রাজ্য দেশ বিদেশ খেলা খাবার ও রেসিপি লাইফস্টাইল ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও গ্যাজেটস অন্যান্য খবর Utility News

---Advertisement---

বিলেতের মাটি দিয়ে তৈরি হয়েছিল কলকাতার রাস্তা, জানেন সেই গল্প?

By Raja
Published on: August 30, 2026
strand road kolkata history
---Advertisement---

গঙ্গার পাড় ঘেঁষে শোঁ শোঁ করে ছুটে চলা গাড়ি, বাবুঘাট থেকে আসা লঞ্চের সাইরেন আর সূর্যাস্তের আলোয় ঝলমল করে ওঠা বিদ্যাসাগর সেতু—কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোড আজকের শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও পরিচিত ধমনী (Strand Road Kolkata History)। কিন্তু পিচ আর কংক্রিটের মসৃণ স্তরের নিচে কান পাতলে শোনা যায় এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের শব্দ। খুব কম মানুষই জানেন, যে মাটির ওপর দিয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পা ও চাকা চলে যায়, সেই রাস্তার এক বিস্তীর্ণ অংশ তৈরি হয়েছিল সুদূর ইংল্যান্ড থেকে আসা মাটি দিয়ে।

কী ভাবে টেমস নদীর পারের মাটি এসে মিশে গেল ভাগীরথী-হুগলির পলিমাটির সঙ্গে? এ যেন এক অদ্ভুত ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক রূপকথা।

গঙ্গার কাদা আর লটারির শহর

আঠারো শতকের শেষভাগে কলকাতা যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, তখন এই নদীর পাড় আজকের মতো ছিল না। হুগলি নদীর পূর্ব তীরটি ছিল জঙ্গল, দুর্গন্ধযুক্ত জলাভূমি আর জোয়ার-ভাটায় তলিয়ে যাওয়া এক কাদা-মাটির ঢাল। নদী দিয়ে জাহাজে করে মালপত্র বা মানুষ এলে তীরে নামা ছিল চরম ভোগান্তির কাজ। বর্ষাকালে সেই কাদা ভেঙে তীরে ওঠা মানেই প্রাণ হাতে নেওয়া। (Strand Road Kolkata History)

লর্ড ওয়েলেসলির হাত ধরে উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতা শহরকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা শুরু হয়। গঠন করা হয় বিখ্যাত ‘লটারি কমিটি’। উদ্দেশ্য ছিল লটারির টিকিট বিক্রি করে কলকাতার রাস্তাঘাট চওড়া করা এবং শহরের সৌন্দর্যায়ন করা। সেই পরিকল্পনারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নদীর তীর ঘেঁষে সুদৃঢ় একটি পথ তৈরি করা, যা উত্তর থেকে দক্ষিণে বাণিজ্যের যাতায়াত সহজ করবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল নদীর তীরের নরম মাটি নিয়ে—জোয়ারের ধাক্কায় কাদা ধুয়ে যাবে, এমন রাস্তায় স্থায়ী বাঁধ বা চওড়া পথ কীভাবে দাঁড়াবে?

আরও পড়ুন: দাঁড়িয়ে আছে 121 বছর ধরে, জেনে নিন কলকাতার ঐতিহ্য মেট্রোপলিটন বিল্ডিংয়ের ইতিহাস

ব্রিটিশ পালতোলা জাহাজ এবং ‘ব্যালাস্ট’ রহস্য

ঠিক এই জায়গাতেই জন্ম নিল এক অদ্ভুত সমাধান।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত বন্দর। বাংলা থেকে তখন ইংল্যান্ডে যেত পাট, নীল, মশলা, চাল আর রেশম। সেই ভারি পণ্য বোঝাই হয়ে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ইংল্যান্ডের পথে রওনা দিত। কিন্তু সমস্যা হতো ইংল্যান্ড থেকে ভারতে আসার সময়ে। (Strand Road Kolkata History)

ইংল্যান্ড থেকে যখন জাহাজগুলো কলকাতার উদ্দেশে রওনা হতো, তখন তাদের জাহাজে পর্যাপ্ত ভারি পণ্য থাকত না। খালি জাহাজ নিয়ে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ—জাহাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে উল্টে যাওয়ার ভয় থাকে। তাই জাহাজের পেট ভারী রাখতে ব্যবহার করা হতো ইংল্যান্ডের মাটি, সুরকি, ভারী পাথর এবং ভাঙা ইটের টুকরো। সমুদ্র বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘শিপস ব্যালাস্ট’ (Ship’s Ballast)।

