রাজ্য দেশ বিদেশ খেলা খাবার ও রেসিপি লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও গ্যাজেটস অন্যান্য খবর Utility News

---Advertisement---

সত্যি কি হাড় কাটা হতো? মধ্য কলকাতার হাড়কাটা গলির ইতিহাস জানুন

Published on: October 30, 2026
Harkata Gali
---Advertisement---

মধ্য কলকাতার ব্যস্ত বউবাজার এলাকা। ট্রামের ঘর্ঘর শব্দ, সোনার দোকানের ঝলমলে আলো আর পথচলতি মানুষের ব্যস্ত আনাগোনার ঠিক সমান্তরালে মিশে রয়েছে এক গোলকধাঁধার মতো অলিগলি। যার একটির নাম শুনলেই আজও সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে ওঠে—‘হাড়কাটা গলি’ (Harkata Gali)।

নামটা উচ্চারণ করলেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনও অন্ধকার অপরাধজগতের ছায়া কিংবা ভৌতিক কোনও সিনেমার দৃশ্য। বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই এটি কেবল শহরের অন্যতম প্রাচীন ও বিতর্কিত যৌনপল্লি (Red Light Area)। তবে এই অদ্ভুত ও ভয়াল নামের নেপথ্যে কি কেবলই অন্ধকার অধ্যায়, নাকি লুকিয়ে রয়েছে কলকাতার সমাজ ও পেশাভিত্তিক এক অন্যরকম ইতিহাস?

Harkata Gali: শব ব্যবচ্ছেদ নাকি চিকিৎসকের কাহিনি? প্রচলিত লোককথা

ইন্টারনেট সার্চ করলে কিংবা পুরোনো কলকাতার গল্পে কান পাতলে এই গলির নামের পেছনে বেশ কিছু রোমাঞ্চকর লোকশ্রুতি শোনা যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত গল্পটি যুক্ত আধুনিক ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সঙ্গে।

জনশ্রুতি বলে, এশিয়া মহাদেশের প্রথম মানব শব ব্যবচ্ছেদকারী (Human Dissection) প্রখ্যাত আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ও পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত নাকি এই গলিরই এক গোপন বাড়িতে গোপনে মৃতদেহ কেটে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন। অন্য একদল মানুষের মুখে শোনা যায় কোনো এক রহস্যময় ‘হাড় কাটা ডাক্তার’-এর কথা, যিনি রাতের আঁধারে মানুষের হাড়গোড় কেটে গবেষণা চালাতেন। যদিও এগুলোর কোনও প্রমাণ মেলেনি।

তবে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, এই তত্ত্বের পেছনে আবেগ যতটা আছে, তথ্য ততটা নেই। কারণ শব ব্যবচ্ছেদ যদি নামের মূল ভিত্তি হতো, তবে কলকাতার স্বভাবসিদ্ধ কথ্য ভাষায় এর নাম ‘লাশকাটা গলি’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল, ‘হাড়কাটা’ নয়। (Harkata Gali)

পি. থাঙ্কপ্পন নায়ারের পর্যবেক্ষণ: বোতাম ও চিরুনির আসল ইতিহাস

তাহলে কেন এই এলাকার নাম হাড়কাটা? কলকাতার রাস্তার ইতিহাস নিয়ে যাঁর গবেষণা আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত, সেই প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ পি. থাঙ্কপ্পন নায়ার তাঁর বিখ্যাত বই ‘আ হিস্ট্রি অফ ক্যালকাটা স্ট্রিটস’ (A History of Calcutta’s Streets)-এ যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।

মানুষ আসলে হাড় কেন কাটে? এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে গলির আদি ইতিহাস:

  • প্লাস্টিকপূর্ব যুগের বোতাম শিল্প: আজ আমরা জামাকাপড়ে যে প্লাস্টিকের বোতাম ব্যবহার করি, অষ্টাদশ বা উনিশ শতকে তার অস্তিত্ব ছিল না। তৎকালীন সময়ে শার্ট বা কোটের শক্ত ও টেকসই বোতাম তৈরি হতো পশুর হাড় কেটে ও পালিশ করে।
  • হাড়ের চিরুনি ও শৌখিন সামগ্রী: হাড় খোদাই করে তৈরি হতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম চিরুনি, ঘর সাজানোর ছোটখাটো সামগ্রী, ছুরি-চামচের বাঁট এবং নানাবিধ খেলনা।

