হাঁটছেন, তিনি হাঁটছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে হাঁটছেন এক ব্যক্তি। এ দেশ থেকে ও দেশ, এই মহাদেশ থেকে ওই মহাদেশে। বাড়ি ফিরবেন কবে? ঠিক করেননি। তিনি ইংল্যান্ডের প্রাক্তন সৈনিক কার্ল বুশবি Karl Bushby. কেন এই কাজ করলেন এই ব্রিটিশ সৈনিক? এই প্রতিবেদনে জেনে নিন এই ‘পাগল’ সৈনিকের কথা।
Table of Contents
কে Karl Bushby?
তিনি কেন হাঁটছেন সেটা জানার আগে চিনতে হবে তাঁকে। পেশিবহুল চেহারা, লম্বা উচ্চতার এই ব্যক্তি ব্রিটিশ সৈনিক। ইংল্যান্ডের সোলিহাল শহরের বাসিন্দা। তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্যারাসুট রেজিমেন্টে ছিলেন। সামরিক জীবনের কঠোর প্রশিক্ষণ এবং শৃঙ্খলা তাঁকে এই দীর্ঘ যাত্রার জন্য তৈরি করেছিল। পেশার তাগিদে তিনি বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন, যা তাঁর মধ্যে দেখব এবার জগৎটাকে এই কথাটার খিদে আরও বাড়িয়ে দেয়। পেশার জন্য তিনি ভিন্ন সংস্কৃতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে জানতে থাকেন।
এর পরই লক্ষ্য নেন, হেঁটে সারা বিশ্ব ঘুরে দেখবেন।
হেঁটে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন কার্ল বুশবির
১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর, কার্ল বুশবি তাঁর ইংল্যান্ডের বাড়ি ছেড়ে রওনা দেন সারা বিশ্ব ঘুরে দেখার জন্য। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর। কোনও জাহাজ বা বিমানের টিকিট কাটেননি, বেছে নিয়েছেন তাঁর স্কিলকে। কিন্তু এটি সাধারণ কোনও হাঁটা নয়। তার শর্ত ছিল একটাই, কোনও যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না, এবং পুরো পথটা নিরবচ্ছিন্নভাবে পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিতে হবে। এই যাত্রা আজ ২৭ বছর ধরে চলছে, আর এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি হাজার হাজার মাইল পথ হেঁটেছেন, শত শত প্রতিবন্ধকতা পার করেছেন এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য অবিরাম হেঁটে যাচ্ছেন।
বিশ্বে রয়েছে underwater mailbox, চিঠি পাঠাতে যেতে হয় জলের 33 ফুট গভীরে, জেনে নিন বিস্তারিত
তবে আর পাঁচজনের মতো কার্লের পথেও বাধা এসেছে। বলা ভালো হাঁটা শুরুর আগেই বাধা। তিনি যখন এই পরিকল্পনার কথা আত্মীয়স্বজনদের জানান, সকলেই তাঁকে পাগল বলা শুরু করে। কারণ, হেঁটে কেউ বিশ্ব ভ্রমণ করতে পারে সেটা ভাবনার বাইরে ছিল অনেকের। কিন্তু কার্ল তাঁর সংকল্পে অটুট ছিলেন। এই মিশনকে সফল করার জন্য তিনি কয়েক বছর ধরে কঠোর অনুশীলন করেছিলেন। তিনি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যেমন বিশেষ ধরনের জ্যাকেট, স্লিপিং ব্যাগ এবং তাঁবু, নিয়ে একটি বিশেষ ধরনের ঠেলাগাড়ি তৈরি করেন। এর পর তিনি যাত্রা শুরু করেন গ্রেট ব্রিটেন থেকে। তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিল ইউরোপের দেশগুলো পার হয়ে এশিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়া।

কেন হেঁটে বিশ্ব দেখার স্বপ্ন কার্ল বুশবির?
