বর্তমানে কর্মব্যস্ত জীবনে সকলের কাছে প্রতি মিনিট খুব দামি। অনেকে প্রার্থনা করেন ২৪ ঘণ্টার বদলে দিন যেন ২৬ ঘণ্টার হয়। কিন্তু ভাবুন তো, যেখানে একটা মিনিট খুব দামি সেখানে আপনার জীবন থেকে যদি ১১টা দিন সরিয়ে দেওয়া হয়! তা হলে কেমন লাগবে? (Calendar Mystery) ইতিহাসে একবার এমনটা হয়েছিল। মানবজাতির ইতিহাস থেকে রাতারাতি পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছিল ১১টা দিন। শুনতে কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার চিত্রনাট্য মনে হলেও, এটি এক বাস্তব ঘটনা।
Table of Contents
১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘটেছিল এই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ ২ সেপ্টেম্বর রাতে আর পাঁচটা দেশের মানুষের মতোই ঘুমোতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই তাঁরা দেখলেন—ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ৩ সেপ্টেম্বর নয়, সরাসরি ১৪ সেপ্টেম্বর। মাঝের ৩ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর—টানা এগারোটি দিন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে কর্পূরের মতো গায়েব হয়ে গিয়েছিল। কেন এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য?
Calendar Mystery: কেন সময় নিয়ে এই তুলকালাম?
এই জটিল রহস্য বুঝতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে। তৎকালীন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার জ্যোতির্বিদদের সহায়তায় চালু করেছিলেন ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ (Julian Calendar)। সেই গণনায় ধরে নেওয়া হয়েছিল, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ঠিক ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা। প্রতি চার বছর অন্তর একটি লিপ ইয়ার যোগ করে এই বাড়তি ৬ ঘণ্টার হিসাব মেলানো হতো।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের নিখুঁত পরিমাপে ধরা পড়ে, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় আসলে ৩৬৫ দিন, ৫ ঘণ্টা, ৪৮ মিনিট ও ৪৫.৫ সেকেন্ড। অর্থাৎ, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রতি বছর সৌরজগতের প্রকৃত সময়ের চেয়ে প্রায় ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড বেশি গণনা করছিল।
প্রতি বছর ১১ মিনিট হয়তো খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু শত শত বছর ধরে এই ১১ মিনিট জমতে জমতে বড় আকার ধারন করে। হিসেব করে দেখা যায়, প্রতি ১২৮ বছরে ক্যালেন্ডারের সময় সৌর সময় থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকে পুরো ১ দিন করে। (Calendar Mystery)
পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির সংস্কার ও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের আগমন
ষোড়শ শতকে এসে দেখা যায়, ঋতু ও প্রকৃত সৌর ঘড়ির সঙ্গে ক্যালেন্ডারের গরমিল প্রায় ১০ দিনে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে চার্চের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার’ উদযাপনের সঠিক দিন নির্ধারণ নিয়ে বিভ্রান্তি শুরু হয়। কারণ বসন্তকালীন বিষুব (Spring Equinox) ২১ মার্চের বদলে পিছিয়ে ১১ মার্চে এসে পৌঁছেছিল।
এই বিভ্রান্তি দূর করতে ১৫৮২ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি (Pope Gregory XIII) একটি নতুন ও বিজ্ঞানসম্মত ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন, যা আজকের দিনে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ (Gregorian Calendar)। সময়ের এই ফারাক মেটাতে পোপ তাৎক্ষণিকভাবে ক্যালেন্ডার থেকে ১০ দিন বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন, অর্থাৎ, যেই দিনগুলো হিসেবের বাইরে হচ্ছে সেই দিনগুলো মোছার নির্দেশ দেন। ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল ও স্পেনের মতো ক্যাথলিক দেশগুলো সঙ্গে সঙ্গে এই নতুন নিয়ম গ্রহণ করে নেয়। (Calendar Mystery)
ধর্মের লড়াইয়ে ১৭০ বছর গোঁ ধরে বসেছিল ব্রিটেন