ইংল্যান্ডের নদী অববাহিকা বা বন্দর এলাকা থেকে মাটি ও পাথর জাহাজের খোলে ভরে নিয়ে নাবিকরা পাড়ি জমাতেন দূর প্রাচ্যের পথে।

আরও পড়ুন: ছিল ইংরেজদের দপ্তর, এখন ডাকঘর, জেনে নিন GPO Kolkata-র ইতিহাস

টেমস যখন মিলল গঙ্গায়

মাস খানেকের উত্তাল সমুদ্রযাত্রা পেরিয়ে যখন ব্রিটিশ জাহাজগুলো কলকাতার খিদিরপুর কিংবা স্ট্র্যান্ডের ঘাটে এসে ভিড়ত, তখন শুরু হতো আসল খেলা। জাহাজগুলোতে বাংলার দামি পণ্য বোঝাই করার আগে তাদের পেট থেকে খালি করতে হতো সেই হাজার হাজার টন ব্রিটিশ ব্যালাস্ট বা মাটি-পাথর। (Strand Road Kolkata History)

কোথায় ফেলা হবে এত মাটি? লটারি কমিটি এবং ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা দেখলেন, সামনেই তো এক বিরাট সুযোগ!

নদীর তীরের যে ভেজা, কাদাময় জমিকে শক্ত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল, সেখানেই ফেলে দেওয়া হতে লাগল সেই ইংল্যান্ড থেকে বয়ে আনা পাথর, সুরকি আর মাটি। শত শত পালতোলা জাহাজ থেকে খালাস করা সেই মাটি নদীর পাড়ের নরম পলির সঙ্গে মিশিয়ে শক্ত ভিতে রূপ দেওয়া হলো। গঙ্গার নরম পাড় ভরাট করে তৈরি হলো এক অভেদ্য রিভারফ্রন্ট বাঁধ। (Strand Road Kolkata History)

১৮২৩ সালের দিকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী সেই সুবিশাল পথ—যার নাম দেওয়া হলো ‘স্ট্র্যান্ড রোড’।

strand road kolkata history
Google Maps-এ স্ট্র্যান্ড রোড

Strand Road Kolkata History: ইতিহাসের ধুলোয় লুকিয়ে থাকা স্মৃতি

পরবর্তীকালে ১৮২৮ সাল নাগাদ মেটকাফ হলের উল্টোদিকে এই স্ট্র্যান্ড রোডের বুক চিরে তৈরি হয় বিখ্যাত ‘বাবুঘাট’ (বাবু রাজচন্দ্র দাসের অর্থে)। লর্ড অকল্যান্ডের সময়ে গড়ে ওঠে মনরোম অকল্যান্ড ঘাট ও বাগান। স্ট্র্যান্ড রোড কেবল একটি বাণিজ্যিক পথ রইল না, এটি হয়ে উঠল ব্রিটিশ অভিজাতদের সান্ধ্যকালীন হাওয়া খাওয়ার প্রিয় জায়গা।

ঘোড়ার গাড়ির খটখট শব্দে গমগম করত স্ট্র্যান্ডের বাতাস। আর সেই প্রতিটি চাকার নিচে নিঃশব্দে চাপা পড়ে রইল সুদূর ইউরোপ থেকে পাড়ি দিয়ে আসা এক টুকরো ব্রিটিশ মাটি।

আজ স্ট্র্যান্ড রোডে দাঁড়ালে নদীর ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করে যায় মুখ। হয়তো চোখের সামনে এখন বিলাসবহুল গাড়ি আর ট্র্যাফিকের কোলাহল, কিন্তু রাস্তার গভীরে আজও রয়ে গেছে সেই যুগান্তকারী ইতিহাসের টানাপোড়েন—যেখানে এক ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের প্রয়োজনে ভাগীরথীর পলির সঙ্গে চিরদিনের জন্য মিশে গিয়েছিল বিলেতের মাটি। (Strand Road Kolkata History)


Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন



Discover more from Unknown Story

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

---Advertisement---

Raja

লেখালেখি পছন্দ করেন। পেশাদার লিখিয়ে নন। নিজের কাজের পাশাপাশি এখন UnknownStory.in-এ লিখছেন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now

Leave a Reply