তাঁর এই যাত্রার পিছনে ছিল এক ব্যক্তিগত কারণ। তিনি তাঁর সামরিক জীবন থেকে অবসরের পর আর পাঁচজন অবসর প্রাপ্ত ব্যক্তির মতো ঘরে শুয়ে বসে বা পড়াশোনা করে দিন কাটাতে চাননি। চেয়েছিলেন সামরিক জীবনের মতোই অবসর পরবর্তী জীবনও তাঁর এক্সাইটিং কাটুক। তিনি তাই এক নতুন উদ্দেশ্য খুঁজছিলেন। পাশাপাশি পেশাগত কারণে তিনি একাধিকবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। তাই মাথায় এই আইডিয়াটা খেলে যায়। এতে তিনি অ্যাডভেঞ্চারও পাবেন এবং নিজের পরীক্ষাও হবে।
German Man Swims to Office: যানজটে বিরক্ত, প্রতিদিন 2 কিলোমিটার সাঁতার কেটে অফিস যান এই ব্যক্তি
কার্ল প্রায়ই বলেছেন তাঁর এই যাত্রা জীবনের এক অংশ। জীবনের পথে যেমন বাধা আসে, তেমনি তাঁর এই দীর্ঘ পদযাত্রাতেও এসেছে। তীব্র শীত, মরুভূমির প্রচণ্ড গরম, দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা, এবং রাজনৈতিক বাধা—সবকিছুকে তিনি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন মানুষের ভিতরের শক্তি কতটা সেটা এই ধরনের কাজের থেকে প্রমাণিত হয়।
পদে পদে বাধা আর বিপদ: কার্লের যাত্রাপথের গল্প
পায়ে হেঁটে গোটা বিশ্ব ভ্রমণ করতে গেলে যে চ্যালেঞ্জ আসবে সেটাই স্বাভাবিক। এরথেকে কঠিক হচ্ছে বিভিন্ন দেশের আইন। তাঁর যাত্রার সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল সাইবেরিয়া এবং বেরিং প্রণালী পার হওয়া।
সাইবেরিয়ার হিমশীতলতা: সাইবেরিয়ার তীব্র ঠাণ্ডায় বেঁচে থাকাটাই আপহিল টাস্ক, সেখানে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিচে। এই ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডায় তাঁর সরঞ্জাম কাজ করা বন্ধ করে দিত এবং সেখানে খোলা আকাশের নিচে থাকাও সম্ভব নয়। তকি তিনি বরফের মধ্যে তাঁবু খাটিয়ে থাকতেন। তিনি এমন জায়গা দিয়ে গিয়েছেন যেখানে ছিল না রাস্তা, পুরোটাই বরফে ঢাকা। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল নিজের অভিজ্ঞতা।
বেরিং প্রণালী পাড়ি: তাঁর যাত্রার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং আলোচিত অংশটি ছিল বেরিং প্রণালী (Bering Strait) পার হওয়া। বেরিং প্রণালী এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকাকে আলাদা করেছে, এই পথটি বরফের একটি খুব বিপজ্জনক। এটি পার হওয়ার সময় বরফের চাঁই ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। জনমানবহীন জায়গা দিয়ে পার হতে গিয়ে বিপদ হলে বাঁচানোর জন্যও কাউকে পাওয়া যেত না। এই পরিস্থিতিতে তিনি প্রায় ১৪ দিন ধরে বরফের উপর দিয়ে হেঁটে এই প্রণালী পার করেন।
রাজনৈতিক বাধা: Karl Bushby-র যাত্রায় শুধু প্রাকৃতিক বাধা নয়, বরং রাজনৈতিক বাধাও ছিল। বিভিন্ন দেশে ভিসা এবং অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাশিয়ায় তার ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা হয়েছিল, যার কারণে তাকে বেশ কয়েক মাস আটকে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি কখনও হাল ছাড়েননি। তাঁকে একাধিকবার জেলেও যেতে হয়। কিন্তু তিনি প্রতিবারই নিজেকে প্রমাণ করে বেরিয়ে আসেন।
করোনার সময় তিনি প্রায় চার বছর কাজ়াখাস্তানে আটকে ছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি যান কাস্পিয়ান সাগরের কাছে। কিন্তু কাস্পিয়ান সাগর পার করার জন্য কোনও রাস্তা পাচ্ছিলেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন সাঁতার কেটেই পার হবেন কাস্পিয়ান সাগর (Karl Bushby Caspian sea)। সেটা পার হয়ে তিনি ফের যান রাশিয়ায়। তার আগে রাশিয়া থেকে তিনি কাজ়াখাস্তানে গিয়েছিলেন। ফের সেখানেই ফেরেন। এর পর রাশিয়া থেকে ইউক্রেন, পোল্যান্ড হয়ে প্রবেশ করেন ইউরোপে।

এখন কোথায় রয়েছেন কার্ল বুশবি (Karl Bushby Where is He Now)?
২৭ বছরের যাত্রার পর Karl Bushby এখন ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে ইউরোপের সব দেশ ঘুরে নিজের দেশ ইংল্যান্ডে প্রবেশ করা এবং বাড়ি যাওয়া।
কার্লের এই যাত্রা শুধু একটি রেকর্ড নয়, এই যাত্রা একটি বার্তা দেয়। ইচ্ছা থাকলেই যে উপায় হয় সেটার প্রমাণ এই যাত্রা। কোনও স্বপ্নপূরণ করতে হলে বাধাকে জয় করে এগিয়ে গেলেই এক এক করে রাউন্ড পার করা যায়। এরজন্য দরকার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার ইচ্ছা এবং আত্মবিশ্বাস। যেটা করে দেখিয়েছে বুশবি। তাই একটা সময়ে যারা তাঁকে পাগল বলেছে তাঁরাই এখন গুগল করে খোঁজ করছেন।
Unknown Story-কে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ফলো করুন
Discover more from Unknown Story
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