নায়ারের গবেষণা অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট গলিতে একসময় বহু দক্ষ কারিগরের বাস ও কারখানা ছিল। দিনরাত তাঁদের প্রধান পেশাই ছিল হাড় কেটে নানা ব্যবহার্য জিনিসপত্র প্রস্তুত করা। সেই কারিগরদের কাজ থেকেই তৎকালীন মানুষের মুখে মুখে রাস্তাটির নাম হয়ে যায় ‘Harkata Gali’।

১৮০০-র দশক থেকেই নথিবদ্ধ: নিষিদ্ধ পল্লির উত্থান

পেশার ইতিহাস দিয়ে শুরু হলেও উনিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকেই এই অঞ্চলের চরিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ব্রিটিশ প্রশাসনের পুরোনো পুলিশি রেকর্ড ও আদালতের নথিপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৮০০-র দশক থেকেই এখানে বেআইনি মদ বিক্রি এবং দেহব্যবসার মতো অপরাধমূলক কাজকর্মের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযোগ জমা পড়তে শুরু করেছিল।

দিনের আলোয় যে গলিতে কারিগরদের খটখট শব্দে হাড়ের শৌখিন জিনিস তৈরি হতো, সূর্য ডুবলেই সেই গলি ঢেকে যেত আলো-আঁধারির এক নিষিদ্ধ জগতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কারিগরি শিল্প হারিয়ে গেল, কিন্তু রয়ে গেল পেশার সেই হাড়হিম করা নাম।

হাড়কাটা গলি থেকে বড়াল পরিবারের নাম: প্রশাসনিক বদল

কলকাতার মিউনিসিপ্যাল রেকর্ডে এই গালভরা ভয়াল নাম স্থায়ীভাবে রাখা সম্ভব ছিল না। ফলে পরবর্তী সময়ে সরকারিভাবে রাস্তাটির নাম পরিবর্তন করা হয়। বড়াল পরিবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের স্মরণে এই চত্বরের অলিগলির নামকরণ হয়।

বিশেষ করে ১৯৫৬ সালে গলিটির অফিশিয়াল নাম দেওয়া হয় ‘নবীন চন্দ্র বড়াল লেন’। নবীন চন্দ্র বড়াল ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের এক বিদগ্ধ সলিসিটার এবং সমাজসংস্কারক। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম; বউবাজার হাই স্কুল এবং ক্যালকাটা ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। এ ছাড়া সংলগ্ন রাস্তার নাম হিসেবে যুক্ত হয় ১৮ শতকের বিত্তবান ও কলকাতার সংস্কৃতিজগতের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক জমিদার প্রেমচাঁদ বড়ালের নাম। (Harkata Gali)

সরকারি সাইনবোর্ডে যতই নবীন চন্দ্র কিংবা প্রেমচাঁদ বড়ালের নাম জ্বলজ্বল করুক না কেন, সাধারণ মানুষের মন থেকে ‘হাড়কাটা’ নামটিকে মুছে ফেলা যায়নি।

আজও মধ্য কলকাতার এই সরু রাস্তার মোড়ে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। একদিকে পুরোনো পেশার বিস্মৃত ইতিহাস, অন্যদিকে অভিজাত জমিদারি স্মৃতি আর বেঁচে থাকার আদিম লড়াই—সব মিলিয়ে হাড়কাটা গলি আজও কলকাতার নগর-ইতিহাসের এক আশ্চর্য ধাঁধা হয়েই রয়ে গেছে। (Harkata Gali)

তথ্যসূত্র: Half Pant History


Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন



Discover more from Unknown Story

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

---Advertisement---

Unknown Story

পেশাদার লিখিয়ে নন। নিজের কাজের পাশাপাশি এখন UnknownStory.in-এ লেখালেখি চলছে।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Reply