বাকি দেশগুলো মেনে নিলেও গোঁ ধরে বসে ব্রিটেন। কারণ তারা তখন ক্যাথলিক চার্চের অধীনে ছিল না। প্রোটেস্ট্যান্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ইংল্যান্ডের রাজপরিবার এবং চার্চ কিছুতেই রোমের পোপের নির্দেশ মেনে নিতে রাজি ছিল না। তৎকালীন ইংরেজদের মনোভাব ছিল—‘রোমের পোপের আদেশ মেনে চলার চেয়ে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে বেমানান থাকব।’
ফলে ইউরোপের বাকি দেশগুলো যখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মেনে এগিয়ে গেল, ব্রিটেন ও তার অধীনস্থ উপনিবেশগুলো (যার মধ্যে তৎকালীন ব্রিটিশ আমেরিকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল) পুরোনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডারেই অনড় রইল। (Calendar Mystery)
কিন্তু গোঁড়ামি দিয়ে তো আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, জাহাজের আনাগোনা এবং চিঠিপত্রের আদান-প্রদানে সংকট দেখা দিল। দেখা যেত, ফ্রান্স থেকে লেখা কোনও চিঠি ব্রিটেনে পৌঁছনোর আগেই চিঠির তারিখে গরমিল তৈরি হচ্ছে। ১৭৫২ সালে পৌঁছতে পৌঁছতে ব্রিটেনের ক্যালেন্ডার ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডের থেকে পিছিয়ে পড়ে পুরো ১১ দিন।
১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বর: অবশেষে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ঐতিহাসিক আইন
বাধ্য হয়ে অবশেষে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ক্যালেন্ডার (নিউ স্টাইল) অ্যাক্ট ১৭৫০’ (Calendar New Style Act 1750) পাস করে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হেনরি পেলহ্যাম এবং ফিলিপ ডরমার স্ট্যানহোপের নেতৃত্বে স্থির হয়, ব্রিটেনও আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করবে।
সৌর সময়ের সঙ্গে ব্রিটিশ ঘড়ি ও পঞ্জিকাকে এক বিন্দুতে মেলাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে টানা ১১টি দিন সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হবে। রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী:
- ১৭৫২ সালের ২ সেপ্টেম্বর (বুধবার) শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যরাতে পরবর্তী দিনটিকে ৩ সেপ্টেম্বর না লিখে সরাসরি ১৪ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
- ফলে সেই বছর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নাগরিকদের জীবনে ৩ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর—এই ১১টি তারিখের কোনো অস্তিত্বই ছিল না!
‘আমাদের ১১ দিন ফিরিয়ে দাও!’ রাজপথে নেমেছিল ক্ষুব্ধ জনতা
আধুনিক যুগে এমন বড় বদল সরকারি গেজেটে সহজে মেনে নেওয়া হলেও, আঠারো শতকের ব্রিটেনে এর প্রভাব ছিল মারাত্মক। সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান বুঝতেন না। তাঁদের অনেকের ধারণা হয়েছিল, সরকার কিংবা রাজপরিবার ষড়যন্ত্র করে তাঁদের জীবন ও আয়ু থেকে ১১ দিন চুরি করে নিয়েছে!
- বহু জায়গায় ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে স্লোগান দিতে শুরু করে—“Give us our eleven days!” (আমাদের এগারোটি দিন ফিরিয়ে দাও!)
- সবচেয়ে বড় গোলমাল বাধে বাড়িভাড়া, সুদের কারবার ও শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি নিয়ে। মাসের ১১ দিন কাজ না করেই কীভাবে পুরো মাসের মজুরি মিলবে? আবার বাড়িওয়ালারা কি ১১ দিন বাদ দিয়ে ভাড়া কমাবেন? এই দ্বন্দ্বে ব্যাঙ্ক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তীতে আর্থিক জটিলতা এড়াতে ব্রিটিশ সরকার কর আদায়ের অর্থবর্ষের হিসাব ২৫ মার্চের বদলে পিছিয়ে নিয়ে যায় ৫ এপ্রিলে, যা আধুনিক অর্থবর্ষের নিয়মে আজও এক ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে বেঁচে রয়েছে। (Calendar Mystery)
সময়ের নিয়ম অমোঘ। কিন্তু সেই সময়ের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে মানুষের তৈরি করা একটি রাজকীয় ক্যালেন্ডার থেকে রাতারাতি ১১টি দিন গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে সত্যিই এক বিরল ও অনন্য অধ্যায়।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.



















