব একটা বেশি হতো না। পরে বলরাম জানা, বর্তমান যেই ঠিকানায় অনাদি কেবিন আছে সেখানে নিয়ে আসেন।
নিজের ব্যবসার পাশাপাশি বলরাম জানা গ্রামে সমাজসেবার কাজও করতেন। তিনি কেবিনের আয়ের একটা অংশ দিয়ে গ্রামে স্কুল খুলেছিলেন। সালটা ছিল ১৯৪৬। কারণ ছিল, তাঁর গ্রাম ধুইপাড়ার আশপাশে কোনও স্কুল ছিল না। তাই সকলকে পড়ার জন্য যেতে হতো ওডিশাতে (ধুইপাড়া ছিল ওডিশা সীমান্তে)। সেই কারণে বলরাম স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নেন।
কেবিনের নামে অনাদি এল কী করে? (Anadi Cabin History)
তবে প্রথমদিকে এটার কোনও নাম ছিল না। সকলে ‘কেবিন’ নামেই চিনত। দোকান যখন মোটামুটি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে সেই সময় বলরাম জানার বড় সন্তান অনাদি টাইফয়েডে মারা যান। বড় ছেলের স্মৃতিতে তিনি দোকানের নাম রাখেন অনাদি কেবিন। এখন এটি চালান বলরামের ছোট ছেলে আদির পুত্র ভবতোষ জানা, বড় ছেলে আশুতোষ জানা চিকিৎসক।

অনাদি কেবিনের বিখ্যাত পদ
এই কেবিনের মেনু কার্ডে খুব বেশি বৈচিত্র্য নেই, তবে যে কয়েকটি পদ আছে, সেগুলো এতটাই বিখ্যাত যে নতুন করে কোনও পদের প্রয়োজন হয় না। এখানকার প্রতিটি পদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই রেসিপি এবং একই স্বাদে তৈরি হয়ে আসছে। এর প্রধান আকর্ষণ হলো সাশ্রয়ী মূল্য, যা আজও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে।
- মুরগির রোস্ট: এটি সবচেয়ে বিখ্যাত এবং অপরিহার্য পদ। মাংসের একটি সম্পূর্ণ টুকরাকে মশলা দিয়ে ম্যারিনেট করে ধীরে ধীরে রোস্ট করা হয়।
- কষা মাংস: বাঙালি কষা মাংসের স্বাদ পেতে হলে আপনাকে একবার এখানকার কষা মাংস চেখে দেখতেই হবে। এর ঝাল-ঝাল এবং কষানো স্বাদ আপনাকে তৃপ্ত করবে।
- মটন রোস্ট: মুরগির রোস্টের মতোই এটিও এখানকার অন্যতম সেরা পদ।
- বিভিন্ন ধরনের কাটলেট ও চপ: বিভিন্ন ধরনের কাটলেট ও চপ পাওয়া যায়, যেমন ফিশ কাটলেট, ভেজিটেবল কাটলেট এবং ডিমের ডেভিল।
- মোগলাই পরোটা: এটা সবার শেষে থাকলেও এটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
Shyambazar Name History: শ্যামের পরে বাজার এল কী করে? জেনে নিন শ্যামবাজার নামের ইতিহাস
অনাদি কেবিনের বিশেষত্ব: কেন এটি এত জনপ্রিয়?
এর জনপ্রিয়তার কারণ কেবল এর খাবারের স্বাদ নয়, এর পেছনের কিছু বিশেষত্বও জড়িত, যা এটিকে অন্য সব রেস্তোরাঁ থেকে আলাদা করেছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এটি শুধু একটি খাবারের দোকান নয়, এটি কলকাতার সংস্কৃতির একটি অংশ। আয়তনে ছোট্ট হলেও আপনি এখানে পুরনো ছোঁয়া পাবেন। এখানে বহু বিখ্যাত ব্যক্তি, যেমন সাহিত্যিক, অভিনেতা এবং রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন সময়ে এসেছেন।
স্বাদের ধারাবাহিকতা: এই কেবিন তার মেনুতে কোনও পরিবর্তন আনেনি। তারা একই রেসিপি এবং একই ধরনের মশলা ব্যবহার করে আসছে, যা তাদের খাবারের স্বাদকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। এই ধারাবাহিকতাই এর প্রধান শক্তি।
সাধারণ এবং সাদামাটা পরিবেশ: কেবিনের পরিবেশ খুবই সাধারণ এবং সাদামাটা। এখানে কোনো আধুনিক সাজসজ্জা নেই। পুরনো কাঠের চেয়ার-টেবিল, মেঝে, সিলিং ফ্যান রয়েছে। এখনও এখানে অনলাইনে অর্ডার বা পেমেন্ট নেওয়া হয় না।
কীভাবে পৌছবেন অনাদি কেবিনে?
অনাদি কেবিন ধর্মতলায় অবস্থিত।
মেট্রো: আপনি যদি মেট্রো করে যেতে চান, তাহলে নিকটতম মেট্রো স্টেশন হলো এসপ্ল্যানেড। স্টেশনের ১ নম্বর গেট থেকে বেরিয়ে V Mart বা শিয়ালদার বাস যেখানে থামে সেখানে যেতে হবে। সেখানেই দেখতে পাবেন অনাদি কেবিন।
বাস: কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মতলাগামী অসংখ্য বাস পাওয়া যায়। বাসে করে ধর্মতলা মোড়ে নেমে আপনি সহজেই অনাদি কেবিনে হেঁটে যেতে পারবেন।
ট্যাক্সি বা ক্যাব: আপনি যদি দ্রুত পৌঁছাতে চান, তাহলে ট্যাক্সি বা অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব ব্যবহার করতে পারেন। ক্যাব চালককে ধর্মতলা মোড়ের অনাদি কেবিন বললে তিনি সহজেই আপনাকে পৌঁছে দিতে পারবেন।
এই কেবিনে গেলে বা সেটাকে বাইরে থেকে দেখলে রূপসজ্জা হয়তো আপনাকে খুশি করতে পারবে না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় তারা গোল্লা পাবে। অন্যদিকে আধুনিকতার ছোঁয়াও নেই সেখানে। কিন্তু আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন তা হলে এখানে গেলে আপনি রোমাঞ্চ অনুভব করতে পারবেন। তাই একবার ট্রাই করে দেখতেই পারেন।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
FAQ
অনাদি কেবিন কোথায় অবস্থিত?
এসএন ব্যানার্জি রোড ধর্মতলায় যেখানে গিয়ে শেষ হচ্ছে ঠিক তার বাঁ হাতে রয়েছে এই কেবিন।
অনাদি কেবিনের মেনু
মুরগির রোস্ট, কষা মাংস, মটন রোস্ট, বিভিন্ন ধরনের কাটলেট ও চপ, মোগলাই পরোটা।
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















